এখন সামাজিক মিডিয়ায় দু’টো ছবি ঘুরছে। একটাতে দেখা যাচ্ছে, এক চাকমা ছেলে বাঙালি মেয়ে বিয়ে করেছে; আর অন্যটাতে এক চাকমা মেয়ে এক বিদেশী (ভারতীয় বংশোদ্ভুত) ছেলে বিয়ে করেছে। কে কাকে বিয়ে করলো বা কে কাকে বিয়ে করবে এতে আমার কোন প্রতিক্রিয়া নেই। অর্থাৎ এতে আমার সমর্থন কিংবা বিরোধিতা নেই। এখানে আমি নিরপেক্ষ, নিস্পৃহ। বৌদ্ধধর্মের পরিভাষায় উপেক্ষা ভাব পোষণ করি। এই কথা বলাতে কারোর যদি এলার্জিও হয়, তাকে অনুরোধ করবো মৈত্রী ভাবনা করতে। আর আমিও মৈত্রী চিত্তে ‘জাত প্রেম’ সম্পর্কিত চিন্তার খোরাক হিসেবে দু’এক কথা বলার চেষ্টা করছি।

এক সময়, বলতে গেলে যখন ছাত্র ছিলাম (মোটামুটি কলেজ জীবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষ পর্যন্ত বলা যায়) তখন আমারও অন্ধ ‘জাত প্রেম’ ছিলো। পরে কেন জানি সেটা মিইয়ে গেছে। সেটা হতে পারে মাল্টিকালচারাল পরিবেশে থাকার কারণে কিংবা সমাজ বিজ্ঞান অধ্যয়নের পরিধি বাড়ার কারণে। এ ব্যাপারে আর কথা নাই বাড়ালাম।

জাতপ্রেম নিয়ে যেহেতু ফেসবুক সরগরম হয়ে উঠেছে, সেহেতু এই সম্পর্কিত আমার দেখা একটা বাস্তব ঘটনার কথা বলবো। আর একটা নিজস্ব পর্যবেক্ষণের কথা বলবো। আমার পর্যবেক্ষণ নিয়ে কারোর একমত হতে হবে এমন কোন কথা নেই।

প্রথমে বাস্তব ঘটনার কথা বলি।
আজ থেকে ২৩-২৪ বছর আগের কথা। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ছুটিতে রাঙ্গামাটি এসেছিলাম। রাঙ্গাপানিতে। তখন ঘর বলতে আমার মামার বাড়ীই হলো আমার ঘর। ছুটি পেলে নানীর কাছে আসতাম। একদিন রাতের বেলায় (৮ – ৯ টার দিকে হবে) একদল যুবক এক মেয়েকে ধরে নিয়ে এলো। আমার ছোট নানা রাঙ্গাপানি গ্রামের কার্বারী। কার্বারীর বাড়ীতে ঐ মেয়েকে ধরে নিয়ে এলো। যারা ধরে নিয়ে এলো তারা অনেকেই আমার চেনা পরিচিত ছিলো। বয়সেও ছোট ছিলো। ঐ মেয়ের অপরাধ কি ছিলো? সেই মেয়েটি নাকি সন্ধ্যা বেলায় পর্যটন এলাকার দিকে অন্য জাতির ছেলের সাথে ‘ফষ্টিনষ্টি’ করতে গিয়েছিলো। সেখান থেকে একদল জুম্ম যুবক ঐ মেয়েকে ধরে নিয়ে এসে (ওদের ভাষায় উদ্ধার করে এনেছিলো) কার্বারীর আদালতে সোপর্দ করতে এনেছিলো। হ্যাচারি ফেরি পার হয়ে বর্তমান রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজের প্রস্তাবিত জায়গা হয়ে জঙ্গল পার হয়ে কার্বারী নানার বাড়ীতে নিয়ে এসেছিলো। তখন আমি নানার বাড়ীতে ছিলাম। হঠাৎ দেখি অনেক লোক দল বেঁধে নানার বাড়ীতে উপস্থিত। কার্বারী নানাকে খুঁজছিলো। পরে বাড়ীর উঠোনে বসে নানা তাদের বয়ান শুনছিলেন। ছেলেদের উদ্দেশ্য হলো মেয়েকে নানার বাড়ীতে দিয়ে যাওয়া এবং নানা কার্বারী হিসেবে যেন ঐ মেয়ের অভিভাবকদের ডেকে শাসন করেন এবং মেয়েকে মা-বাবার হাতে তুলে দেন।

ছেলেদের এবং মেয়ের বয়ান শুনে নানা বললেন, তার পক্ষে মেয়েকে তার বাড়ীতে রাখা সম্ভব নয়। তার যুক্তি হলো, মেয়েটি যেহেতু রাঙ্গাপানি গ্রামের নয়, সেহেতু তার পক্ষে তাকে রাখা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, যে কথিত অপরাধের জন্য মেয়েকে তুলে আনা হয়েছে, সেটা কার্বারী হিসেবে তার পক্ষে বিচার করা সম্ভব নয়।

মেয়েটি খুবই অকপটে একটা ভয়ংকর কথা বলেছিলো। ছেলেরা তাকে ধরে নিয়ে আসার সময় একটা ছেলে তাকে নির্জন জঙ্গলে পেছনে ধরে রেখেছিলো। সেই সময় ছেলেটা তাকে ‘যাবেয়ে’ (চাকমা ভাষায় বলেছিলো)। সেই কথা শুনে কার্বারী নানা কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না। এর মধ্যে রাঙ্গাপানি গ্রামের যুব সভাপতি ও অনেক যুবক উপস্থিত হয়েছিলেন। ‘যাবেয়ে’ কথা শুনে তারা ক্ষেপে গেলেন। তখন ঐ ছেলেদের উপর চড়াও হওয়ার মত উপক্রম। রাঙ্গাপানি গ্রামের যুবকরা বলাবলি শুরু করলো, “বেক পচালজা রাঙাপান্যাত আনি দো দে…দো, মরত্তো আর মিলাবোরে ইক্কে জোড়া বানি দো (সব পচা জিনিস রাঙ্গাপানি গ্রামে এনে দিচ্ছো…দাও, এখনই ছেলে আর মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দাও”। তখন পরিস্থিতি অন্যরকম হয়ে গেলো।

এদিকে মেয়েটা ঐ ছেলেকে সেই মুহুর্তে বিয়ে করতে রাজী। কিন্তু সেই ছেলেটা রাজী নয়। সেই মেয়েটি ঐ ছেলের দলের মধ্য থেকে যে কোন ছেলে পেলেও বিয়ে করতে রাজী। কিন্তু কোন [চাকমা] ছেলে ঐ মেয়েকে বিয়ে করতে রাজী হলো না। একটা চাকমা মেয়ে চাকমা জাতি থেকে বিচ্যূত হয়ে যাচ্ছে দেখে ঐ ছেলেরা তাকে ধরে নিয়ে এলো এবং নিয়ে আসার পথে সেই মেয়ের ইজ্জত হরণ করলো। এখন ঐ মেয়ে যখন কোন চাকমা ছেলেকে বিয়ে করতে চাইলো, কিন্তু কেউ তাকে গ্রহণ করলো না! এই হলো জাত রক্ষার নমুনা!

শেষ পর্যন্ত এক বড়ভাই (ছাত্রনেতা, বর্তমানে প্রয়াত) এসে ঐ ছেলেদের নিয়ে গেলেন এবং মেয়েকে তার বাড়ীতে যেতে কিছু দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলেন।

এখানে ঐ মেয়েটার সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরা দরকার। মেয়েটির বাড়ী রাঙ্গামাটি শহরের অদূরে। তার মা মারা গেছেন বেশ অনেক আগে। তার বাবা আরো একজনকে বিয়ে করেছেন। মেয়েটির বয়স ২০-২২ হবে। লেখাপড়া খুব বেশি করতে পারেনি। তার বয়ান অনুসারে, পারিবারের আর্থিক অবস্থাও খুব বেশি ভালো নয়। সৎ মায়ের সংসারে খুব একটা স্বস্তিতে ছিলো না। মানসিক প্রশান্তি খুঁজতে সঙ্গী সাথীদের সাথে ঘুরতে যেতো। বেশির ভাগ সময় বাড়ীর বাইরে থাকতো। বাবা কিংবা পরিবারের সাথেও সম্পর্ক খুব একটা দৃঢ় ছিলো না। অন্য জাতির কোন ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিলো, সেটা অস্বীকার করেছে। চেনা জানা কারোর সাথে ঘুরতে যেতো এই কথা বলেছিলো। সেই ঘুরতে যাওয়াটাই তার কাল হয়েছিলো। জাত প্রেমীরা তাকে উদ্ধার করতে গিয়েছিলো।

খুব সম্ভবত ঐ মেয়েটি এরকম ‘উদ্ধার অভিযানে’ ধরাপড়া একমাত্র মেয়ে নয়। সামাজিক মিডিয়ার সৌজন্যে আমরা মাঝে মাঝে মেয়ে পেটানোর ঘটনা দেখতে পাই। কিন্তু ঐসব ঘটনাগুলো আড়ালে থেকে যায়। কার্য-কারণ জানার সুযোগও নেই।

ঐ ঘটনা তুলে ধরার একটাই কারণ – জাত প্রেমীদের চিন্তার খোরাক জোগানো। শুধু চাকমা মেয়েদের অন্য জাতির ছেলেদের সাথে বিয়ে ঠেকিয়ে জাত রক্ষার কথা চিন্তা করছেন? সামগ্রিকভাবে সমাজ এখন কোন অবস্থায় আছে – কোন সমাজ বিশ্লেষণ আছে কি? মারপিট কিংবা হুমকি ধামকি দিয়ে ‘জাতির মেয়েদের’ চলে যাওয়া রোধ হবে?
~~~

এখন চাকমা ছেলেদের অন্য জাতির মেয়ে সাথে বিয়ে নিয়ে, খুব সোজা কথায় বলি বাঙালি মেয়ে বিয়ে করা নিয়ে চাকমা ছেলেদের প্রতিক্রিয়া কি?

চাকমা ছেলের বাঙালি মেয়ে বিয়ে করা নিয়ে আমার একটা খুব সাধারণ পর্যবেক্ষণ বা অনুসিদ্ধান্ত হলো: চাকমা মেয়েদের বাঙালি ছেলে বিয়ে করার চেয়ে চাকমা ছেলেরা যদি বাঙালি মেয়ে বিয়ে করে তাহলে চাকমা জাতি দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কেন হবে?

জাত প্রেমীরা চাইলে এই প্রশ্ন নিয়ে গবেষণা করতে পারেন। শুধু একটা সূত্র হিসেবে উল্লেখ করছি, আমার দেখা যেসব চাকমা ছেলে বাঙালি বিয়ে করেছেন, তারা কখনোই চাকমা সমাজে ফিরে আসেননি। বাঙালি সমাজের সাথে আত্মীভূত হয়ে গেছেন অথবা সমাজ থেকে অনেক দূরে সরে আছেন। এখন ঐ পুরুষ চাকমাকে চাকমা জাতির মধ্যে রাখবেন নাকি বাদ দেবেন সেই সিদ্ধান্ত জাত প্রেমীদের।

এদিকে অনেক চাকমা মেয়ে বাঙালি ছেলে বিয়ে করেছেন। তার সঠিক হিসেবও নেই। তাদের মধ্যে অনেকে কষ্টে আছেন; অনেকে স্বামী সংসার নিয়ে বেশ ভালো আছেন। তবে মেয়েদের দেখেছি, তারা সমাজের মানুষের কাছ থেকে অনেক উপহাস, লাঞ্জনা-গঞ্জনা পেলেও চাকমা সমাজে আসার চেষ্টা করেন। অনেকে নিজেদের পোষাক পরে চাকমা পরিচিতি ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। জাত প্রেমীরা মেয়েদের এই বিষয়টাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

অপ্রাসঙ্গিক বিষয় হলেও এটা উল্লেখ করতে চাই। ‘৭০ দশকে জেএসএস যখন স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবী নিয়ে আন্দোলন শুরু করলো, জুম্ম হিসেবে আত্মপরিচিতির দাবী তুললো, তখন ঐ দাবী নাকচ করে দিয়ে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদে অন্ধ হয়ে কোন এক জেনারেল ঘোষণা করেছিলেন, পাহাড়ের প্রতিটি ’উপজাতি’র মহিলার গর্ভে বাঙালির সন্তান জন্মাবে। তাহলে আর এরকম আলাদা আন্দোলন গড়ে উঠবে না। কিন্তু ঐ জেনারেল সেই সময়ে যদি উপলব্ধি করতেন, পাহাড়ের প্রতিটি চাকমার বাড়ীতে এক একটা করে বাঙালি মেয়ে বিয়ে দেওয়া হবে, তাহলে এতদিন চাকমা জাতি খতম হয়ে যেতো। ”পাহাড়ি-বাঙালি ভাই ভাই” বাস্তব সত্যে পরিণত হতো।

[বি:দ্র: আমার এই লেখা কাউকে হেয় করার জন্য নয়, বরং চিন্তার খোরাক হিসেবে এই নোটটা লেখা। কারোর কোন সমাজ বিশ্লেষণ থাকলে লিখতে পারেন। লেখা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গঠনমূলক হলে আলোচনা করতেও ভালো লাগে।)

লেখক: অশোক কুমার চাকমা, নির্বাহী পরিচালক মনোঘর

ফেসবুক পোস্ট লিংক…
https://www.facebook.com/835945698/posts/10159735229510699/

By admin

মতামত

x