Home / অপরাধ / মুই মরিলে মরিবং তারারে নডরাং, ইজচ্চে ওলেও মরিবং হিল্লে ওলেও মরিবং!

মুই মরিলে মরিবং তারারে নডরাং, ইজচ্চে ওলেও মরিবং হিল্লে ওলেও মরিবং!

||নিজেস্ব প্রতিনিধি||

হিল নিউজ বিডি.কম- রাঙ্গামাটি নানিয়ারচর বাজার বর্জন করেছে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙ্গালী, বাজারটি চালু করতে প্রশাসনের বিন্দুমাত্র উদ্যোগ নেই!

সরেজমিনে নানিয়ারচর থেকে বিশেষ প্রতিবেদন।

গত ১৮ মার্চ ৫ম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে স্বজাতীয় জেএসএস সংস্কার এম,এন সমর্থিত প্রার্থী প্রগতি চাকমার সঙ্গে নির্বাচনে হেরে যায় ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থী। এরই জের ধরে নানিয়ারচর বাজার বর্জনের ডাক দেয় পার্বত্য শান্তিচুক্তি বিরোধী সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপ। স্থানীয় উপজাতিদের হুমকি দিয়ে বাজার বর্জন করতে বাধ্য করে সন্ত্রাসীরা৷ যার কারণে ১ মাসেরও অধিক সময় ধরে উপজাতীয়রা নানিয়ারচর বাজারে আসেনা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাজারে শতাধিক ব্যবসায়ী।

নানিয়ারচর বাজারের একজন হোটেল ব্যবসায়ী জানান, সাপ্তাহে একদিন বুধবার নানিয়ারচর হাটবাজার মিলে। সাধারণ-পাহাড়ি বাঙ্গালী বাজারে ক্রয় বিক্রয় সহ নানান কাজে বাজারে মিলিত হতো কিন্তু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা বাজারটি বর্জন করে৷ এতে আমরা ব্যবসায়ীরা খুবই ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হলাম৷ হোটেলে বেচাকেনা নেই৷ এইখানেই সামান্য কিছু বাঙ্গালীর উপর নির্ভর করে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। তিনি আরো জানান, বাজার বন্ধের পেছনে স্থানীয় জাতীয় রাজনৈতিক দলের কিছু বাঙ্গালী কতিপয় নেতা জড়িত রয়েছে বলে জানান এই হোটেল ব্যবসায়ী৷

নানিয়ারচর পুরো বাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বাজারে ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা আর ক্ষোভের আবির্ভাব। আমাদের দেখে ব্যবসায়ীরা জানান, নানিয়ারচর বাজার চালু করার জন্য যাতে একটা সমাধান আমরা করি এবং বাজারটি চালু করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি৷ এত বড় বাজারের জনশূন্যর বিষয়টি চোখে পড়ে! স্থানীয়দের অভিযোগ বাজারটি চালু করতে প্রশাসনের ভূমিকা রহস্যজনক।বাজার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ শুনে বাজারের শেষ পর্যায়ে অবস্থিত নানিয়ারচর থানা ও উপজেলা পরিষদে গেলাম৷ থানা ও উপজেলা পরিষদ ঘুরে আমাদের মধ্যেও একধরণের আতঙ্ক সৃষ্টি হল। যার কারণ হচ্ছে, এই থানা ও উপজেলা পরিষদের সামনে নিজের অফিসে যাওয়ার গেটের সামনে গতবছর মে মাসে উক্ত উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। শক্তিমান চাকমা ছিলেন জেএসএস সংস্কার এম, এন গ্রুপের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি। প্রতিহিংসার জেরে স্বজাতীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কর্তৃক তিনি নিহত হন। তিনি নিহত হওয়ার পর থেকে উত্তপ্ত নানিয়ারচর। সন্ত্রাসী সংগঠনের মধ্যে চলে অপহরণ চাঁদাবাজি প্রতিপক্ষ দমনের হিড়িক।

উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্যে যাওয়ার সময় গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ এর প্রধান তপন জোতি বর্মা ও মাইক্রো গাড়ির বাঙ্গালীর ড্রাইভার সহ ৫ জনকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী৷ যার কারণে নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ গিয়ে আমরাও কিছুটা ভয় আতঙ্ক অনুভব করি। অথচ আমাদের পাশে মডেল থানা ও উপজেলা নির্বাহী প্রশাসনের কার্যলয়৷ থানা পুলিশ ও উপজেলা পরিষদের সামনে প্রকাশ্যে সকাল ১০ ঘটিকায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী শক্তিমান চাকমাকে হত্যা করে!!

সত্যি ও বাস্তবিক বলতে নানিয়ারচর বাসী সন্ত্রাসের স্বর্গরাজ্যে বসবাস করছে।

স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নানিয়ারচর প্রতিনিয়ত ত্রাস সৃষ্টি করা যাচ্ছে। এখানে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন নামে মাত্র রয়েছে। এই জনপদে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। নানিয়াচর বাসী প্রশাসনের উপর আর কোন ভরসা রাখতে পারছেন না৷ নিরব চোখের জল ফেলে হতাশা ও কবে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নানিয়ারচর এর কিছু ছোট ভাইদের অনুরোধে সরেজমিনে নানিয়ারচর বাজার ও উপজেলার সার্বিক পরিস্থিতি জানতে গিয়েছিলাম আমাদের একটি দল নিয়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সাথে কথা বলে যতোটুকু বুঝলাম নানিয়াচর বাজার চালু করতে তাদের বিন্দুমাত্র উদ্যোগ নেই। অন্যদিকে চোখে পড়ে বুড়িঘাট নদীর উপর সেতু নির্মাণ। এই সেতু নির্মাণের ফলে জেলার লংগদু উপজেলার সঙ্গে রাঙ্গামাটি শহরের যোগাযোগ সহজ হবে। লংগদু বাসী যাতায়াতের ফলে নানিয়ারচর উপজেলার সড়ক পথটি ব্যবহার হবে। দীর্ঘদিন থেকে রাঙ্গামাটি লংগদু উপজেলার মানুষ নৌপথে রাঙ্গামাটি শহরে যাতায়াত করতেন , এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতো। জেলা শহরে আসতে সময় ব্যয় হতো ৬-৭ ঘন্টা। দৈনিক আসা যাওয়া সম্ভব হতো না। রাঙ্গাসাটি শহরে এসে বোডিং ভাড়া করে থাকতে হতো। এই সেতু হওয়ার কারণে লংগদু উপজেলার বাসিন্দারা ২ থেকে ৩ ঘন্টার মধ্যে রাঙ্গামাটি শহরে আসতে পারবেন। অন্যদিকে বুড়িঘাট নদীতে উপজাতীয় নৌকা চালক সিন্ডিকেটের কবল থেকে মুক্তি পাবে স্থানীয় নানিয়ারচর বাসী।

নানিয়ারচর বাজার বর্জন নিয়ে কথা বলেছি বাজারে আসা তুষার কান্তি চাকমা (৫০) নামের এক উপজাতির সঙ্গে। তিনি চাকমা ভাষায় বলেন, মুই মরিলে মরিবং তারারে নডরাং, ইজচ্চে ওলেও মরিবং হিল্লে ওলেও মরিবং! যার, বাংলা ভাষায় হচ্ছে, আমি মরে গেলো যাবো তাতে সমস্যা নেই, আজকে হলেও মরতে হবে কালকে হলেও মরতে হবে৷ অস্ত্রধারীদের হুমকি শুনে আমি বাজার বর্জন করার পক্ষে নয়৷ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাজার থেকে নিতে হয়। এদের হুমকির ভয়ে কেন আমরা কষ্ট করে থাকবো? বর্তমানে যুগে বাজার ব্যতিত চলা যায় না৷ তারা সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি করে নিজেরা নিজেরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে সাধারন জনগনকে মারে৷ সাধারণ জনগণের কি অপরাধ? তারা আমাদের পাহাড়িদের দুমটো ভাতের জন্য অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি করেনা। করে নিজেদের ছেলে সন্তান পরিবারকে নিয়ে বিলাসীতা করার জন্য৷ এমন গুরুতর অভিযোগ করেন তুষার কান্তি চাকমা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কথা হয়, উক্ত এলাকায় মোটরসাইকেল ভাড়া চালিত এক উপজাতীয় যুবকের সঙ্গে। তিনি জানান, ইউপিডিএফ সব পাহাড়ির ডেকে হুমকি দিয়েছে নানিয়ারচর ও টিএন্টি বাজার বর্জন করার জন্য। এবং প্রতিটি এলাকায় হেডম্যান কার্বারীকে ডেকে সর্তক করেছে যাতে কেউ বাজারে গিয়ে পণ্য ক্রয় বিক্রি না করে। যদি কেউ এই আদেশ অমান্য করে তাকে জরিমানা ও হত্যা করা হবে মর্মে হুমকি দেওয়া হয়। ইউপিডিএফ এর হুমকির ভয়ে সাধারণ পাহাড়িরা বাজার বর্জন করতে বাধ্য হয়েছে। এখন নিকটস্থ বাজারে কেনাবেচা না করে কষ্ট করে চলতে হচ্ছে পাহাড়িদের৷ কেউ কেউ বহুদূর পাড়ি দিয়ে রাঙ্গামাটি শুভলং বাজার ও খাগড়াছড়ির মহালছড়ি বাজার থেকে নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় বাজার করে।

নানিয়াচর বাজারের বর্তমান প্রেক্ষাপট সরেজমিনে দেখতে গিয়ে আমরা পথে পথে বাধার শিকার হয়েছিলাম এবং মোবাইল ফোনে হুমকিও পেয়েছিলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে সুস্থ ভাবে রাঙ্গামাটি সদরে ফিরে আসতে পেরেছি আমাদের দলটিকে নিয়ে।

মতামত

x