পাহাড়ি মেয়ে ও বাঙালি ছেলের প্রেমের একটি নিদারুণ কাহিনী।

0

পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, এবং পাহাড়ি জনগণের জীবনযাত্রা সত্যিই অনন্য। এখানে বসবাসকারী মানুষের জীবনযাত্রা সহজ নয়, কারণ পাহাড়ি অঞ্চলের জনগণের মাঝে রয়েছে নানা জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষার পার্থক্য, যা তাদের একে অপরের প্রতি মনোভাব এবং সম্পর্কের ধারণায় বড় ভূমিকা পালন করে। তবে এই ভিন্নতার মাঝেই একটি অসম্ভব সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল—একটি প্রেমের গল্প, যা বাধা, সংস্কৃতি, এবং সমাজের কাঠামোর বিরুদ্ধে এক বিরাট প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এই প্রেমের গল্পটি, যা পাহাড়ি মেয়ে পাইনুচিং মারমা এবং বাঙালি যুবক আরমানের মধ্যে গড়ে উঠেছিল, বাঙালি এবং উপজাতি জনগণের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ভয়ের সীমানা ভেঙে এক নতুন পথ দেখিয়েছিল।

প্রথম দেখা: এক নিঃশব্দ সম্পর্কের শুরু:

এ গল্পের প্রধান চরিত্র আরমান, একজন ২৫ বছর বয়সী বাঙালি ছেলে, যিনি খাগড়াছড়ি মহালছড়ির বাসিন্দা। আরমান একদম সাধারণ, গম্ভীর এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একজন তরুণ। তার জীবন ছিল শান্তিপূর্ণ, কিন্তু কোনো রোমাঞ্চ ছিল না। মহালছড়ির ছোট বাজারের পথে প্রায়ই হাঁটতে দেখা যেত তাকে। সাধারণত সকালে বা বিকালে সেসব রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে আরমান মেতে উঠত আড্ডা দিতে বা তার কাজগুলো করতে। একদিন, এই বাজারেই প্রথম পাইনুচিং মারমার সঙ্গে তার দেখা হয়। পাইনুচিং, একজন ১৬ বছর বয়সী মারমা মেয়ে, যার মুখের হাসি ছিল কোমল, চোখে ছিল হরিণীর মতো মায়া, এবং তার ব্যক্তিত্ব ছিল অনন্য। খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালা এলাকার মারমা উপজাতি সম্প্রদায়ের মেয়ে। পাইনুচিং মহালছড়ি সদরের নানার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। সে কখনও তার নানার বাড়ি থেকে বাজারে আসত, কখনও আবার ফিরে যেত। আরমান প্রতিদিনই তাকে ওই রাস্তায় হাঁটতে দেখতে পেত, কিন্তু তারা একে অপরকে কখনোই সরাসরি কথা বলত না। প্রথম দেখা ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু দুজনের হৃদয়ে একটি গভীর অনুভূতির জন্ম হয়। একে অপরের দিকে তাকানো ছাড়া তাদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি, তবে চোখের যোগাযোগে একটা অদ্ভুত মায়া এবং ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল।

আরমান প্রায়ই বাজারে যেত এবং পাইনুচিংকে দেখত। তার মনে এক অব্যক্ত আকর্ষণ তৈরি হতে থাকে। পাইনুচিংয়ের মুচকি হাসি আর তার মায়াবী চাহনি আরমানের মনে গভীরভাবে আস্তে আস্তে সঞ্চিত হতে থাকে। সে জানত, তাদের মাঝে বড় এক বাধা রয়েছে—একটি পাহাড়ি ছেলে এবং বাঙালি মেয়ের সম্পর্ক কখনই পাহাড়ি সংগঠন ও তাদের পরিচালিত সমাজে মেনে নেওয়া হবে না। কিন্তু মনের মধ্যে ভালোবাসা কীভাবে থামবে? তাদের মধ্যে সম্পর্কের এক গোপন সূচনা হতে থাকে।

প্রেমের অনুভূতি: নিঃশব্দ কষ্ট:

দিনের পর দিন, পাইনুচিং এবং আরমান একে অপরের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করছিল, তবে তাদের ভালোবাসা প্রকাশের কোনো উপায় ছিল না। পাইনুচিং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মারমা উপজাতির মেয়ে, এবং আরমান ছিল এক বাঙালি যুবক। পার্বত্য অঞ্চলে এমন সম্পর্ককে কখনই সহজভাবে গ্রহণ করা হয়নি। তারা জানত, সমাজ, পরিবার, এবং পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন তাদের সম্পর্ককে কখনও মেনে নেবে না। কিন্তু তাদের অনুভূতি ছিল অবিচলিত। পাইনুচিং আরমানকে এক প্রকার চুপচাপ ভালোবাসত, কিন্তু সমাজের চাপ তাকে সে ভালোবাসা প্রকাশ করতে দিত না। আরমানও তার অনুভূতি প্রকাশ করার সাহস পাচ্ছিল না, কারণ সে জানত, এর পরিণতি ভয়ংকর হতে পারে।

সমাজের প্রতিবন্ধকতা: সম্পর্কের পথে বড় বাধা:

একদিন, পাইনুচিং যখন বাজারে যাচ্ছিল, তখন আরমান তাকে দেখে একে অপরকে এক নিঃশব্দ “হ্যালো” বলেছিল। এই এক সংক্ষিপ্ত বাক্যই তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য সম্পর্কের সূচনা করে। তবে তাদের ভালোবাসা কোনোভাবেই প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি, কারণ পার্বত্য অঞ্চলে এমন সম্পর্ককে সাধারণভাবে মেনে নেওয়া হত না।

পাইনুচিংয়ের আত্মীয়রা ব্যাপারটি বুঝতে পেরে তাকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেয়। তারা জানত, তাদের সম্পর্ক সমাজের চোখে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু পাইনুচিং আরমানের প্রতি নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করতে পারে না। সে জানত, আরমানের মধ্যে এমন একটি গুণ ছিল, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল। সে মদ বা গাঁজা সেবন করতো না, বরং মেয়েদের প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিল অমূল্য। পাইনুচিং বুঝেছিল, সে সত্যিকার ভালোবাসা পেয়েছে, যা সমাজের কট্টর নিয়মের বিরুদ্ধে। তবে, সে জানত, এমন সম্পর্ক খুব বিপজ্জনক হতে পারে, বিশেষত পাহাড়ি অঞ্চলে।

বাধা অতিক্রম: এক অবিশ্বাস্য সাহসী পদক্ষেপ:

তবে, পাইনুচিং আরমানের কাছে থাকতে চায়। তার মন কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, সে কিভাবে এই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসবে। একদিন পাইনুচিং সিদ্ধান্ত নেয়, সে আরমানকে তার মনের কথা বলবে। কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক ভয় তাকে আটকে রেখেছিল। দিনরাত, সে আরমানকে ভালোবাসার অনুভূতি পুষে রেখেছিল, কিন্তু তাকে কখনই সরাসরি বলার সাহস হয়নি। তবে, একদিন আরমান পাইনুচিংকে একটি নির্জন স্থানে ডেকে নেয় এবং তার মনের কথা খুলে বলে। সে জানায়, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, পাইনুচিং। তোমার ছাড়া আমার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যাবে।” পাইনুচিং প্রথমে ভয় পেয়ে যায়, কারণ সে জানত, এই সম্পর্ক তার জীবনের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তবে তার হৃদয় আরমানের প্রতি ভালোবাসায় পূর্ণ ছিল, এবং সে আর তার নিজেকে আটকাতে পারেনি। সে মুচকি হাসল, কিন্তু তখনও তার মনে এক ধরনের ভীতি ছিল।

সমাজের প্রতিরোধ: এক ভয়াবহ পরিণতি:

বেশ কিছুদিন পর, পাইনুচিং আর আরমানের সম্পর্ক আরও গোপনে চলে যায়। তারা একে অপরকে ফোনে কথা বলত, কখনও কখনও দেখা করার জন্য গোপন পরিকল্পনা করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, তাদের সম্পর্ক নিয়ে গোটা মহালছড়ি শহরে কানাঘুষা শুরু হয়। স্থানীয় পাহাড়ি যুবকেরা পাইনুচিংকে আরও একবার ভয় দেখাতে আসে এবং তাকে তার প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ থেকে বিরত থাকতে বলে।

এবার পাইনুচিং সিদ্ধান্ত নেয়, সে আর আরমানের সাথে যোগাযোগ রাখবে না। সে তার পরিবারকে জানায় যে, সে আরমানকে ভুলে যাবে। কিন্তু আরমান, তার ভালোবাসার জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত ছিল। সে বিশ্বাস করেছিল, তার ভালোবাসা সত্য এবং এটি পাহাড়ি সমাজের সীমাবদ্ধতার বাইরে গড়ে উঠেছে।

একদিন, পাইনুচিং আর তার পরিবারকে একেবারে আলাদা জায়গায় নিয়ে চলে যায়। সে জানতো, বাঙালি ছেলেকে ভালোবাসা তাদের নিরাপত্তার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই, পাইনুচিং চলে যায় সিঙ্গিনালা, যেখানে বাঙালিদের প্রবেশ কঠিন ছিল।

