আজ ভয়াল কাউখালী গণহত্যা: পার্বত্য ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়।

কাউখালী প্রতিনিধি

0

আজ ভয়াল কাউখালী গণহত্যা: পার্বত্য ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাসে অমোঘ এক কালিমা লেপন করেছে রাঙামাটি জেলার কাউখালী গণহত্যা। উপজেলার কলমপতি ইউনিয়নে সংঘটিত এই নৃশংসতা পার্বত্য অঞ্চলের গণহত্যার ইতিহাসে এক জঘন্যতম অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৮০ সালের ২৫ মার্চ, শীতের প্রকোপে কাঁপতে থাকা এক প্রভাতে, তথাকথিত শান্তিবাহিনীর হাতে প্রাণ হারায় অসংখ্য নিরীহ বাঙালিরা। এই হত্যাযজ্ঞের প্রকৃত পরিসংখ্যান আজও রহস্যাবৃত। স্থানীয় সূত্রে দেড় হাজারের অধিক প্রাণহানির কথা উঠে এলেও, এখন বলা হয় ৭৫০ জনের মৃত্যুর কথা। তথ্য সংরক্ষণের অভাব ও সংগঠিত নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে এই ভয়াবহতার পূর্ণ চিত্র আজও অস্পষ্ট।

২৪ মার্চ, ১৯৮০। ঘাগড়া জোন কমান্ডার খালিকুজ্জমানের নেতৃত্বে কাউখালীতে এক শান্তি সমাবেশ ডাকা হয়। পাহাড়ি ও বাঙালি নেতৃবৃন্দ, হেডম্যান, কার্বারি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে দিনভর আলোচনা হয় সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার। সমাবেশ শেষে উভয় পক্ষ শান্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে ফিরে যায়। কিন্তু এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ মেনে নিতে পারেনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনী। তাদের লক্ষ্য ছিল পুনর্বাসিত বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি স্বাধীন “জুমল্যান্ড” প্রতিষ্ঠা।

পরদিন, ২৫ মার্চ সকাল ৮টার দিকে, শান্তিবাহিনীর সামরিক কমান্ডার মেজর মলয়ের নেতৃত্বে শুরু হয় এক ভয়াল তাণ্ডব। পোয়াপাড়া বাজার সংলগ্ন পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সেনা ক্যাম্পকে লক্ষ্য করে প্রথম গুলি ছোড়ে তারা। এরপর কাশখালী, ঘিলাছড়ি, রাঙ্গীপাড়া ও বেতছড়ি—চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে পুরো এলাকা। বৃষ্টির মতো গুলি আর হায়েনার ন্যায় আক্রমণে নিরস্ত্র বাঙালি নারী-পুরুষ-শিশুরা প্রাণ হারায়। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, লুটপাট চলে অবাধে। স্থানীয়দের মতে, ১৭ জন নারী ধর্ষিত, ১০১ শিশু ও ১৭৩ যুবক নিহত, এবং মোট ৭৫০ জনের প্রাণহানি ঘটে। অগ্নিসংযোগে ৪৫০টি বাড়ি ভস্মীভূত হয়, হাজার পরিবার গৃহহীন।

মেজর মলয়, যিনি বর্তমানে জেএসএস-এর সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান কাণ্ডারি ছিলেন। তার নির্দেশে দিনভর চলে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ। শান্তিবাহিনীর এই বর্বরতা শুধু বাঙালিদের ওপরই সীমাবদ্ধ ছিল না, সেনাবাহিনীর সদস্যরাও তাদের হামলার শিকার হন।

এইদিনে কথিত আছে রাঙামাটি জেলায় মেজর মহসিনসহ ২২ সেনা সদস্যও নিহত হয়েছে।

প্রতি বছর ২৫ মার্চ এলে আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট) এই গণহত্যার জন্য বাঙালি ও সেনাবাহিনীকে দায়ী করে শোকসভা ও প্রতিবাদের আয়োজন করে। তাদের দাবি, ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনী ও বাঙালি কথিত সেটলাররা পোয়াপাড়া বৌদ্ধ বিহার সংস্কারের নামে পাহাড়িদের ডেকে এনে গুলি করে হত্যা করে। তারা বলে, ৩০০-এর বেশি পাহাড়ি নিহত হয়, বিহারে হামলা চালানো হয়, এবং গ্রামগুলোতে তাণ্ডব চালিয়ে ঘরবাড়ি পোড়ানো হয়। এই অভিযোগকে তারা ১৯৭১-এর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে। কিন্তু স্থানীয় বাঙালিদের বিবরণ এই দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত।

সেসময় বাম নেতারা ঘটনায় তদন্ত এসে এই নিয়ে বাঙালি ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এক মিথ্যাচার রচিত করে। সে মিথ্যা তথ্য আজোও প্রচার করা হয় বলে জানিয়েছেন, বাঙালি ভিত্তিক সংগঠনের নেতা।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ভয়াল দিনটি স্মরণ করা তো দূরের কথা, এর অস্তিত্ব সম্পর্কেও অজ্ঞ এখানকার বাঙালি নেতারা। জাতীয় রাজনৈতিক নেতারা এই গণহত্যা দিবস পালন থেকে বিরত থাকে, কারণ একটি মহলের অসন্তোষের ভয় তাদের গ্রাস করে। কাউখালীর বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ নয়; স্বার্থপরতা ও জাতবিরোধী মনোভাব তাদের মধ্যে বাসা বেঁধেছে। অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ী ও আঞ্চলিক দলের এজেন্টদের প্রভাবে বাঙালি আন্দোলন দমিয়ে দেওয়া হয়। যারা এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে চায়, তাদের টেনে ধরা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ২৬টি বাঙালি গণহত্যার মধ্যে কাউখালী একটি। কিন্তু এই ইতিহাস ধীরে ধীরে মুছে ফেলা হচ্ছে। বাঙালি নেতৃত্বের উদাসীনতা ও আঞ্চলিক দলগুলোর অপপ্রচারে এই কলঙ্কিত অধ্যায়টি অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। যাদের রক্তের বিনিময়ে আজকের কাউখালী, তাদের স্মৃতি রক্ষার কোনো উদ্যোগ নেই। পক্ষান্তরে, শান্তিবাহিনী ও তাদের উত্তরসূরিরা এই ঘটনাকে পুঁজি করে বাঙালি ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে।

এই ভয়ংকর গণহত্যা শুধু একটি ঘটনা নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সমাজের অসহায়ত্ব, বিভক্তি ও নীরবতার এক জ্বলন্ত প্রতীক। আজ, ২৫ মার্চ ২০২৫, এই দিনটি স্মরণ করা নয়, বরং এর পুনরাবৃত্তি রোধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।

আগের পোস্টবান্দরবানে পিসিএনপি’র উদ্যোগে দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত।
পরের পোস্টসাজেকে পর্যটনকেন্দ্র ও বাণিজ্যিক স্থাপনা করতে লাগবে জেলা পরিষদের অনুমোদন।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন