ভয়াল নানিয়ারচর গণহত্যা দিবস: বিচারের অপেক্ষায় পার্বত্য বাঙালি।

0

ভয়াল নানিয়ারচর গণহত্যা দিবস: বিচারের অপেক্ষায় পার্বত্য বাঙালি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি কালো দিন বুধবার ১৭ নভেম্বর। ১৯৯৩ সালের এই দিনে রাঙামাটি জেলার দুর্গম নানিয়ারচর উপজেলায় জন সংহতি সমিতি (জেএসএস) সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালায় নিরস্ত্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর, যা বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালিদের জন্য এক অমোচনীয় ক্ষত। এই গণহত্যায় ২৬০ জনেরও বেশি বাঙালি নিহত হয়, প্রায় ১৫০ জন আহত হয়, শতাধিক ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং বাঙালি মা-বোনদের গণধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। জেএসএস-এর সহযোগী সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর কেন্দ্রীয় নেতা প্রসীত বিকাশ খীসার সরাসরি নির্দেশে এই নৃশংসতা সংঘটিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাঙালিশূন্য করে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা। কিন্তু দীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেলেও এই গণহত্যার বিচার হয়নি, স্বজনহারা পরিবারগুলোর সদস্যরা আজও প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি এবং ক্ষতিপূরণের দাবিতে আর্তনাদ করে যাচ্ছেন, অথচ রাষ্ট্র বা সমাজের কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায়নি, যা পার্বত্য বাঙালিদের মনে গভীর হতাশা এবং বিস্মৃতির ছায়া ফেলেছে।

নানিয়ারচর লঞ্চঘাট ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ, যেখান দিয়ে জেএসএস-এর সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনী প্রায়শই প্রবেশ করে নানিয়ারচর বাজার নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা এবং আশপাশের এলাকায় বাঙালিদের ওপর অতর্কিত হামলা, হত্যা, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ চালাতো, যার ফলে স্থানীয় বাঙালিরা দীর্ঘদিন ধরে লঞ্চঘাটে একটি চেকপোস্ট বা সেনা চৌকি স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছিল। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সেখানে চেক পোস্টের আদলে সেনা নিরাপত্তা ছিল। এই সেনাদের লঞ্চঘাট থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবি করেছিল প্রসীত বিকাশ খীসার অনুসারী পিসিপি। ঘটনার দিন ১৭ নভেম্বর ১৯৯৩, বুধবার, সাপ্তাহিক হাটবাজারের দিনে সকালবেলা তৎকালীন বুড়িঘাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ, মেম্বার আহমেদ মিয়া এবং বাঙালি ভিত্তিক সংগঠন পার্বত্য গণপরিষদের নেতৃত্বে একটি মিছিল শুরু হয় স্থানীয় লাইব্রেরি প্রাঙ্গণ থেকে, যার উদ্দেশ্য ছিল চেকপোস্টের দাবি জোরালো করা। কিন্তু এই মিছিল প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন, পিসিপি’র কেন্দ্রীয় নেতা প্রসীত বিকাশ খীসা, যিনি পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তির বিরোধিতা করে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ইউপিডিএফ গঠন করে সভাপতি হন। জেএসএস ও পিসিপি’র নেতৃত্বে বেতছড়ি, ছয়কুড়িবিল, মাইচ্ছড়ি, গবছড়ি, তৈচাকমা, যাদুকাছড়া, বগাছড়ি, বড়াদম, বুড়িঘাট, কাঁঠালতলী, শৈলেশ্বরী, নানাক্রুম, সাবেক্ষ্যং, এগারাল্যাছড়া, বাকছড়ি, কেঙ্গালছড়ি থেকে কয়েক হাজার উপজাতিকে নিয়ে আসা হয় নানিয়ারচর বাজারে, এবং এই জনতাসহ জেএসএস-পিসিপি বাঙালিদের ওপর অতর্কিত হামলা শুরু করে, যা দ্রুত গণহত্যায় রূপ নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, প্রসীত বিকাশ খীসা নিজেই এই গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে ফনি ভূষণ চাকমা, শোভাপূর্ণ চাকমা, বীরেন্দ্র চাকমাসহ আরও ৭৭ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী গণহত্যায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। যদিও পরবর্তীতে জানানো হয় যে প্রসীত ঢাকা থেকে পিসিপি’র কার্যক্রমে নানিয়ারচর এসেছিলেন এবং লঞ্চঘাটে দায়িত্বরত সেনা সদস্যদের সঙ্গে অহেতুক তর্কে জড়িয়ে পড়েন, সেখান থেকে সেনা সরানোর জন্য প্রতিবাদ শুরু করে যা উত্তেজনা সৃষ্টি করে। জেএসএস-এর সন্তু অংশের এই দাবি “প্রসীত নিজেকে জাহির করতে গিয়ে ঘটনাকে বড় করে ফেলেন এবং পিসিপি’র মাধ্যম বিভিন্ন উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড চালান, যার ফলে গণহত্যা নানিয়ারচর সদর ছাড়িয়ে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।” তাদের মতে, প্রসীত যদি সেনাদের সঙ্গে তর্কে না জড়াতেন, সেনা প্রত্যাহারের দাবি না করতেন বা পিসিপি’র মাধ্যমে একাধিক কর্মসূচি না দিতেন, তাহলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতো না। কিন্তু এই দাবি যাই হোক, নৃশংসতার চিত্র ভয়াবহ: সন্ত্রাসীরা ১৩ মাসের বাঙালি শিশু নুর কায়েদাকে পিষে হত্যা করে এবং তার মাকে ধর্ষণের পর যৌনাঙ্গে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে, যা মানবতার বিরুদ্ধে একটি জঘন্য অপরাধ।