আরমান বুঝতে পেরেছিল যে, পাইনুচিং তার নানার বাড়ি থেকে চলে গেছে। তিন দিন পর, আরমান এক সহপাঠী সঙ্গে নিয়ে পাইনুচিংয়ের খোঁজে সিঙ্গিনালার দিকে রওনা দেয়। এটি ছিল একটি অচেনা পথ, অচেনা গ্রাম। সেখানে গিয়ে, তিনি একটি পাহাড়ি মহিলার কাছ থেকে পাইনুচিংয়ের ঠিকানা পেয়ে যান। তবে, তার উপস্থিতি ওই এলাকায় অনেক সন্দেহ সৃষ্টি করে। পাহাড়ি যুবকরা তাকে বিপদে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু ভাগ্যক্রমে, তিনি পাইনুচিংকে খুঁজে পান এবং তার ভাইসহ সঙ্গীকে নিয়ে ফিরে আসেন।

এর পর থেকে, তারা গোপনে দেখা করতে শুরু করে। একে অপরকে জানাতে থাকে তাদের প্রেমের কাহিনি, তবে সেই প্রেমের পথ আর সহজ ছিল না। পাহাড়ি সমাজের কঠোর নিয়মাবলী, বিভক্তি, এবং রাজনৈতিক গোঁড়ামির কারণে, তাদের সম্পর্ক ছিল অস্থির। তবুও, তারা তাদের ভালোবাসাকে অটুট রেখেছিল, জানত যে, একে অপরের জন্য তারা প্রিয়তম।

তাদের সম্পর্কের কথা জানতে পেরে পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা পাইনুচিংকে মারধর করে এবং তাকে মেরে ফেলার ভয়ভীতি দেখায়। পাইনুচিংয়ের নানার প্রভাবশালী অবস্থান থাকায়, সেদিন সে বাঁচে, কিন্তু সমাজের চাপ ক্রমশই বেড়ে যায়। একদিন, পাইনুচিংকে পাহাড়ি ছেলেরা জোর করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সে এর প্রতিবাদ করলেও, তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়।

প্রতীকী ছবি: আরমান আর পাইনুচিং মারমা

এক দুঃসাহসিক যাত্রা: প্রেমের চূড়ান্ত সংঘর্ষ:

আরমান যখন জানতে পারে যে, পাইনুচিংকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন সে কিছুতেই হাল ছাড়ে না। সে সিঙ্গিনালা এলাকায় পাইনুচিংয়ের বাড়িতে সাক্ষাৎ করে। যদিও পাইনুচিং তাকে দেখে ভয় পান। সামাজিক চাপ ছিল। আরমান দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকে। সে জানে, তারা যত বাধাই আসুক না কেন, তাদের ৩ বছরের ভালোবাসা অটুট থাকবে।

তবে, একদিন পাইনুচিংকে জোর করে একজন পাহাড়ি ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। তার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন একেবারে সুখকর নয়, কারণ তার মন, তার হৃদয়, এবং তার জীবন ছিল আরমানে। সে মনে করে, একমাত্র বাঙালি পুরুষই তার প্রকৃত ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার যোগ্য। সে জানে, পাহাড়ি যুবকদের মধ্যে কতটুকু অন্ধকার রয়েছে, মদ, গাঁজা সেবন করে, একাধিক নারীতে আসক্ত, অকর্মা, অপদার্থ এবং তাদের সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মধ্যে কতটুকু বিভক্তি রয়েছে। তার কাছে, আরমান ছিল তার জীবনের একমাত্র নায়ক, যার প্রতি তার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং প্রশংসা অবিরত ছিল।

ভালোবাসার অমরতা: প্রতিবন্ধকতা ভেঙে শেষকৃত্য: পাইনুচিং এবং আরমানের প্রেমের গল্প এক সময় সবার মুখে মুখে চলে আসে। তাদের প্রেমের কাহিনী, যা জাত, ধর্ম এবং সামাজিক সীমারেখা ভেঙে, এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল, আজও পাহাড়ি জনগণের মাঝে স্মরণীয় হয়ে আছে। যদিও তাদের মধ্যে অনেক বাধা ছিল, তবুও তাদের সম্পর্ক কখনোই শেষ হয়নি। ইতিহাসের পাতায় তাদের প্রেমের গল্প একটি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে—প্রেম কখনোই জাত, ধর্ম বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে থাকে না।

আগের পোস্টবান্দরবানে রাবারবাগানের ২৬ শ্রমিক অপহরণ, উদ্ধারে নেমেছে সেনাবাহিনী।
পরের পোস্টশাহাদাত ফরাজি সাকিবের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি (পিসিএনপি’র)

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন