Home / মুক্তমত / ডিসির অসাংবিধানিক বাসিন্দা সনদ, হেডম্যান রিপোর্ট ও সার্কেল চীপ সনদের অবসান দাবি।

ডিসির অসাংবিধানিক বাসিন্দা সনদ, হেডম্যান রিপোর্ট ও সার্কেল চীপ সনদের অবসান দাবি।


||কাজী তুষার ইকবাল||

পার্বত্য চট্টগ্রামের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয় পত্র রয়েছে তবুও তথাকথিত হিল রেগুলেশনের অপব্যাখা দিয়ে যুগের পর যুগ ডিসি সনদ নেওয়ার জন্য জমির কাগজপত্র ও হেডম্যান রিপোর্ট বাধ্যকতা করা হয়েছ। যা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এই অসাংবিধানিক রীতি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অবসান করা বর্তমান সময়ে দাবি।

প্রথম পর্ব- তথাকথিত হিল রেগুলেশনের অপব্যাখ্যা দিয়ে জমির মূল জবানবন্দি নেন স্থায়ী বাসিন্দা সনদ প্রদানে! কি বলা আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তথাকথিত আইনে তা জেনে নেওয়া যাক। ১৯৯৭ পার্বত্য চুক্তি ও পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সদস্য হতে পার্বত্য বাসীদের উপজাতি-অউপজাতি প্রমাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে হেডম্যান রিপোর্টের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ উপজাতি-অউপজাতি বাসিন্দার সদন প্রদান করবে। এরজন্য যদি হেডম্যান এবং সংশ্লিষ্ট চীফ সার্কেল মনে করে যে কাউকে উপজাতি- বাঙালী প্রমাণে জায়গা জমির কাগজপত্রেরও দরকার, তখন ক্ষেত্রবিশেষ জবানবন্দি নিতে পারে। কিন্তু কোথাও উল্লেখ নেই যে জেলা প্রশাসক (ডিসির? নিকট হতে স্থানীয় বাসিন্দা সনদ পেতে হলে তার প্রমাণ হিসেবে পার্বত্য বাঙালীকে জায়গা জমির কাগজপত্র প্রদান করতে হবে। এমন নিয়ম নীতি কোথাও নেই৷ এটা সম্পূর্ণভাবে বাঙালীদের হয়রানি করার জন্য এবং ডিসি ও তার ইউএনও’রা ক্ষমতা জাহির করার জন্য বৃটিশ প্রশাসন কর্তৃক তৎকালীন প্রদত্ত হিল রেগুলেশনের নিয়মকে ভিন্ন ভাবে অপব্যাখা দিয়ে জায়গা জমির কাগজপত্র নিচ্ছেন! আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি টাকা পকেটে ভরছে। জমি-ক্রয় বিক্রি ও চাকরি সহ প্রয়োজনীয় কাজে ডিসির সনদের প্রয়োজনীয়তার বাধ্যকতা সংবিধানে নেই। এমনকি তথাকথিত অসাংবিধানিক পার্বত্য চুক্তিতেও বলা নেই যে সবকিছুতে ডিসির সনদের বাধ্যকতার কথা। জমির কাগজপত্র দিয়ে ডিসির সনদ কেন নিতে হবে? জন্ম নিবন্ধন, চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট ও জাতীয় পরিচয় পত্রের কাজ কি আর?

দেশের পার্বত্যাঞ্চল ব্যতীত সমগ্র সারাদেশেই জাতীয় পরিচয় পত্রের মাধ্যমে ডিসির সনদ (স্থানীয় বাসিন্দা) পত্র গ্রহণ করতে পারে নাগরিকরা। অথচ সংবিধান ও দেশের প্রচলিত আইন কানুনকে লঙ্ঘন করে পার্বত্য তিন জেলায় স্থানীয় বাসিন্দা সনদের জন্য জমির মুল জবানবন্দি ও হেডম্যান রিপোর্ট ছাড়া ডিসিরা সনদ পত্র কিছুতেই প্রদান করছে না! বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন হতে স্থানীয় বাঙালীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। বিগত বছর গুলোতে জমির জবানবন্দি ও হেডম্যান রিপোর্ট সংগ্রহ করে বাঙালীরা দিতে না পারলেও “চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট, জন্মনিবন্ধন ও পরিচয় পরিচয় পত্র (ভোটার আইডি কার্ড)” স্থানীয় বাসিন্দা প্রমাণ পূর্বক ডিসির সনদ গ্রহণ করেছে বাঙালীরা। বর্তমানে সাম্প্রদায়িক ও উগ্রবাদী সংগঠন সহ বিভিন্ন মানসিকতার কতিপয় সরকারি কর্মকর্তারা পার্বত্যাঞ্চলে প্রশাসনে ডিসি/ইউএনও হিসেবে আসন গ্রহণ করে বাঙালীদের সঙ্গে চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করার পাশাপাশি জাতি ভেদাভেদ ও নানান জটিলতা তৈরি করছে! এটা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। অসাংবিধানিক তথাকথিত হিল রেগুলেশনের কাছে রাষ্ট্রীয় আইন কার্যকর হতে পারে না। এর বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা প্রয়োজন। বিতর্কিত ডিসির সনদ পার্বত্য বাঙালীদের মৌলিক অধিকার হরণ করে।

দ্বিতীয় পর্ব- পার্বত্যাঞ্চলে হিল রেগুলেশনের প্রথাগত নিয়মের দোহাই দিয়ে ও এর অপব্যাখা দিয়ে জমি-ক্রয় বিক্রি, চাকরি, শিক্ষা সহ সকল প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ডিসির সনদ বাধ্যতা করেছে৷ এর কারণে এই অঞ্চলের বাঙালীরা চরমভাবে হয়রানির শিকার হয়। এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদীত ও বাঙালির প্রতি চরমবৈষম্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। ১৯০০ সালের হিল রেগুলেশনের কোথাও বলা নেই, এমনকি সংবিধানেও কোথাও উল্লেখ নেই যে “ডিসির সনদ ( স্থানীয় বাসিন্দা সনদ পত্র) এর” ক্ষেত্রে জমির মূল জবানবন্দির বাধ্যকতার কথা। তবুও ১৯০০ সালের বৃটিশ কর্তৃক প্রদত্ত হিল রেগুলেশনের অপব্যাখা দিয়ে জমির জবানবন্দির দোহাই দিয়ে স্থানীয় বাঙালীদের থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে! ডিসির সনদ নিতে অনেক সময় ২০/৩০ হাজার টাকা যায়! এখন অনলাইন ব্যবস্থার কারণে ডিসির সনদে ২০০০ থেকে ৫০০০ টাকার মাধ্যমে পাওয়া যায়। তার অধিক আদায় করা হয় পার্বত্য জেলা গুলোতে! যেটা বাংলাদেশের অন্য কোথাও করার ইতিহাস নেই। বাংলাদেশ সংবিধানে স্থানীয় বাসিন্দা সনদ সংগ্রহের জন্য জমির জবানবন্দি, খতিয়ান দাখিল করার এখতিয়ার কখনোও ছিল না। নিজেদের জাহির করতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং তথাকথিত হিল রেগুলেশনের প্রথাগত নিয়মের অপব্যাখা দিয়ে অসহায় নিরিহ বাঙালীদের হয়রানি করছে ডিসি ও তার ইউএনও’রা৷ এই হয়রানির শেষ কোথায়? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সন্তানের পিতার নামে জমি নেই, জমি রয়েছে দাদার নামে তখন নিজ পিতার নামে সম্পত্তি না থাকার কারণে স্থানীয় বাসিন্দা সনদ পত্র দেন না জেলা প্রশাসক! এমনকি পিতার নামে সম্পত্তি রয়েছে কিন্তু নিজ নামে সম্পত্তি না থাকার কারণেইও বাসিন্দা সনদ লাভ করা হয় না! গত ২০১৮ সালে বান্দরবানের বোমং সার্কেল চীফের কারসাজির কারণে জেলা প্রশাসক “ডিসি সনদ ” দিতে অস্বীকৃতি জানায় পার্বত্য বাঙালীদের। এই নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল বোমং সার্কেলের কতিপয় রাজার বিরুদ্ধে।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় জমির জবানবন্দি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার কারণে ব্যাংকে জমা থাকে। এই ক্ষেত্রে শুধু বাঙালীদের হাতে থাকে জমির জবানবন্দির ফটোকপি। এই ফটো কপিও গ্রহণ করেনা ডিসির সনদের যাচাই-বাছাই কাজের দায়িত্ব প্রাপ্ত ইউএনও’রা। কোন ব্যক্তি জায়গা বিক্রি করে দিলে তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা হতে বঞ্চিত করা হয় অসাংবিধানিক ভাবে।