জেএসএস সন্ত্রাসীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য বাঙালিকে সম্পূর্ণ নিধন করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাঙালিশূন্য করে ফেলা এবং পাহাড়কে সন্ত্রাসে পরিণত করে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করা, এবং সেই স্বপ্ন নিয়ে তারা বাঙালি গণহত্যায় মেতে উঠেছিল। নানিয়ারচরের এই ঘটনা পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি নিধনের একটি অংশ মাত্র, যেখানে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৩৫ হাজার নিরস্ত্র বাঙালি নিহত হয় জেএসএস-এর হাতে। গণহত্যার পর নানিয়ারচর থেকে প্রায় ২১৮টি পরিবার ভয়ে সমতলে চলে যায়, রাষ্ট্র ও প্রশাসন পুনর্বাসিত বাঙালিদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, ফলে সমগ্র নানিয়ারচরসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম সন্ত্রাসের আখড়ায় পরিণত হয় এবং বাঙালিরা প্রাণের ভয়ে দিগদিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে। সেই দিনের লোমহর্ষক ঘটনার কথা মনে পড়লে আজও অনেকের গায়ের পশম দাঁড়িয়ে যায়, কারণ এটি ছিল না শুধু হত্যা, বরং জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণের একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এই গণহত্যার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে, যেমন ৮১ বছর বয়সী সুরুজ মিয়া (ইসলামপুর), ৭৯ বছরের ফয়জ আলী (বেতছড়ি) এবং ৮৪ বছরের আনোয়ার মোল্লা, যারা গণহত্যার পর নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে এলাকা ছেড়ে ময়মনসিংহের ভালুকায় চলে যান এবং সেখানে আশ্রয় নেন। তারা সেদিনের ঘটনার চোখে দেখা সাক্ষী, এবং নৃশংসতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার জ্ঞান হারান, কারণ তারা দেখেছেন কীভাবে শিশুকে পিষে মারা হয়েছে, মা-বোনদের ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে এবং নিরস্ত্র মানুষদের গুলি-কুপিয়ে শেষ করা হয়েছে। তারা বাঙালি গণহত্যার বিচারের দাবি জানান এবং নিহতদের পরিবারগুলোর সদস্যদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান করেন, কিন্তু তিন দশক পেরিয়ে গেলেও এই দাবিগুলো অধরা রয়ে গেছে।

বাঙালি লেখক বা সাংবাদিকের অভাবে এই নৃশংস গণহত্যা এবং বর্বরোচিত ঘটনাগুলো ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে গেছে, কারণ তৎকালীন গণমাধ্যম জেএসএস সন্ত্রাসীদের ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে সাহস পায়নি এবং পাহাড়ে প্রবেশের ওপর কঠোর সেন্সর আরোপ করা হয়েছিল। ফলে পার্বত্য বাঙালিরা যে ভয়াবহ নিধনের শিকার হয়েছে, তা জাতীয় ইতিহাসে স্থান পায়নি, যা একটি মহা অন্যায়। প্রসীত বিকাশ খীসা আজ ইউপিডিএফ-এর নেতা হিসেবে পরিচিত, কিন্তু পার্বত্য বাঙালিদের কাছে তিনি গণহত্যাকারীদের প্রধান। দীর্ঘ বছরেও কোনো তদন্ত কমিশন গঠিত হয়নি, কোনো মামলা হয়নি, কোনো দোষী শাস্তি পায়নি এবং কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি, যা রাষ্ট্রের ব্যর্থতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

আজকের এই দিনে আমাদের দাবি স্পষ্ট: নানিয়ারচর গণহত্যাসহ সকল পার্বত্য গণহত্যার স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে, সন্তু লারমা ও প্রসীত বিকাশ খীসাসহ সকল দোষীকে বিচারের আওতায় আনতে হবে, নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, পার্বত্যবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনা ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে এবং এই গণহত্যাকে জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করে ইতিহাসের অংশ করতে হবে। ভুলে গেলে ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হয়, তাই আসুন আমরা স্মরণ করি ২৬০টি আত্মা, ধর্ষিতা মা-বোনদের সম্ভ্রম, পোড়া ঘরবাড়ির ছাই এবং ১৩ মাসের নুর কায়েদার রক্তাক্ত স্মৃতি। বিচার না হলে শান্তি আসবে না, এবং পার্বত্য বাঙালির এই বেদনা চিরকাল অমীমাংসিত থেকে যাবে। এই গণহত্যা শুধু একটি ঘটনা নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং জাতিগত নিধনের একটি কালো অধ্যায়, যা ভবিষ্যত প্রজন্মকে সতর্ক করবে যাতে এমন নৃশংসতা আর কখনো না ঘটে।

আগের পোস্টরবিন নামে ০২ বছর বয়সী একটি ছেলে হারানো গিয়েছে। খাগড়াছড়ি সদরস্থ কল্যাণপুর থেকে
পরের পোস্টসর্বদিক দিয়ে পার্বত্য বাঙ্গালীদের দমিয়ে রাখা হয়েছে।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন