পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সিঃ সহ- সভাপতি মোঃ হাবিব আজম বলেন, তৎকালীন তথা বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৩ বছর পার হলো। কিন্তু যে কারণে বা যে শর্তের ভিত্তিতে সরকারের সাথে এ চুক্তি করা হয়েছে তার সুফল এখনো পাহাড়ের বাসিন্দারা পায়নি।

একটা সময় পাহাড়ে জেএসএস তাণ্ডব চালালেও যুগের পরিপ্রেক্ষিতে এখন পাহাড়ে চারটি সশস্ত্র গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এসব আঞ্চলিক সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মূললক্ষ্য উদ্দেশ্য হলো- চাঁদাবাজি, হত্যা, গুম, চালিয়ে পাহাড়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা। প্রশাসন যেমন একদিকে অসহায় তেমনি এ অঞ্চলের মানুষ তাদের ভয়ে তটস্থ থাকে। কখন মৃত্যুর আলিঙ্গন করতে হয়। তাই তাদের ভয়ে জীবন বাঁচাতে প্রতিনিয়ত নিয়ম মাফিক বাৎসরিক চাঁদা দিতে হয়। প্রশাসনও নিশ্চুপ। তাহলে কে পাহাড়ের অসহায় মানুষকে এসব সশস্ত্র বাহিনীর করাল গ্রাস থেকে মুক্তি দিবে?

এদিকে স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখন্ড হলো-পার্বত্য চট্টগ্রাম। তাই সারা দেশের স্বার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর। এরই ধারাবাহিকতায় পাহাড়ে সেনাবাহিনী একদিকে যেমন দেশের স্বার্বভৈৗমত্ব রক্ষা করছে ঠিক অন্যদিকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।

কিন্তু রাষ্ট্রের এমন বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে পাহাড়ের বিশেষ মহল প্রতিনিয়ত অপবাদ, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এ অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনীকে উৎখাত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সেনাবাহিনীকে পাহাড় থেকে উৎখাত করতে কখনো দুর্বল নারীদের উপর এ মহলটির সন্ত্রাসীরা ধর্ষণ করে সেনাবাহিনীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কখনো আবার ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ চালিয়ে সেনাবাহিনীর উপর কলঙ্ক দেওয়া হচ্ছে।

এ মহলটি শুধু এসব অপকর্ম করে ক্ষান্ত হয়নি। বর্তমানে ধর্মীয় উপসনালয় ভাংচুর করে দেশের গর্বিত সেনাবাহিনীর উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অথচ ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা- ১৯৭৪ সাল থেকে সেনাবাহিনী পাহাড়ে অবস্থান করে অন্ধকার পাহাড়ে আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছে।

এবার ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে দেখা যায়- এক সময় এ এলাকায় ব্যবসা করার জন্য তৎকালীন একটি গ্রুপকে চাঁদা দেওয়া হলেও বর্তমানে চারটি গ্রুপকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। ঠিকাদার, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, মাছ, গাছ ব্যবসা সকল স্থলে চাঁদা আর চাঁদা। না হলে বন্দুকের বুলেটে মৃত্যু অনিবার্য। যে কারণে ব্যবসার স্বর্গরাজ্য পাহাড় হওয়ার সত্ত্বেও ব্যবসা আর জমছে না। হতাশ ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিমত- সরকারকে কর দিয়ে স্বাধীন দেশে ব্যবসা করছি। এখন সরকারের পাশাপশি চারটি গ্রুপকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হয় তাহলে আমাদের লাভ হলো কি? চোখে-মুখে তাদের চরম ক্ষোভ।

তাই চুক্তির পূর্তি নিয়ে পাহাড়ের বাসিন্দারা আর ভাবে না। তাদের দাবি এসব অরাজকতা থেকে মুক্তি চায়।এদিকে ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে বর্তমান আ’লীগ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এখানকার দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান ঘটানো হয়। কিন্তু চুক্তির ২৩ বছর পার হলেও এখনো পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হয়নি। ভ্রাতৃত্বঘাতি সংঘাত, চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষ বিভক্ত হয়ে পাহাড়ে সন্ত্রাস চাঁদাবাজি জনজীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে।

জনসংহতি সমিতি ভেঙ্গে জেএসএস সংস্কার, ইউপিডিএফ ভেঙ্গে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) আঞ্চলিক সংগঠনের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও পূর্বের পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ তো আছে। এসব সংগঠনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরে খুনাখুনি চলছে প্রতিনিয়ত। ফলে পার্বত্যবাসী নানা সংশয় ও সংকটে থাকে।

পাহাড়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, কৃষি, যোগাযোগসহ নানা উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে সরকার। খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি-বান্দরবান তিন পার্বত্য জেলায় জেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদে ৩০টি বিভাগ, রাঙামাটি জেলা পরিষদে ৩০টি বিভাগ, বান্দরবানে ২৮টি বিভাগ হস্তান্তর করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অধীন এখানে চার হাজার পাড়া কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা সহ বিভিন্ন ভাবে পাহাড়ের উন্নয়ন করা হচ্ছে।

রাঙামাটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও রাঙামাটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিদ্যুতের সঞ্চালণ লাইন সম্প্রসারণ ও সাব স্টেশন স্থাপন সহ নানাবিধ উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে।