তৃৃতীয় পর্ব- পার্বত্য বাঙালীরা অবহেলিত অসহায়, পরিবার পরিজন নিয়ে দুমুঠো ভাত খাওয়ার মত কর্মসংস্থান নেই।
বছরের পর বছর মানবেতর জীবনযাপন করে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য সৃষ্টির কারণে। যদিও রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে বাঙালীদের পাহাড়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু রাষ্ট্র বাঙালীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেনি। তাই বাধ্য হয়ে সরকার দেওয়া বন্দোবস্তোকৃত অনাবাদি ভূমি অনেকেই আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বিক্রি করে দেয়। সে ক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তি ও তার সন্তানরা স্থানীয় বাসিন্দা সনদ লাভ করে না! জায়গা জমি ক্রয়-বিক্রি ও চাকরি-বাকরি হতে চিরতরে বঞ্চিত হতে হয় এর মাধ্যমে। সংবিধান মতে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে ৫ টি অধিকার নিশ্চিত করবে। তার মধ্যে অন্যতম বাসস্থান। আর এই বাসস্থান হতে হাজার হাজার পার্বত্য বাঙালীকে ডিসি/ইউএনও’রা বঞ্চিত করে! কিন্তু এর মধ্যেও আশার আলো জেগেছিল: অনেক সময় দেখা গেছে পার্বত্যাঞ্চলে অনেক দেশপ্রেমিক ডিসি/ইউএনও’রা স্থানীয় বাসিন্দা সনদ পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে জবানবন্দি ও হেডম্যান রিপোর্ট নেননি। শুধু চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট, জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয় পত্রের মাধ্যমে বাসিন্দা সনদ প্রদান করেছে৷ যার যেটা ছিল সে সেটা দিয়ে পেয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা সনদ পত্র। সংবিধানকে গুরুত্ব দিয়ে ডিসিরা তা প্রদান করছে এবং ইউএনও’দের বলেছে সংবিধানের বাহিরে যাওয়ার সুযোগ নেই৷ কিন্তু এই যুগের ডিসি আর ইউএনও’রা বৃটিশদের চেয়েও নবাবজাদা হয়ে গেছে। তারা পেয়েছে তাবেদারী করার পার্বত্য রাজ্য।

একজন সমতল ভূমির বাঙালী হঠাৎ করে এসে পাহাড়ে বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ নেই প্রয়োজনীয় পরিচয় পত্র ছাড়া৷ তবুও এই অজুহাতে পার্বত্য বাঙালীদের হয়রানি করছে! মূলত বর্তমানে উপজাতিরা ও কতিপয় ডিসি/ইউএনও’রা মনে করে সমতল থেকে বাঙালী আগমণ ঠেকাতে এই নিয়ম! আসলে সমতলের বাঙালী ঠেকাতে নয়, বরং তৎকালীন বৃটিশ আমলে বৃটিশ প্রশাসকরা অবৈধ বার্মিজ উপজাতি ঠেকাতে এ তথাকথিত নিয়ম চালু করে। তৎকালীন বার্মিজ উপজাতিরা বৃটিশ প্রশাসনের উপর হামলা করত, তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হেডম্যান রিপোর্টের মাধ্যমে স্থানীয় ও বহিরাগত শনাক্ত করত ডিসিরা৷ অথচ আধুনিকতার সভ্য যুগে এসেও তথাকথিত নিয়ম বাঙালীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ডিসি, ইউএনও’রা। একসময় উপজাতিদের জন্য এই নিয়ম ছিল বিষফোঁড়া। তখন উপজাতিরা স্থানীয় নাকি বহিরাগত তা শনাক্ত করার মত পদ্ধতি বা জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয় পত্র ছিল না। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রামের জমির বৈধ কাগজপত্রও ছিল না, সব খাস ভূমি ছিল৷ হেডম্যানের রিপোর্টের মাধ্যমে ডিসি বাসিন্দা সনদ প্রদান করতো। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দা ও বহিরাগত শনাক্ত করার জন্য জাতীয় পরিচয় পত্র যথেষ্ট। এর পরেও জমির জবানবন্দি/হেডম্যান রিপোর্ট কেন? এটা তো বাঙালীদের জন্য বিষফোঁড়া। পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত স্মারকেও উল্লেখ নেই ডিসি সনদের জন্য কাউকে জায়গা জমির কাগজপত্র দিতে হবে। এবং স্থানীয় বাসিন্দা সনদ পত্র ডিসি প্রদান করবে নাকি সার্কেল চীফ প্রদান করবে তারও স্পষ্ট কিছু নেই। শুধু শুধু অসাংবিধানিক ভাবে বাঙালীদের হয়রানি করার অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে হিল রেগুলেশনের অপব্যাখা দিয়ে আসছে ডিসি/ ইউএনও’রা! এর থেকে পার্বত্য বাঙালীরা খুব শীঘ্রিই অবসান চায়। বারবার বাঙালীরা দাবি জানিয়ে আসছে বিতর্কিত ডিসির সনদ অবসান করার জন্য।

চতুর্থ পর্ব- পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও পার্বত্য জেলা পরিষদের আইন অনুযায়ী সার্কেল চীপ স্থানীয় বাসিন্দা সনদ দেওয়ার কোন এখতিয়ার নেই। শুধু মাত্র যারাই পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান কিংবা সদস্য পদে প্রার্থী হবেন শুধুই তারাই হেডম্যান রিপোর্ট নিয়ে সার্কেল চীপ থেকে উপজাতি- অ-উপজাত সনদ নিতে হবে। তিন পার্বত্য জেলার ৩টি জেলা পরিষদ ও একটি আঞ্চলিক পরিষদের জন্য বাঙালি সদস্য প্রার্থী ৪০ জন্য৷ আর পার্বত্য বাঙালি ১০ লাখ প্রায়। ৪০ জন্য বাঙালির প্রয়োজন উপজাতি- অ-উপজাতি বাসিন্দা নির্ধারণের জন্য সার্কেল চীপ সনদ। ১০ লাখ বাঙালির প্রয়োজন নেই সার্কেল চীপ সনদ। সার্কেল চীপ সনদ দিয়ে জমি-জমা ক্রয় বিক্রি হয়না৷ তার জন্য প্রয়োজন স্থানীয় বাসিন্দা সনদ। সার্কেল চীপ সনদ আর স্থানীয় বাসিন্দা সনদ এক নয়। যারা না বুঝে সার্কেল সনদকে স্থানীয় বাসিন্দা সনদ মনে করছে তারা সচেতন হোন। আবার কিছু বাঙালি মনে করছে সার্কেল চীপ সনদ নিয়ে নিজেকে বাঙালি থেকে অ-উপজাতি প্রমাণ করতে হবে! শেষকথার এক কথা হল কথিত রাজার সনদ মূলহীন। কথিত রাজার সনদের কার্যকারীতা শুধু জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য প্রার্থী যে বাঙালিরা হবেন শুধু তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রাজনৈতিক নেতা ছাড়া সাধারণ বাঙালিরা জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য হবে না। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ছাড়া কেউ জেলা পরিষদের সদস্য বা আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য হয়েছে তার নজির নেই। তার ব্যতী রেখে একজন পার্বত্য বাঙালিকে উপজাতি, অ-উপজাতি প্রমাণের জন্য কথিত রাজার সনদের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। একজন নাগরিকের জন্য প্রয়োজন স্থানীয় বাসিন্দা সনদ। সারাদেশে চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রেরা স্থানীয় বাসিন্দা সনদ প্রদান করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে বৃটিশ কর্তৃক প্রণীত হিল রেগুলেশনের তথাকথিত নিয়ম যেটা বাংলাদেশ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক সেটা বাতিল করা গণ দাবি৷ ডিসির স্থানীয় বাসিন্দা সনদ অবসান করে ইউপি চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রদের বাসিন্দা সনদ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হোক। আর বর্তমানে সবার নাগরিক হিসেবে জাতীয় পরিচয় পত্র রয়েছে আর স্থানীয় বাসিন্দা সনদ হিসেবে চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট রয়েছে৷ তাতে পার্বত্য ভূমিহীনরা তার মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত হবে না। তাহলে অসাংবিধানিক প্রতিক্রিয়ার ডিসি সনদের প্রয়োজনীয়তার প্রয়োজন নেই৷ হেডম্যান রিপোর্ট ও জমির কাগজপত্র দিয়ে কেন ডিসি সনদ নিতে হবে? জাতীয় পরিচয় পত্র, জন্ম নিবন্ধন ও চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদান করা স্থানীয় বাসিন্দা সনদ কি যথেষ্ট নয়? তথাকথিত হিল রেগুলেশনের চীপ সার্কেল সনদের যেমন প্রয়োজনীয়তা নেই তেমনি ডিসি সনদের প্রয়োজনীয়তাও নেই৷ চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট যথেষ্ট একজন নাগরিকের স্থানীয় বাসিন্দা প্রমাণের জন্য৷

