Home / ব্লগার / চুক্তির সময় সেনারা কান্নায় ভেঙে পড়েছিল,কারণ তখনই তাদের বিজয় পতাকা উড়ানোর মুহূর্ত ছিল!

চুক্তির সময় সেনারা কান্নায় ভেঙে পড়েছিল,কারণ তখনই তাদের বিজয় পতাকা উড়ানোর মুহূর্ত ছিল!

||কাজী তুষার ইকবাল||

পাহাড়ে দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলমান সংঘাত-সহিংসতা ও যুদ্ধে প্রচুর পরিমাণ প্রাণহানির ঘটে উপজাতি বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের। বিপর্যস্ত পাহাড়ের পরিস্থিতি পরিবেশ অশান্ত হয়, সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে গুলির শব্দ, বারুদের গন্ধে বাতাস ভারী হয়, সারিবদ্ধ লাশ ও রক্তের হোলি খেলা, এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৎকালীন এখানকার মানবতা বিপর্যয় ডেকে আনে।

সূত্রে ও স্থানীয় মানুষদের তথ্য মতে জানা যায় ১৯৯৭ সালের ২ রা ডিসেম্বরের মুহূর্তে কালীন তথাকথিত শান্তিবাহিনীর সদস্যরা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে এমতাবস্থায় উপজাতি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে রক্ষা করার তাগিদে ভারত সরকারের পরোক্ষ ইন্দনে তৎকালীন সরকার “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি” স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। চুক্তির তৎকালীন সময়ে হাজারো সেনাবাহিনীর সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েছিল, কারণ তখনই তাদের বিজয় পতাকা উড়ানোর মুহূর্ত ছিল। সহ যুদ্ধাদের হারিয়ে হাজারো ঘাত-প্রতিঘাত কে উপেক্ষা করে সেনাবাহিনী যখন বিজয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ঠিক তখনই পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করা হয় মেরুদন্ডহীন তথাকথিত শান্তি বাহিনীর সাথে। চুক্তির প্রয়োজন ছিল না, কারণ; শান্তিবাহিনী তখন পরাস্ত। স্থানীয় মানুষদের তথ্য মতে ১৯৭৭ সালে শান্তিবাহিনী বান্দরবান সাঙ্গু নদীতে অতর্কিত হামলা করে ৫ জন সেনা সদস্যকে হত্যা করার পর সেনাবাহিনী নড়েচড়ে বসে। তাৎক্ষণিকভাবে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামকে রক্ষার ও স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে শপথ গ্রহণ করে জড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধে। এই দীর্ঘ যুদ্ধে শেষপর্যায়ে বিজয়ের সন্নিকটে পৌঁছে যায় সেনাবাহিনী। ১৯৯৭ সালের ২-রা ডিসেম্বর সেসময় এই তথাকথিত চুক্তি করার কোন প্রয়োজনীয়তা ছিল না। শুধুমাত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে রক্ষা করতে ভারত সরকারের পরোক্ষ ইন্দনে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে অসাংবিধানিক চুক্তি সম্পাদিত করে সরকার।

খাগড়াছড়িতে যখন তথাকথিত শান্তি বাহিনীর সদস্যরা পুরাতন ভাঙা, মরিচাধরা অস্ত্র গুলো আত্মসমর্পণ করে তখন সেনাবাহিনীর সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়ে বিজয়ের চূড়ায় পৌঁছেও বিজয় না পাওয়ার বেদনায়। যদিও চাকুরী ও বিধিবিধানের কারণে সেদিন সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের গৃহীত পদক্ষেপ মেনে নেয়।

চুক্তির সময় সরকার পার্বত্য বাংগালী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কোন প্রকার আলোচনা-পর্যালোচনা করেননি। হঠাৎ তড়িঘড়ি করে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদিত করে। চুক্তির বেশিরভাগ ধারায় অসাংবিধানিক। একতরফাভাবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে প্রাধন্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদিত করে। এর ফলে পার্বত্য বাংগালীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী দলে থাকা বিএনপি চুক্তি নিয়ে আন্দোলন করে নিজেদের জায়গা পাকাপোক্ত করার অপচেষ্টাতে লিপ্ত হয়। ১৯৯৭ সালের ২ রা, ডিসেম্বর পার্বত্য কালো চুক্তি নিয়ে বিএনপি রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা ছিলো লোক দেখানো। চুক্তির এই বিরোধিতার মূলত কারণ ছিল আওয়ামী লীগকে দেশবাসীর নিকট হেয় প্রতিপন্ন করে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রচেষ্ঠা। পার্বত্য চুক্তিকে বিএনপি “দেশ বিক্রির কালো চুক্তি আখ্যায়িত করে লংমার্চ করে তৎকালীন সময়ে। ” লংমার্চে যোগ দিতে গিয়ে খাগড়াছড়ি মাটিরাঙায় পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে ৫ বাংগালী শহীদ হয়, গুলিবিদ্ধ হয় অসংখ্য বাংগালী। অথচ তার তিন বছর পর ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি পার্বত্য চুক্তির বেশিরভাগ ধারায় বাস্তবায়ন করেন! পাহাড় হতে সেনা প্রত্যাহার বিএনপিই শুরু করেছিল। আওয়ামী লীগের অসাংবিধানিক কালো চুক্তিকে বিএনপিই সাদা করে। বিরোধী দলে থাকাকালীন বিএনপি “পার্বত্য দেশ বিক্রির” কালো চুক্তি বাতিল করবে বলে যে হুংকার দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এসে কিন্তু সুর পরিবর্তন করে চুক্তির বেশিরভাগ ধারা বাস্তবায়ন করে গিয়েছেন বিএনপিই। যদিও বর্তমান বিএনপির দলকানা, পাতিনেতা ওঅন্ধভক্তরা অস্বীকার করেন তা!

