আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হিলনিউজবিডি ২৩ মার্চ ২০২৫ |
মিজোরামের সীমান্তবর্তী লুংলেই জেলায় এক চাঞ্চল্যকর অভিযানে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) এবং মিজোরাম পুলিশ। সীমান্ত-সংলগ্ন অঞ্চলে অস্ত্র চোরাচালানের রমরমা বাণিজ্যের বিরুদ্ধে এটি অন্যতম বড় অভিযান বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই অভিযানে এক ভয়াবহ অস্ত্রভাণ্ডারের সন্ধান মেলে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, এই বিপুল অস্ত্রশস্ত্র মিয়ানমার ও বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে পাচারের জন্য গুদামজাত করা হয়েছিল। এই অভিযানে ধরা পড়েছে এক নারীসহ তিনজন চোরাকারবারি, যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।
BSF-এর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, অভিযানকালে একটি সীমান্তবর্তী বাড়ি থেকে বিশাল পরিমাণ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত সামগ্রীর তালিকা নিম্নরূপ—
১। ৬,২০০ রাউন্ড ৭.৬২ মিমি একে সিরিজ রাইফেলের গুলি, ২। ১,৮০০ মিটার কর্ডেক্স বিস্ফোরক তার, ৩। ৬০০টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ডেটোনেটর ৪। ২০ মিটার সেফটি ফিউজ, ৫। বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম, যা চোরাচালানের কাজে ব্যবহৃত হত।
এই বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার শনিবার রাতে লুংলেই জেলার এক বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থার তীক্ষ্ণ নজরদারির ফলে এই চোরাচালান চক্রের পর্দাফাঁস হয়।
মিজোরাম পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আটক তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলার জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চালানো হচ্ছে। পুলিশ ধারণা করছে, এই অস্ত্রশস্ত্র পূর্ব ভারত, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কাছে পাচার করার পরিকল্পনা ছিল।
এটাই প্রথম নয়! মাত্র ৪০ দিন আগে লুংলেই জেলা থেকে আরেকটি বড় অস্ত্রভাণ্ডার উদ্ধার করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় মিজোরামের এই অঞ্চল চোরাকারবারিদের অন্যতম প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে।
মাত্র এক মাস আগেই, ১২ ফেব্রুয়ারি মিজোরাম পুলিশের সদস্যরা লুংলেই বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি গাড়ি আটক করে, যেখানে পাওয়া গিয়েছিল—
১। দুটি একে-৪৭ রাইফেল, ২। পাঁচটি মার্কিন তৈরি এম-৪ কার্বাইন রাইফেল, ৩। ২০টি ম্যাগাজিন, ৪। ৫০৪ রাউন্ড ৭.৬২ মিমি গুলি, ৫।৪,৬৭৫ রাউন্ড ৫.৫৬ মিমি গুলি।
সীমান্ত রক্ষায় মিজোরাম প্রশাসন ও ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গে অরক্ষিত সীমান্ত চোরাচালানিদের জন্য একটি আদর্শ রুট হয়ে উঠেছে।
এই ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এখন অস্ত্র চোরাচালানের জন্য একটি প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। তবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই অভিযান প্রমাণ করছে যে, তারা যেকোনো মূল্যে সন্ত্রাস ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউপিডিএফের (UPDF) আগেও একাধিক অস্ত্র চালান মিজোরাম পুলিশ আটক করেছিল, যা মূলত বান্দরবানের কেএনএফের (KNF) কাছে পাচারের পরিকল্পনা ছিল। ইউপিডিএফ, জেএসএস (JSS) ও কেএনএফ ভারত ও মায়ানমারের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী থেকে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করছে। তাদের অস্ত্রের দৌরাত্ম্য, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডে এই জনপদ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
এমন অস্থির পরিস্থিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি ও উপজাতি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অবৈধ অস্ত্র চালান বন্ধ করা না গেলে এ অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আরও গভীর সংকট তৈরি করতে পারে। তাই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও সক্রিয় অভিযানই পারে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে কার্যকর পদক্ষেপ হয়ে উঠতে।