পারভেজ মারুফ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষ প্রতিনিধি:
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান—এক অভূতপূর্ব জাতিগত বৈষম্যের কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আপদকালীন অর্থ অনুদান বণ্টনে চাকমা সম্প্রদায়ের প্রতি নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এই অঞ্চলে বাঙালিসহ ১৩টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বসবাস থাকলেও, অনুদানের ৯৫ শতাংশই চাকমাদের পকেটে গেছে বলে অভিযোগ। তঞ্চঙ্গ্যা, পাংখোয়া, লুসাই, মুরুং, চাক, খুমি, ম্রো ও বম সম্প্রদায় সম্পূর্ণ উপেক্ষিত, আর বাঙালি, মারমা ও ত্রিপুরাদের জন্য নামমাত্র সুযোগ রাখা হয়েছে—যা কেবল চোখে ধুলো দেওয়ার কৌশল বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক অনুদান বণ্টনের পরিসংখ্যান এই বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। খাগড়াছড়িতে ৩ কোটি ১২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, রাঙ্গামাটিতে ১ কোটি ২২ লক্ষ ২০ হাজার টাকা এবং বান্দরবানে মাত্র ৫ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল বৈষম্যের পেছনে পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার নিজ জেলা খাগড়াছড়ির প্রতি পক্ষপাতিত্বকে দায়ী করছেন অনেকে। রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের জনগোষ্ঠী এই বঞ্চনার শিকার হয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পার্বত্য জেলা পরিষদের অনুকূলে দেওয়া অনুদানে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকার বেশিরভাগই ভূয়া। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির সাবেক শিক্ষিকা টিনা চাকমার নামে ও বেনামে ২৫ লক্ষ টাকা গ্রহণের ঘটনা বিস্ময় ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অনিয়মের তীব্র সমালোচনা চলছে, কিন্তু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা সম্প্রদায়ের আধিপত্য ও খবরদারি দীর্ঘদিনের। এই অনুদান বণ্টন তাদের সকল সুযোগ-সুবিধার ৯৫ শতাংশ দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্যান্য জাতিসত্তা—তঞ্চঙ্গ্যা, পাংখোয়া, লুসাই, মুরুং, চাক, খুমি, ম্রো ও বম—একেবারেই বঞ্চিত। স্থানীয় রাজনৈতিক মহল, সাংবাদিক সমাজ, সুশীল সমাজ ও বিশ্লেষকরা এটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বৈষম্য হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গত ২৫ মার্চ ২০২৫ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নাহিদ ইসলাম স্বাক্ষরিত আপদকালীন অনুদানের তালিকা প্রকাশের পর সমালোচনার তীব্র ঝড় থামছে না। স্থানীয় প্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকরা এই একতরফা সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে গঠিত এই মন্ত্রণালয় কি শুধু চাকমা সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষার জন্য কাজ করছে?
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক বঞ্চনার গল্প নয়, এটি জাতিগত নিপীড়ন ও সামাজিক অবিচারের এক জ্বলন্ত প্রমাণ। সুপ্রদীপ চাকমার নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়ের এই পক্ষপাতমূলক আচরণ অঞ্চলটির শান্তি ও সম্প্রীতির মূলে আঘাত হানছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী এখন ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার, এবং এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতার নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।