আওয়ামী লীগ, বিএনপির দু’টি বড় রাজনৈতিক দলই পাহাড়ের বাঙালির জন্য বিষফোঁড়া। পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্ত পরিস্থিতি অশান্ত করার জন্য মূলত দায়ী বড় দু’টি রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগ সংবিধানকে তোয়াক্কা না করে এবং পার্বত্য বাঙ্গালীদের মৌলিক অধিকার হরণ করে একতরফাভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জেএসএস সন্তু লারমার তথাকথিত শান্তিবাহিনীর সঙ্গে বিতর্কিত একটি চুক্তি সম্পাদিত করে। এই চুক্তির লক্ষ্যবস্তু যদিও রক্তপাত বন্ধ, সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র পরিহার করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য করা হয়েছিল বলে আওয়ামীলীগ সরকারের তরফ হতে বলা হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে দিতে সরকার এবং জনসংহতি সমিতির মধ্যকার চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল বলে সরকারের তরফ থেকেই বলা হয়েছে। সরকারের পক্ষ হতে আরো জানানো হয় যে, অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, দীর্ঘ সংঘাত বন্ধ করে সম্প্রীতি, ঐক্য ও সেতু বন্ধন সৃষ্টির লক্ষ্যে চুক্তি সম্পাদিত করে শেখ হাসিনা সরকার। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির পরে সুফল দেখা যায়নি। শান্তি ফিরে আসেনি চুক্তির দীর্ঘ দুই যুগ অতিক্রম করার মুহূর্তেও! সে পূর্বেকার ন্যায়ে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রধারী বিদ্যমান, তারা চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, অপহরণ, গুন-গুম ও রাষ্ট্র বিরোধী তৎপরতা হরহামেশাই প্রশাসনের নাগালে করে থাকে। সরকার চুক্তির বেশিরভাগই ধারা বাস্তবায়ন করলেও তথাকথিত শান্তিবাহিনী তা অস্বীকার করে! সরকারের পক্ষ হতে তথাকথিত শান্তিবাহিনীকে দেওয়া শুধুমাত্র একটি শর্ত “অবৈধ অস্ত্র পরিহার” করা। আর একটি মাত্র শর্ত অবৈধ অস্ত্র পরিহার তাও বাস্তবায়ন করেননি সন্তু গংরা! ৪ খন্ডে পার্বত্য চুক্তির বেশিরভাগ ধারা তথাকথিত শান্তিবাহিনীর পক্ষে। তার পরেও সন্তু গংরা অবৈধ অস্ত্র পরিহার করেননি! খোদ সন্তু লারমা নিজেই ২০১৩ সালে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সাংবাদিক শামীমা বিনতে কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকার করে বলেন, আমরা চুক্তির সময় সম্পূর্ণ অস্ত্র জমা দিইনি। আমাদের এখনো কয়েকশো সশস্ত্র জনবল রয়েছে! সন্তু লারমার এমন বক্তব্যের পরেও পার্বত্য চুক্তির মৌলিক শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে এনে সন্তু লারমা গংদের বিরুদ্ধে সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয়!

সমতলের বুদ্ধিজীবী, প্রগতিশীল, জ্ঞানপাপী ও বুদ্ধি বৃত্তি করা মহলটি সহ একটি মহল বারবার অভিযোগ করে বলে আসছে পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তির মূল “বাঙালি ও সেনাবাহিনী অনুপ্রবেশ।” আমি তাদের এই কথার সঙ্গে একমত না৷
কারণ; পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা, সংকট, সমস্যা ও বিভাজন সহ ষড়যন্ত্রকারীদের অপতৎপর পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা বাংগালী প্রবেশকে কেন্দ্র করে হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব হতে যেমন ; ১৯৪৭ শে বৃটিশরা যখন ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে যায় তৎসময় ভারত হতে ভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়।বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অংশে পড়ে। তৎকালীন এই নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের কথিত রাজারা তার বিরোধীতা করে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারত ও মায়ানমারের পতাকা উত্তোলন করেন!
আত্মস্বীকৃত রাজাকার ত্রিদিব রায় পূর্ব পাকিস্তানের পার্বত্য চট্টগ্রামেকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে ছিল। এই নিয়ে ১৯৪৭ সালে রাঙামাটিতে ভারতের পতাকা উত্তোলন করেন আর বান্দরবান অংশের কথিত রাজা মায়ানমারের পতাকা উত্তোলন করেন! তখন কিন্তু বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়নি। যদিও সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এবং আত্মীয় বন্ধনের ফলে পরবর্তীতে আত্মস্বীকৃত রাজাকার ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের অনুসারী হয়ে যান। ১৯৭১ সালে যুদ্ধে ত্রিদিব রায় বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান করে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন৷ তার এ ভূমিকার কারণে পাকিস্তান সরকার তাকে নিরাস করেননি। বিষয়টি সকলেরই জানা। এই নিয়ে বিশদভাবে ব্যাখা করার যৌক্তিকতাও নেই।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে যখন সংবিধান করে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করছে ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধুর ৭২ সংবিধানকে অস্বীকার করে নিজেদের আবির্ভাবের জানান দেয় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এমএন লারমা) মানে, সন্তু লারমার বড় ভাই। ১৯৭২ সালে ভারতের সহযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে জন সংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) অথাৎ তথাকথিত শান্তিবাহিনী আত্মপ্রকাশ করে। বিষয়টি পরিষ্কার হয় ১৯৭৩ সালে। এবং ১৯৭৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের স্থাপনা যেমন বনবিভাগের উপর হামলা করে শান্তিবাহিনী নিজেরদের জানান দেয়৷ অথচ তখনও পাহাড়ে বাংগালী, সেনাবাহিনীর আগমণ ঘটেনি! কিছুসংখ্যক বাংগালী বসবাসকারী ছিল এঅঞ্চলে। আজকের ভূমি পুত্র (আদিবাসী দাবিদার) “উপজাতি” যারা ভারত, বার্মার চম্পকনগর ও মঙ্গোলীয় অঞ্চল হতে বিতাড়িত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমণ করার পূর্ব হতে কার্পাসমহল ও কাপ্তাই এলাকায় বসবাস করতেন কিছু সংখ্যক বাংগালী। এর বাহিরে বাংগালী পাহাড়ে ছিল না। অথচ সমতলের বুদ্ধিজীবী, প্রগতিশীল, জ্ঞানপাপী, বুদ্ধি বৃত্তি করা মহলটি সহ একটি মহল বারবার অভিযোগ করে আসছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তির মূল বাঙালি ও সেনাবাহিনী অনুপ্রবেশ! তথাকথিত শান্তিবাহিনী যখন পাহাড়ে নাশকতা, রাষ্ট্র বিরোধী তৎপরতা, রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা করে তখন পাহাড়ে বাংগালী, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিল না। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা, সংকট ও বিভাজন সে ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়ার কাল থেকেই বিরাজমান।

১৯৯৬ সালে শেখহাসিনা সরকার ক্ষমতায় এসে ১৯৯৭ সালের ২ রা ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তির মধ্য দিয়ে পাহাড়ের বাঙ্গালীর ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশি ক্ষতি করেছে। আর পার্বত্য বাঙ্গালীদের বুকে আশা জাগানো বিএনপি তৎকালীন বলেছিল ক্ষমতায় গিয়ে তারা বৈষম্যমূলক দেশ বিক্রির কালো চুক্তি বাতিল করবে। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির বেশির ভাগ ধারা বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে বাস্তবায়িত করেছে তাদের বিদেশী প্রভুদের সন্তুষ্টির জন্য। রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার ভূষণ ছড়াতে প্রায় এক হাজার ঘুমন্ত বাংগালীকে গভীর রাতে গণহত্যা সংগঠিত করার মাধ্যমে নিঃশেষ করে দেয় রাজেশ। বাঙ্গালী খুনি শান্তিবাহিনীর মেজর মনি স্বপ্ন দেওয়ান (রাজেশ) কে বিএনপি সরকার এমপি-মন্ত্রী বানিয়েছেন ২০০১ সালে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাংগালী জনগণের সঙ্গে দু’টি বড় রাজনৈতিক দলই কানামাছি খেলেছে। ভাঁওতাবাজি মূলক অসাংবিধানিক পার্বত্য চুক্তি এখানকার পার্বত্য বাঙ্গালীদের মৌলিক অধিকার হরণ করেছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

মতামত

x