হেডম্যান প্রথার অবসান হোক, অবসান হোক চীপ সার্কেল সহ অসাংবিধানিক প্রতিক্রিয়ার ডিসির সনদ। স্থানীয় বাসিন্দা সনদ প্রদানের কর্তপক্ষ নির্ধারিত হোক ইউপি চেয়ারম্যান/পৌরসভার মেয়ের।

পার্বত্য চট্টগ্রাম হিল রেগুলেশন সহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বহাল সকল অসাংবিধানিক নিয়ম নীতির অবসান হোক। নো হেডম্যান রিপোর্ট, নো সার্কেল চীপ সনদ, নো ডিসি কর্তৃক অসাংবিধানিক প্রতিক্রিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা সনদ। অসাংবিধানিক উপায়ে কোন সনদ পার্বত্য বাঙালিদের জন্য যথার্থ হিসেবে নেওয়ার সুযোগ নেই৷ আমরা সারাদেশের ন্যায়ে অন্ততপক্ষে স্থানীয় বাসিন্দা সনদ প্রদানের কর্তৃপক্ষ হিসেবে ইউপি চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রের স্থানীয় বাসিন্দা সনদ আইনগত ভাবে যথেষ্ট মনে করি। আধুনিক যুগে এসেও বৃটিশ প্রশাসন কর্তৃক প্রণীত তথাকথিত প্রথা-নিয়মে পার্বত্যবাসী বন্দী থাকার প্রশ্নই আসে না। বাহির হয়ে আসতে হবে অসাংবিধানিক পার্বত্য চট্টগ্রাম হিল রেগুলেশন থেকে।

পঞ্চম পর্ব ও শেষ পর্ব- পার্বত্য চট্টগ্রাম হিল রেগুলেশন মোতাবেক প্রথাগত নিয়মে পাহাড়ে উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানুষরা ভূমির মালিক!সে হিসেবে তারা স্থানীয় বাসিন্দা সনদ পত্র কোন শর্ত ছাড়াই পাচ্ছেন। হেডম্যান উপজাতি সেই হিসেবে হেডম্যান রিপোর্ট একজন উপজাতি খুব সহজেই পাচ্ছেন। হেডম্যান রিপোর্টের মাধ্যমে ডিসি কোন শর্ত ছাড়াই উপজাতীয়দের স্থানীয় বাসিন্দা সনদ পত্র প্রদান করেন। ডিসি হতে স্থানীয় বাসিন্দা সনদ সংগ্রহ করতে এক্ষেত্রে জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। হয়রানি,বৈষম্যমূলক আচরণের শিকারও হতে হয় পার্বত্য বাঙালীদের। কারণ, উপজাতি হেডম্যানরা জমির কাগজপত্র দেখে খুব সহজে হেডম্যান রিপোর্ট প্রদান করেনা। বেশিরভাগ সময় দেখা যায় বিনিময় ছাড়া রিপোর্ট প্রদান করেনা। আর নিজ নামে জমি না থাকলে রিপোর্ট দেওয়ার প্রশ্নই আসেনা। তখন বাঙালিরা ডিসির সনদ লাভ করেনা৷ আর ডিসির সনদ প্রদান করার প্রদান শর্ত হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিজ নামে জমি থাকতে হবে। এক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেকের নিজের নামে জমি নেই, জমি আছে দাদা ও পিতার নামে। তখন ডিসির বাসিন্দা সনদ নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতায় পড়তে হয়।! এরমধ্যেই অনেক পার্বত্য বাঙালী ভূমিহীন তারা স্থানীয় বাসিন্দা সনদ হতে চিরতরে বঞ্চিত। পার্বত্য অসাংবিধানিক আইনে যা কিছু থাকুক না কেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও প্রচলিত আইনকে আধুনিক সভ্যতার যুগে এসেও বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন রাষ্ট্র দ্রোহীতার সামিল।

ডিসি সনদ নেওয়া অনেক ভোগান্তি। কিছু কতিপয় ব্যক্তি ডিসি সনদ মানুষদের পাইয়ে দেওয়ার জন্য মোটা অংকের টাকা নিয়ে দালালী করেন। তারা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা নেয় একটি ডিসি সনদের জন্য৷ অনেক দালাল অনলাইন যুগে এসেও ৬০০ টাকার ডিসি সনদ ১৫০০/২০০০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। যারা জমি বিক্রি করে দিয়েছে বা নেই ভূমিহীন তাদের ক্ষেত্রে ১০/২০ হাজার টাকা খরচ করে হেডম্যান রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হয় দালালদের মাধ্যমে। আবার দালালদের ১৫০০/২০০০ টাকা দিয়ে অনলাইনে ডিসি সনদ পেতে আবেদন করতে হয়। অথচ এ আবেদনে সর্বোচ্চ খরচ ৬০০/৭০০ টাকা! মুষ্টিমেয় এরাই বর্তমানে অসাংবিধানিক ডিসি সনদের পক্ষে অবস্থান কারী! আবার কিছু মানুষ আছে যারা অসাংবিধানিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে নেওয়া ডিসি সনদকে বৈধতা দেওয়ার জন্য অপপ্রচারে লিপ্ত। তারা অসাংবিধানিক ডিসি সনদ বাতিল হয়ে গেলে সার্কেল চীপ সনদের অসাংবিধানিক বিতর্কিত প্রথা চালু হবে বলে অপপ্রচার করে যাচ্ছে। এটা মানুষদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার লক্ষে করছে। তারা মনে করে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে শুধু তারাই সবকিছু জানে বাকী পার্বত্য বাঙালীরা অজ্ঞ! মূল কথা হচ্ছে, তারা বিভাজনকারী তাদের লক্ষ উর্দেশ্য যথার্থ নয়। এরা পার্বত্য চট্টগ্রামে সব সময় অসাংবিধানিক, বৈষম্য অনিয়ম চলমান রাখার পক্ষে। সাংবিধানিক একটি দাবি “বিতর্কিত উপায়ের ডিসি সনদ অবসান” তার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান! সত্যি এটা দুঃখজনক। প্রথম পর্ব হতে শেষ পঞ্চম পর্ব পর্যন্ত লেখাটি সম্পূর্ণ না পড়েই আবার কিছু সচেতন মানুষ দাবী করছে ডিসি সনদ প্রথা বাতিল হলে নাকি সার্কেল চীপ প্রথা চালু হবে! একটি লেখার সম্পূর্ণ না পড়ে বিভ্রান্তিমূলক এমন মন্তব্য করা এটা যেমন অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। বলা যায়, নিজেকে অতিরিক্ত বুদ্ধি পাকনা হিসেবে প্রকাশ করারও বহিঃপ্রকাশ এটিই। ডিসির অসাংবিধানিক বিতর্কিত সনদ প্রসঙ্গ নিয়ে লেখাটির সমগ্র পর্বের লেখা না পড়ে যারা বিরূপ মন্তব্য করেছে আশা করি তাদের ভুল ভাংবে ” চতুর্থ পর্ব ও শেষ পঞ্চম পর্ব পর্যন্ত লেখাটি পড়ে।” লেখাতে ডিসির স্থানীয় বাসিন্দা সনদ, হেডম্যান রিপোর্ট ও চীপ সার্কেল চীপ প্রথা অবসানের সুস্পষ্ট ভাবে বর্ণনা দিয়ে সংবিধানের পক্ষে অবস্থান করা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্বা রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের অসাংবিধানিক তথাকথিত হিল রেগুলেশন বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ডিসি সনদ অবসানের প্রসঙ্গটি তুলে ধরা হয়েছে। লেখাটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর ভাবে শেয়ার হয়েছে। অগণিত মানুষ লেখার পক্ষেই সমর্থন জুগিয়েছে। পর্ব চলমান অবস্থায় প্রচুর সাপোর্ট পাওয়া গেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ৯৯% মানুষ লেখাটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। প্রথম পর্ব/দ্বিতীয় পর্ব পড়ে হাতেগোনা কিছু ব্যক্তি লেখার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে শেষ পর্ব পর্যন্ত না পড়ে। উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রচারণার পাশাপাশি কটূকথাও বলেছে অনেক! পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের বৃহৎ স্বার্থের কথা বিবেচনা করে লেখাটির বিরুদ্ধে অবস্থান না করে ভুলত্রুটি সংশোধনের জন্য মতামত দেওয়া একজন পার্বত্য বাঙালি হিসেবে সকলেরই কর্তব্য। অথচ তা না করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজার মানুষের গণ দাবির সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করে অপপ্রচারে লিপ্ত হওয়া কতটুকুই বিবেকবান মানুষের কাজ তারই ভালো বলতে পারে! যারা যুক্তি দিয়ে গঠনমূলক পরামর্শ দিয়েছেন তাদের অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। আমাদের সবার সবার প্রতি পারস্পরিক সম্পর্ক ও শ্রদ্বাবোধ রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং বাঙালীদের মৌলিক অধিকার হরণ করার দিকগুলো হতে মুক্তির পথ বাহির করা বর্তমান সময়ে খুবই জরুরী৷ পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কারোরই অবদানকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই৷ এখানে সকলের লক্ষ্য উদ্দেশ্য এক হওয়া উচিত। এতে জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ হবে।

আমাদের সকলেরই প্রাণের দাবি এবং গণ দাবি অসাংবিধানিক ডিসি সনদ, হেডম্যান রিপোর্ট ও তথাকথিত সার্কেল চীপ প্রথা অবসান৷ আমরা চাই সমতলের মত পার্বত্য চট্টগ্রামেও স্থানীয় বাসিন্দা সনদ চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রেরা প্রদান করুক। এই পদ্ধতি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস্তবায়িত হলে উপজাতি-বাঙালী সকলেই উপকৃত হবে এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলমান জটিলতা,বৈষম্য অন্যায় এরমধ্য দিয়ে অবসান হবে।

সর্বশেষ বলব, লেখায় ভুলত্রুটি আমাদেরও থাকতে পারে, তাই সকলে ভুল গুলো সুন্দর ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

মতামত

x