রাঙামাটি পার্বত্য জেলার লংগদু উপজেলার বামে আটারকছড়া এলাকায় ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত আটারকছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০১১ সালে এই স্কুলে একটি ছাত্রাবাস চালু করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হয়েছে। এটি আটারকছড়া হোস্টেল স্কুল নামে ছিল। কিন্তু সম্প্রতি কল্যাণ মিত্র (হিমু) নামে এক পাহাড়ি যুবক ছাত্রাবাসটির নামকরণ করেছে ‘আদিবাসী আবাসিক ছাত্রাবাস (হোস্টেল ভবন)’। এই নামকরণে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিতর্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘আদিবাসী’ শব্দের প্রচলন এবং এর সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায়ের একটি গভীর ষড়যন্ত্র। আইনি, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি এর পেছনের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য ও প্রভাব নিয়ে চিন্তাভাবনা করবো।
বাংলাদেশের সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দটির কোনো স্বীকৃতি নেই। সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র উপজাতি, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী, নৃ-গোষ্ঠী এবং সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এখানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি; বরং ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী’র মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত যে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকে এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (১৯৯৭) এবং জেলা পরিষদ আইনেও ‘আদিবাসী’ শব্দের পরিবর্তে ‘উপজাতি জনগোষ্ঠী’র মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালের চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতীয় জনগণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, এবং তাদের অধিকার ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলা হয়। কিন্তু ‘আদিবাসী’ শব্দটি এখানেও অনুপস্থিত। এছাড়া, সরকার বিভিন্ন সময়ে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়েছে যে, ‘আদিবাসী’ শব্দটি গণমাধ্যম টকশো, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সরকারি নথিপত্র বা প্রতিষ্ঠানের নামকরণে ব্যবহার করা যাবে না। এই নির্দেশনা লঙ্ঘন করে আটারকছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের নামে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা আইনি ও সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাসের নামকরণ সাধারণত তার উদ্দেশ্য, প্রতিষ্ঠাতা, বা স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়। কিন্তু আটারকছড়ার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি অস্বাভাবিক এবং প্রশ্ন উত্থাপন করে। লংগদু উপজেলায় বাঙালি এবং পাহাড়ি—উভয় জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এখানকার শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন সম্প্রদায় থেকে আসে। তাহলে কেন ছাত্রাবাসের নামে শুধু একটি গোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেওয়া হবে? তাও আবার বিতর্কিত শব্দ।
ধরা যাক, এই ছাত্রাবাসের নাম ‘বাঙালি আবাসিক ছাত্রাবাস’ রাখা হতো। তাহলে কি পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও সুশীল সমাজ তা মেনে নিত? সম্ভবত না। একইভাবে, ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে হাইলাইট করা বাঙালি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো একটি নিরপেক্ষ জায়গায় এ ধরনের নামকরণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয়রা মনে করছেন, এটি কেবল একটি নামকরণের বিষয় নয়, বরং একটি গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক ষড়যন্ত্রের অংশ।
নামকরণের পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। অনেকে বলছেন, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘আদিবাসী’ পরিচয় প্রতিষ্ঠার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতের ইতিহাস রয়েছে। এ ধরনের নামকরণ সেই সংঘাতকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা ফেসবুকে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তারা বলছে, আমাদের স্কুলে সব শিশু একসঙ্গে পড়ে। তাহলে কেন ছাত্রাবাসের নামে ‘আদিবাসী’ শব্দ? এটা কি আমাদের একতাকে ভাঙার চেষ্টা নয়?” এই প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষ এই সিদ্ধান্তকে একটি বিভেদমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
এই বিতর্কিত নামকরণের জন্য স্থানীয় স্কুল কমিটি, শিক্ষক, সচেতন নাগরিক, উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কেউই দায় এড়াতে পারেন না। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামকরণে সরকারি নীতিমালা ও আইনের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত ছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। প্রশ্ন উঠছে—এই নামকরণের ক্ষমতা উক্ত পাহাড়ি যুবককে কে দিয়েছিল? কারা এটি অনুমোদন করেছে? এবং কেন সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করা হলো?
স্থানীয় প্রশাসন এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেয়নি। তবে জনগণের প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার মুখে তাদের এখন ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। অনেকে দাবি করছেন, ছাত্রাবাসের নাম থেকে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বাদ দিয়ে একটি নিরপেক্ষ নামকরণ করা হোক।
২০০৭ সালে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঘোষণাপত্রেে পর ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এই অঞ্চলের কিছু গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। তারা মনে করে, এটি তাদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এই দাবিকে স্বীকৃতি দেয়নি। সরকারের যুক্তি, বাংলাদেশের সব নাগরিকর আলাদা মর্যাদা নির্ধারিত। জাতি হিসেবে ‘বাঙালি’—এবং ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোকে ‘উপজাতি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এদেশে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বসবাসের ইতিহাস প্রাচীন নয়। আদিবাসী সংজ্ঞা অনুযায়ী উপজাতিরা এদেশের আদি বাসিন্দা কিংবা আদিবাসী নয়।
এই প্রেক্ষাপটে, ছাত্রাবাসের নামে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারকে অনেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন। এটি হয়তো একটি প্রতীকী পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘আদিবাসী’ পরিচয়কে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এর ফলে সামাজিক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আটারকছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের নামকরণে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার একটি সাধারণ ঘটনা নয়। এটি আইনি, সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো একটি নিরপেক্ষ স্থানে বিভেদমূলক নামকরণ কেবল বিতর্কই সৃষ্টি করবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা। শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একতা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা, বিভেদ নয়। তাই এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।