ফেসবুক মন্তব্য   

লোগাং নামে খাগড়াছড়ি জেলায় একটা জায়গা আছে, যার নদীর নাম “লোগাং” শব্দটির অর্থ রক্তের নদী। লোগাং পাহাড়ি ভাষা, এক দিন লোগাং সত্যি সত্যি তার নামের সার্থকতা রেখেছিল!! আজ থেকে ২৭ বছর আগে এই দিনে লোগাং এলাকাটি সত্যি মানুষের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল, জানেন সেটা কাদের রক্তে?? আপনাদের ভাষায় -সেটেলার চেদহাবা তথা বাঙালীর রক্তে। আসলে কি ঘটেছিল সেদিন?? ১০ এপ্রিল ১৯৯২ সালের দুপুর, আর দুদিন পরেই শুরু হবে বাঙালীদের প্রাণের উৎসব বর্ষবরণ নতুন বছর। তাই গ্রামের সবাই সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঘর বাড়ি সাজাচ্ছিল, বাজার সদাই করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কেউ দুপুরে খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। হঠাৎ করে শান্তিবাহিনী (তৎকালীন সন্তু লারমার জানোয়ার) গ্রুপের সদস্যের উপস্থিতিতে বিশ্বের ভয়ংকর অস্ত্রশস্ত্র হাতে গুচ্ছগ্রামে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা তীব্বতীয়, মঙ্গোলীয়, বার্মা, ভারত থেকে আগত (বৃটিশদের পুনর্বাসিত উপজাতি, যারা মূলত দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যাবহৃত হয়) মুহুর্তের মধ্যে শান্ত জনপদটি পরিণত হয় রক্তাক্ত এক জনপদে। ছেলে থেকে বুড়ো, দুধের শিশু থেকে নারীরা পর্যন্ত কেউ রেহাই পায়নি সে আক্রমণে। কেউ কেউ ক্ষত বিক্ষত শরীর নিয়ে পালাতে পেরেছে, যারা পালাতে পারেনি তারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে এবং সবশেষ পাহাড়িদের দেওয়া আগুণে পুড়ে মারা গেছে। চারদিকে লাশের স্তুপ, ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল হতভাগ্য মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কিংবা পোড়া হাড়গোড়। সেদিনের সেই সম্মিলিত তান্ডবলীলায় প্রায় ৮০০-৯০০ এর মত বাঙালী মারা যায়, এবং আহত হয় প্রচুর। দূর থেকে চোখের সামনেই পিতা-মাতা, ভাইবোন, আত্মীয় স্বজনদের ভিনদেশী বহিরাগতদের রামদা, তীর ধনুক, বন্দুক, লাঠিসোটার উপর্যুপরি আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে মর‍তে দেখে কোনরকমভাবে পালিয়ে বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীরা। পরবর্তীতে বলা হয়, সেনাবাহিনী নাকি পাহাড়িদের কোন এক জুম্মচাষীকে ধরে নিয়ে যায় একার নাকি এ সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে। অথচ মূল ঘটনার কাহিনী হল, একজন বাঙালী মহিলা ঘটনার দিন কয়েক আগে তার গরু চড়াতে মাঠে যায়। পথিমধ্যে সন্ত্রাসী কিছু পাহাড়ি যুবক তাকে ধর্ষণের চেষ্টা চালালে সে হাতের কাছে থাকা দা দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা চালায়। তখন পাহাড়ি যুবকরা আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে, বাঙ্গালী মহিলাকে ধর্ষণ ও হত্যা করার চেষ্টা করে। হঠাৎ কবির হোসেন নামে এক বাঙ্গালী এসে পেছন থেকে পাহাড়ি এক যুবকের মাথায় আঘাত করে। তাৎক্ষণিক মহিলা দৌড়ে পালিয়ে গিয়ে নিজেকে রক্ষা করে। পরে বাঙ্গালী কবির হোসেনকে হত্যা করে। বাঙ্গালী মহিলার কোপে একজন পাহাড়ি যুবক মারাত্মকভাবে আহত হয় এবং পরবর্তীতে আহত পাহাড়ি যুবককে স্বজাতি তথাকথিত শান্তিবাহিনী হত্যা করে উত্তেজনা ইস্যু সৃষ্টি করে। এতে করে পাহাড়িদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে এবং তারা বিনা উস্কানিতে তথাকথিত শান্তিবাহিনীর অংশগ্রহনেই অস্ত্রশস্ত্রসহ বাঙালী গ্রামে হামলা চালায়। এর পর আহত নিহতের সংখ্যা আর আক্রমণকারী নিয়ে তৎকালীন গণমাধ্যমে চলে সর্বচ্চো মিথ্যাচার। এমনকি এর দায়ভার সেনাবাহিনী আর বাঙালীদের উপর পর্যন্ত চাপিয়ে দেওয়ার নগ্ন চেষ্টা চলে। আর সে সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে গণমাধ্যমের প্রবেশ ছিল আর বস্তুনিরপেক্ষ সংবাদ ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। সেই সময়েও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংবাদে অদৃশ্য সেন্সর আরোপ করে দিত শান্তিবাহিনী, যেটা আজো জারি রয়েছে। এইখানকার সাংবাদিকরা উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যে হামলাকে দুর্বৃত্তদের হামলা বলে চালিয়ে দেয়। শান্তিবাহিনীর অপহরণ, হত্যার হুমকির ভয়ে মিডিয়া সত্য প্রকাশ করতো না। আজো সেই সময়ে শান্তিবাহিনীতে থাকা লোকজন সেসব ঘটবার কথা অস্বীকার করতে চায়, সন্তু লারমা পর্যন্ত মিথ্যা হিসেবে প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু পারেনা, সত্য সত্য হিসেবেই প্রকাশ পায়। এই বাঙ্গালী গণহত্যাকে দামাচাপা দিতে সন্তু লারমার নেতৃত্বধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) তথাকথিত শান্তিবাহিনী পরবর্তীতে লোগাং এলাকায় স্বজাতি পাহাড়িদের হত্যার মিশন চালু করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা থেকে কতিপয় মিডিয়া সাংবাদিক এনে পাহাড়ি হত্যাকান্ডের বিষয়টি বাঙ্গালীর উপর চাপিয়ে দেয়। এবং পাহাড়িদের কিছু লাশের ছবি তোলে সংবাদমাধ্যমে বাঙ্গালী কর্তৃক পাহাড়ি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে বলে প্রচার করা হয়। অথচ বাড়িঘরের অগ্নিসংযোগ পাহাড়িদের হত্যা সন্তু লারমার শান্তিবাহিনী করেছিলো মূল ঘটনা দামাচাপা দিতে। নিরীহ পাহাড়ি লোকদের ভারতে যেতে বাধ্য করেছিলো সন্তু লারমার শান্তিবাহিনী। বর্তমান প্রজন্মের বাঙালীদের ভিতরে পূর্বের এই লোগাং গণহত্যাটির প্রকৃত সঠিক ইতিহাস জানা নেই!! ভুলতে বসছে লোগাং গণহত্যাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর বাঙালী গণহত্যা এইটি। লোগাং গণহত্যা নিয়ে বিভিন্ন লেখক বিভিন্ন ভাবে লিখলেও প্রকৃত সত্য কেউ উদঘাটন করতে পারেনি। পাহাড়ি ও তথাকথিত শান্তিবাহিনীর সেই বর্বরোচিত হত্যাকান্ড পার্বত্য ইতিহাসে চিরদিন সরণী হয়ে থাকবে। হয়ত এই বাঙালী গণহত্যাকে জাতীয় ভাবে কেউ মনে রাখবে না, রাখার কথাও না!!

এই লেখাটি সম্পূর্ণ লেখকের একান্ত অভিমত।    

By admin

মতামত

x