সরকারের এমন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সত্ত্বেও চুক্তি স্বাক্ষরকারীরা বলে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি। আর চুক্তি বিরোধীরাতো চুক্তিই মানে না। চুক্তির ২৩ বছর ধরে পাহাড়ে জনজীবন এভাবে চলছে। তবুও মানুষ আশা ছাড়ে না। একদিন পাহাড়ে শান্তি আসবে।

এদিকে সরকার দল থেকে বারবার বলা হয় পাহাড়ের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। তারাও অসহায় এসব অস্ত্রবাজদের হাতে। তাদের অনেক নেতা-কর্মী হতাহত এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছে অস্ত্রবাজদের অত্যাচারে।

পাহাড়ের বাসিন্দারা আর রক্তের হলিখেলা দেখতে চায় না। আর কোন মায়ের বুক খালি দেখতে চায় না। স্ত্রী স্বামীকে মা তার সন্তানকে, ছেলে-মেয়েরা তার বাবাকে হারাতে চায় না।
ব্যবসায়ীরা চাঁদামুক্ত হয়ে শান্তিতে ব্যবসা করতে চায়, রাজনীতিবিদরা জীবনের নিরাপত্তা চায়। দেশের স্বার্বভৌমত্ব রক্ষা হোক এটাই দাবি পাহাড়ের বাসিন্দাদের।

মোঃ হাবিব আজম ১৩ টি দাবী তুলে ধরেনঃ
১। Chittagong Hill Tracts Regulation (১৯০০ সালের ১নং আইন) সহ সকল প্রকার বিতর্কিত অসাংবিধানিক আইন সমূহ বাতিল করতে হবে।

২। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে সংশোধন করে “উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল” এই অসাংবিধানিক শব্দগুলি বিলুপ্ত করতে হবে।

৩। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬ (২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক জাতি হিসাবে বাঙালী এবং বাংলাদেশী নাগরিকত্বের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত বৃহত্তর বাঙালী জনগোষ্ঠীকে অসাংবিধানিক ভাবে “অ-উপজাতি” হিসাবে অভিহিত করা যাবে না।

৪। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হতে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সহ বিদ্যমান সকল আইন সংশোধন করে “অ-উপজাতি” শব্দগুলিকে বিলুপ্ত করতে হবে।

৫। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর বাঙালী জনগোষ্ঠীদের গুচ্ছগ্রাম হতে তাদের স্ব স্ব ভূমিতে পুনর্বাসন করে ভূমির অধিকার ফেরত সহ আর্থিক ক্ষতি পূরণ দিতে হবে।

৬। বাঙালীদের ভূমি জবর দখল চলবে না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কল্পে দ্রুত ভূমি জরিপ চালু করতে হবে। ভূমি জরিপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তথাকথিত বিতর্কিত অসাংবিধানিক “ল্যান্ড কমিশন” এর সকল কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।

৭। অবিলম্বে খাস জমি বন্দোবস্তি প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম চালু করতে হবে।

৮।পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিতর্কিত ও অসাংবিধানিক ক(১), খ(৩), ২৬(ক), গ(১০), (ঘ)১০ নং দফা সহ পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৬৪(১) (ক) ধারা অবিলম্বে সংশোধন করতে হবে।

৯। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ঘ(৪) দফা সংশোধন পূর্বক ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের রায়, আদেশ কিংবা কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে (মহামান্য সুপ্রীম-কোর্ট) আপীল করার বিধান প্রনয়ন করতে হবে।

১০। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ঘ(৫) দফা সংশোধন করে “ল্যান্ড কমিশনে” তিন পার্বত্য জেলা হতে কমপক্ষে ০৩(তিন) জন বাঙালী প্রতিনিধি নিযুক্ত করার বিধান করতে হবে।

১১। কোটা সংরক্ষন ও বৃত্তি প্রদান সংক্রান্ত কথিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১০নং দফা সংশোধন করে চাকুরী ও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে “পার্বত্য কোটা অথবা পার্বত্য বাঙালী কোটা” যুক্ত করতে হবে।
“উপজাতি বিশেষ কোটা ” সম্পূর্ণ রূপে বাতিল করে সাংবিধানিক ভাবে বাঙালী ছাত্র/ছাত্রীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বাঙালী ছাত্র/ছাত্রীদেরকেও বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করে “সুযোগের সমতা” নিশ্চিত করতে হবে।

১২। বাংলাদেশের অপর ৬১ (একষট্টি) জেলার সাথে সংগতি রেখে তিন পার্বত্য জেলায় ভূমি বন্দোবস্তি প্রক্রিয়া ও সরাসরি সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস চালু করে সকল প্রকার জটিলতার অবসান ঘটিয়ে সাংবিধানিক ভাবে ভূমি রেজিষ্ট্রেশন পদ্ধতি চালু করতে হবে।

১৩। পার্বত্য জেলা পরিষদের বিদ্যমান আইন সমূহ সংশোধন করে বৃহত্তর বাঙালী জনগোষ্ঠী সহ সকল সম্প্রদায়ের জন্য জেলা পরিষদের “চেয়ারম্যান পদটি” উন্মুক্ত করে সাংবিধানিক অধিকার সু-নিশ্চিত করতে হবে।

হাবিব আজম একজন তরুন সংগঠক তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপিড়ীত – নির্যাতিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে কাজ করছেন।

By admin

মতামত

x