খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার লক্ষীছড়ি উপজেলায় শোষণের শেকলে বন্দি এক মারমা পরিবার। পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়নের নির্মম চিত্র কল্পনা শক্তির বাইরে। একটি অসহায় পরিবারের দীর্ঘশ্বাস পাহাড়ের বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। তবে কেউ কি শুনছে? এক পাহাড়ি পিতা-মাতার চোখের জল কি এতটাই তুচ্ছ যে, তা সমাজের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে না? খিলুঅং মারমা নামের এক তরুণ শুধুমাত্র নিজের জাতিসত্তার স্বার্থ রক্ষার জন্য সামাজিক সংগঠন গঠন করায় আজ তার পুরো পরিবার গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা একঘরে হয়ে গেছে, যেন সমাজের কোনো অংশই নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দীর্ঘদিন ধরেই উত্তপ্ত। পাহাড়ের নেতৃত্ব ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষ নীরবে কাঁদে, আর শোষণের শিকার হয় সবচেয়ে অসহায়রা। লক্ষীছড়ির হলুদিয়া এলাকার এক দরিদ্র দিনমজুর মারমা পরিবারও সেই শিকারদের মধ্যে একটি। তাদের ‘অপরাধ’? খিলুঅং মারমা নামের এক যুবক “বাংলাদেশ মারমা ছাত্র ঐক্য পরিষদ” নামক একটি সংগঠনের সভাপতি। যে সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার কথা বলে। এটি পাহাড়ের অন্যান্য সংগঠনের মত কোনো সশস্ত্র সংগঠন নয়, সামাজিক সেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে কাজ করে।
মগ লিবারেশন পাটি (এমএলপি) ও কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বাদ দিলে পাহাড়ে আরো ৪টি সংগঠন আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব মূলত চাকমা জাতির হাতে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সন্তু, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) প্রসীত এবং তাদের বিভক্ত অংশগুলো সবই চাকমাদের নিয়ন্ত্রণে। বহু বছর ধরে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা পাহাড়ের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি যেন সেই অভিযোগেরই প্রতিফলন। মারমা জাতিগোষ্ঠীর ছেলে খিলুঅং মারমা চাকমা-নিয়ন্ত্রিত ইউপিডিএফের মতাদর্শে না থেকে নিজস্ব সামাজিক সংগঠন গড়ার করার কারণে তার পরিবারকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। গ্রামের মানুষদের ভয় দেখিয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কেউ যেন তার পরিবারের সঙ্গে কথা না বলে, সাহায্য না করে।
এই পরিবারটির একমাত্র অবলম্বন ছিল দিনমজুরি। সমাজের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর, তারা আজ অর্থনৈতিকভাবেও নিঃস্ব। অভাবের তাড়নায় ক্ষুধার্ত সন্তানদের কান্নার আওয়াজ হয়তো শোনা যায় না, কিন্তু তা পাহাড়ের হৃদয়কে চিরে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক মামলা বলেন, খিলুঅং মারমা পাহাড়ে মারমাদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করতে চেয়েছিলেন, তাই তার পরিবারকে শাস্তি পেতে হচ্ছে। মানব ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল যেখানে সন্তান সামাজিক সংগঠন করায় পিতামাতাকে নিগৃহীত হতে হয়।
অন্যদিকে ইউপিডিএফ এই ঘটনায় নীরব। কোনো কৈফিয়ত নেই, নেই কোনো দুঃখ প্রকাশ। তাদের নির্লজ্জ নীরবতা যেন প্রতিটি মারমার অস্তিত্বের ওপর দাঁড়ি টানছে।
পাহাড়িরা মনে করেন, ইউপিডিএফ ও অন্যান্য আঞ্চলিক সংগঠন পাহাড়ের শাসক হয়ে উঠেছে, সাধারণ পাহাড়িদের রক্ষক নয়। মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খিয়াং—এরা যেন আজ পার্বত্য চট্টগ্রামে নিজেরাই সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে।
আতুসি মারমা খাগড়াছড়ি পানখাইয়া পাড়ার বাসিন্দা তিনি বলেন, “জেএসএসের অতীত কর্মকাণ্ডের কথা মনে করলেই বোঝা যায়, এই নিপীড়ন নতুন কিছু নয়। একসময় মারমাদের প্রভাবশালী নেতা চাপাই মগকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। মারমারা আজও বিশ্বাস করে, তাকে হত্যা করেছিল চাকমা নেতৃত্বের এই আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—মারমাদের নেতৃত্ব ধ্বংস করা। আজ ইউপিডিএফ সেই একই পথে হাঁটছে। মারমাদের নেতৃত্ব শূন্য করতে চায় তারা। পার্বত্য চট্টগ্রামের নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে জাতিগত বৈষম্য আজ প্রকট।”
এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। ২১ মার্চ রাতে ব্লগার পাইশিখই মারমা তার এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন,
“খাগড়াছড়ি জেলা,লক্ষীছড়ি উপজেলা,হলুদিয়া পাড়া। চাকমা জাতি পরিচালনা আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ সশস্ত্র বাহিনীরা
বাংলাদেশ মারমা ছাত্র ঐক্য পরিষদে সভাপতি: খিলুঅং মারমা,তার পরিবার কে গ্রাম বন্দি করেছে।
ইউপিডিএফ প্রথম সারি নেতাদের বলছি দ্রুত ছেড়ে দেওয়া ব্যবস্থা করেন। আপনারা আমাকে অনেক হয়রানি করেছেন কিছু বলি নাই। সাধারণ মানুষকে হয়রানি বন্ধ করেন,পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা জাতি কর্তৃত্ববাদ ইন্ডিয়া দালাল ইউপিডিএফ,জেএসএস থেকে সাধারণ মানুষ মুক্তি পেতে চাই।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে হলুদিয়া এলাকাটি ইউপিডিএফ অধ্যুষিত। এখানে ইউপিডিএফ এর শক্ত অবস্থান। ইউপিডিএফ এর বন্দুকের নলের সামনে সবাই অসহায়। কেউ এই নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলবে না। গ্রামবন্দী পরিবারটি এই নিয়ে কোথাও অভিযোগ করে লাভ হবে না। বরং অভিযোগ করলে বিপদ আরো বাড়বে৷ কারণ এখানে প্রশাসনের আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া এই থেকে পরিবারটির মুক্তি মিলবে না।