জেএসএস-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: ইতিহাস, সশস্ত্র তৎপরতা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ।

0

অনন্ত অসীম

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বাস্তবতায় জেএসএস (পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই উত্তেজনা, সংঘাত ও সশস্ত্র আন্দোলন চলেছে। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে গঠিত এই সংগঠনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসন ও জাতিগত পরিচয়ের দাবিতে গঠিত হলেও বাস্তবে তা সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়।

জেএসএস-এর রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং শান্তিবাহিনী নামে তাদের সামরিক শাখার গোপন ও প্রকাশ্য তৎপরতা পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীলতা নষ্ট করেছে। চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন, গুমসহ নানা অপরাধে জড়িত থেকে সংগঠনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। এই ব্লগে জেএসএস-এর প্রতিষ্ঠার কারণ, তাদের সশস্ত্র তৎপরতা, শান্তি চুক্তির পরবর্তী অবস্থা এবং বর্তমান পরিস্থিতি সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হবে।

জেএসএস-এর প্রতিষ্ঠার পটভূমি:
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সংবিধানের খসড়া প্রকাশিত হলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসনের জন্য বিশেষ সুবিধা দাবি করেন। তার দাবির মধ্যে ছিল:

১. পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন এবং নিজস্ব আইন পরিষদ গঠন।
২. সংবিধানে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন অন্তর্ভুক্ত করা।
৩. উপজাতীয় রাজাদের দপ্তর সংরক্ষণ।
৪. পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের বসতি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা।

বাংলাদেশ সরকার এই দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করলে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও তার সমর্থকরা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) গঠন করেন।

শান্তিবাহিনী গঠনের মাধ্যমে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু:
১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি জেএসএস তাদের সশস্ত্র শাখা ‘শান্তিবাহিনী’ গঠনের ঘোষণা দেয়। শান্তিবাহিনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বায়ত্তশাসনের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম চালানো।

শান্তিবাহিনীর গঠন ও প্রশিক্ষণ:
১৯৭৪ সাল নাগাদ বিপুলসংখ্যক পাহাড়িদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে শান্তিবাহিনীতে যোগদান করানো হয়।
নিয়মিত বাহিনী ছাড়াও সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের নিয়ে মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা হয়।
সামগ্রিক প্রস্তুতি গ্রহণ শেষে ১৯৭৬ সালে তারা সশস্ত্র কর্মকাণ্ড শুরু করে।

শান্তিবাহিনীর প্রধান কার্যক্রম:
পার্বত্য এলাকায় বাঙালিদের আক্রমণ ও হত্যা।
নিরাপত্তা বাহিনীকে টার্গেট করে হামলা।
মতাদর্শবিরোধী উপজাতীয়দের হত্যা।
সরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি।১৯৭৬ সালের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ বাঙালিদের বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

আভ্যন্তরীণ কোন্দল ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মৃত্যু:
জেএসএস এর সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনীর নেতৃত্বে ১৯৮০-এর দশকে বিভক্তি দেখা দেয়। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নিজ দলের কোন্দলের কারণে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর সন্তু লারমা নেতৃত্বে আসেন। সন্তু লারমার নেতৃত্বে সংগঠনটি আরও র‌্যাডিক্যাল হয়ে ওঠে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে আরও বড় মাত্রায় সহিংসতা চালায়।

সরকারের উদ্যোগ ও শান্তিচুক্তি:
সরকার জেএসএস ও শান্তিবাহিনীর তৎপরতা বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে।

শান্তিচুক্তির শর্তাবলী:
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও জেএসএসের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল:

১. শান্তিবাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র হতে হবে।
২. সরকার আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে।
৩. পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চুক্তি অনুযায়ী শান্তিবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়।

শান্তিচুক্তির ব্যর্থতা ও জেএসএসের বর্তমান ভূমিকা:
চুক্তির পরও জেএসএস পুরোপুরি নিরস্ত্র হয়নি এবং সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে জেএসএস একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যার মতো অপরাধে তারা যুক্ত রয়েছে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে জেএসএসের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। শান্তিচুক্তির সুযোগ নিয়ে তারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে জেএসএস-এর প্রভাব:
জেএসএস-এর সশস্ত্র কার্যক্রম পার্বত্য চট্টগ্রামে বহু নিরীহ বাঙালি ও উপজাতীয়দের প্রাণহানি ঘটিয়েছে।

১. জনসংখ্যা ও জনজীবনে প্রভাব
নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক বাঙালি ও উপজাতীয় পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাধারণ পাহাড়িরাও জেএসএস-এর চাঁদাবাজি ও দমননীতির শিকার।
২. রাজনৈতিক প্রভাব
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল রয়ে গেছে। জেএসএস শান্তিচুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে পুনরায় সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে যাচ্ছে।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ করণীয়:
পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রস্তাবিত সমাধান:

১. শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন
শান্তিচুক্তির অধীনে নিরস্ত্রীকরণের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
২. অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান
জেএসএস-এর হাতে থাকা অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে।
৩. আইনের কঠোর প্রয়োগ
চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
পার্বত্য অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে।

জেএসএস-এর প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরের ইতিহাস পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতার গল্প বলে। প্রথমে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে যাত্রা করলেও পরে এটি সশস্ত্র সংগঠনে পরিণত হয়।

শান্তিচুক্তির মাধ্যমে জেএসএস শান্তির পথে ফিরে আসবে বলে আশা করা হয়েছিল, কিন্তু তারা এখনো সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে জেএসএস-এর চাঁদাবাজি, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

আগের পোস্টমিথ্যা মামলায় গ্রেফতার: শাহাদাত ফরাজীর মুক্তির দাবিতে উত্তাল জাতীয় প্রেসক্লাব।
পরের পোস্টপাহাড়ের বুকে নির্যাতিত এক সোহেল রিগ্যান, যার পার্বত্য অবদান অনস্বীকার্য।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন