উপজাতি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যান এবং বরাদ্দে বৈষম্য।

0

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি বিশেষ ভূ-সাংস্কৃতিক অঞ্চল, যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্য এটিকে অনন্য করে তুলেছে। এই অঞ্চলে বিভিন্ন উপজাতি জনগোষ্ঠী যেমন চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা এবং বাঙালি জনগোষ্ঠী একত্রে বসবাস করে। তবে, সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বাবু সুপ্রদীপ চাকমার নেতৃত্বে খাদ্যশস্য ও নগদ অর্থ বরাদ্দে বৈষম্যমূলক বন্টনের অভিযোগ উঠেছে। এই ব্লগে আমরা ২০২২ সালের জনসংখ্যার পরিসংখ্যান এবং ২০২৫ সালে প্রকাশিত বরাদ্দের তথ্যের ভিত্তিতে এই বৈষম্যের চিত্র বিশ্লেষণ করবো এবং জাতিভিত্তিক সুবণ্টনের হার নির্ণয় করবো।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠী: একটি বিস্তারিত পরিসংখ্যান—

২০২২ সালের পরিসংখ্যান তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮,৪২,০০০। এর মধ্যে বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৯,২২,৫৯৮, যা মোট জনসংখ্যার ৫০.০৬%। বাকি অর্ধেক জনসংখ্যা বিভিন্ন উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্ত। নিম্নে প্রধান উপজাতিগুলোর জনসংখ্যা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

  • চাকমা: ৪,৮৩,২৯৯ জন (মোট জনসংখ্যার ২৬.২২%)। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় উপজাতি জনগোষ্ঠী। এরা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি বসবাস করে, তবে বান্দরবানেও তাদের কিছু জনসংখ্যা রয়েছে।
    মারমা: ২,২৪,২৯৯ জন (মোট জনসংখ্যার ১২.১৭%)। এরা মূলত বান্দরবান ও রাঙামাটি অঞ্চলে বসবাস করে। তবে খাগড়াছড়িও তাদের বসবাস রয়েছে।
    ত্রিপুরা: ১,৫৬,৬২০ জন (মোট জনসংখ্যার ৮.৫০%)। এরা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে বেশি দেখা যায়। বান্দরবানের দুর্গম এলাকায়ও বসতি দেখা যায়।
    ম্রো: ৫২,৪৬৩ জন (মোট জনসংখ্যার ২.৮৫%)। এরা বান্দরবান পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী।
    তঞ্চঙ্গ্যা: ৪৫,৯৭৪ জন (মোট জনসংখ্যার ২.৪৯%)। এরা চাকমাদের সাথে সাংস্কৃতিকভাবে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ। রাঙামাটির কাপ্তাই এবং বান্দরবানে এদের বসতি।
    মুরং: প্রায় ২৫,০০০ জন (মোট জনসংখ্যার ১.৩৬%)। এদের সংখ্যা সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিন। বান্দরবানের দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী।
    বম: ১৩,১৯৩ জন (মোট জনসংখ্যার ০.৭২%)। এরা বান্দরবানে বেশি দেখা যায়  রোয়াংছড়ি, রুমা থানচিতে।
    রাখাইন: ১৩,২৪৬ জন (মোট জনসংখ্যার ০.৭২%)। এরা সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে আছে, বেশ করে কক্সবাজার,  পটুয়াখালী ও বরগুনা। তবে পার্বত্য অঞ্চলেও উপস্থিত খুবই কম।
    -খেয়াং: ৪,৮২৬ জন (মোট জনসংখ্যার ০.২৬%)। এরা বান্দরবানের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি জনগোষ্ঠী।
    খুমি: ৩,৩৬৯ জন (মোট জনসংখ্যার ০.১৮%)। এরা বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে বসবাস করে।
    চাক: ২,৮৩৫ জন (মোট জনসংখ্যার ০.১৫%)। এদের জনসংখ্যা খুবই কম। এরা বান্দরবানের নাক্ষ্যংছড়িতে বসবাস করে।
    লুসাই: ৯৫৯ জন (মোট জনসংখ্যার ০.০৫%)। সংখ্যায় সবচেয়ে কম। এরা রাঙামাটি বাঘাইছড়ি সাজেক উপজাতি।
    পাংখোয়া: ২,২৭৪ জন (মোট জনসংখ্যার ০.১২%)। এরাও একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। রাঙামাটি বিলাইছড়িতে এদের বসবাস।

এছাড়া, বনজোগী জনগোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তিনটি জেলার উপজাতি জনসংখ্যা বণ্টন নিম্নরূপ: রাঙামাটিতে ৩,৭২,৮৬৪, খাগড়াছড়িতে ৩,৪৯,৩৭৮ এবং বান্দরবানে ২,৬৮,৭৭১ জন। এই তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, চাকমা জনগোষ্ঠী উপজাতিদের মধ্যে সংখ্যাগতভাবে শীর্ষে থাকলেও, বাঙালিরা সামগ্রিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

খাদ্যশস্য ও অর্থ বরাদ্দ: তথ্য ও বিশ্লেষণ—

পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে তিনটি ধাপে খাদ্যশস্য ও নগদ অর্থ বরাদ্দ করেছে। এই বরাদ্দের বিস্তারিত তথ্য নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:

১ম বরাদ্দ: খাদ্যশস্য (১৯/০১/২৫)
মোট বরাদ্দ: ৭৫১ মেট্রিক টন চাল
চাকমা: ৪৬০ মে. টন (৬১.২৫%)
মারমা: ৯২ মে. টন (১২.২৫%)
ত্রিপুরা: ৬৬ মে. টন (৮.৭৯%)
বাঙালি: ১৩৩ মে. টন (১৭.৭১%)
২য় বরাদ্দ: নগদ অর্থ (২৫/০৩/২৫)
মোট বরাদ্দ: ৩,১২,৫০,০০০ টাকা
চাকমা: ২,৩২,৬০,০০০ টাকা (৭৪.৪৩%)
মারমা: ২১,৭০,০০০ টাকা (৬.৯৪%)
ত্রিপুরা: ৯,৮০,০০০ টাকা (৩.১৪%)
বাঙালি: ৪৭,১০,০০০ টাকা (১৫.০৭%)
হিন্দু: ১,৩০,০০০ টাকা (০.৪২%) যদিও হিন্দুরা বাঙালিদের নামে বরাদ্দ থেকে সুবিধা পেয়ে থাকে।
৩য় বরাদ্দ: খাদ্যশস্য (২৭/০৩/২৫)
-মোট বরাদ্দ: ১,৯১৩ মেট্রিক টন চাল
চাকমা: ১,৮১৩ মে. টন (৯৪.৭৭%)
মারমা: ২০ মে. টন (১.০৪%)
ত্রিপুরা, হিন্দু, সাঁওতাল, রাখাইন  ০ মে. টন (০%)
বাঙালি: ৮০ মে. টন (৪.১৮%)

জাতিভিত্তিক সুবণ্টনের হার: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ—

জনসংখ্যার অনুপাতের সাথে বরাদ্দের তুলনা করে দেখা যাক, বরাদ্দ কতটা ন্যায্য হয়েছে:

  • ১। চাকমা:
    – জনসংখ্যা: ২৬.২২%
    – ১ম বরাদ্দ: ৬১.২৫% (২.৩৪ গুণ বেশি)
    – ২য় বরাদ্দ: ৭৪.৪৩% (২.৮৪ গুণ বেশি)
    – ৩য় বরাদ্দ: ৯৪.৭৭% (৩.৬১ গুণ বেশি)
  • ২। মারমা:
    – জনসংখ্যা: ১২.১৭%
    – ১ম বরাদ্দ: ১২.২৫% (প্রায় সমান)
    – ২য় বরাদ্দ: ৬.৯৪% (০.৫৭ গুণ কম)
    – ৩য় বরাদ্দ: ১.০৪% (০.০৮ গুণ কম)
  • ৩। ত্রিপুরা:
    – জনসংখ্যা: ৮.৫০%
    – ১ম বরাদ্দ: ৮.৭৯% (প্রায় সমান)
    – ২য় বরাদ্দ: ৩.১৪% (০.৩৭ গুণ কম)
    – ৩য় বরাদ্দ: ০% (শূন্য)
  • ৪। মুসলিম/বাঙালি:
    – জনসংখ্যা: ৫০.০৬%
    – ১ম বরাদ্দ: ১৭.৭১% (০.৩৫ গুণ কম)
    – ২য় বরাদ্দ: ১৫.০৭% (০.৩০ গুণ কম)
    – ৩য় বরাদ্দ: ৪.১৮% (০.০৮ গুণ কম)

বৈষম্যের গভীরতা ও প্রকৃতি

উপরের তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, চাকমা জনগোষ্ঠী তাদের জনসংখ্যার তুলনায় অতিরিক্ত সুবিধা পেয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় বরাদ্দে ৯৪.৭৭% চাল চাকমাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, যা তাদের জনসংখ্যার প্রায় ৩.৬ গুণ। এটি একটি চরম বৈষম্যের চিত্র। অন্যদিকে, মারমা, ত্রিপুরা এবং বাঙালি জনগোষ্ঠী তাদের জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম বরাদ্দ পেয়েছে। ত্রিপুরা, রাখাইন ও সাঁওতাল প্রভৃতি জনগোষ্ঠী তৃতীয় বরাদ্দে কোনো চালই পায়নি, যা তাদের প্রতি সম্পূর্ণ উপেক্ষার প্রমাণ।

এছাড়া, ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠী যেমন ম্রো, খুমি, চাক, লুসাই, পাংখোয়া এবং বম-এর জন্য কোনো বরাদ্দের উল্লেখ নেই। এটি তাদের প্রতি প্রশাসনের উদাসীনতা বা অগ্রাধিকারের অভাব নির্দেশ করে। বাঙালি জনগোষ্ঠী, যারা মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি, তারা তাদের প্রাপ্যের তুলনায় মাত্র ৪-১৭% বরাদ্দ পেয়েছে, যা তাদের প্রতি স্পষ্ট বৈষম্য প্রকাশ করে।

বৈষম্যের কারণ: একটি সম্ভাব্য বিশ্লেষণ

  • বাবু সুপ্রদীপ চাকমার নেতৃত্বে এই বরাদ্দে চাকমা জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে:
    ১। জাতিগত পক্ষপাত: উপদেষ্টা নিজে চাকমা জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায়, তিনি তার নিজস্ব সম্প্রদায়ের প্রতি বেশি ঝুঁকেছেন।
    ২। রাজনৈতিক প্রভাব: পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাব বেশি, যা বরাদ্দে প্রভাব ফেলতে পারে।
    ৩। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত: স্থানীয় প্রশাসন বা বরাদ্দ কমিটিতে চাকমা প্রতিনিধিদের আধিপত্য থাকতে পারে।

বৈষম্যের প্রভাব: সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ

এই বৈষম্যের ফলে অন্যান্য জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে বাঙালি, মারমা, ত্রিপুরা এবং ক্ষুদ্রতর উপজাতিগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে বঞ্চিত হয়েছে। এটি সামাজিক অসন্তোষ ও উত্তেজনা বাড়াতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রক্রিয়া, যা দীর্ঘদিন ধরে সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে, এই ধরনের বৈষম্যের কারণে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বাঙালি জনগোষ্ঠী, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও কম বরাদ্দ পেয়েছে, তাদের মধ্যে প্রশাসনের প্রতি অবিশ্বাস বাড়তে পারে। একইভাবে, মারমা, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিজেদের প্রতি উপেক্ষার অনুভূতি জন্ম নিতে পারে।

সমাধানের পথ: ন্যায্য বরাদ্দের প্রস্তাব

  • পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যার ভিত্তিতে বরাদ্দের সুবণ্টন হওয়া উচিত। এর জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে:
    ১। জনসংখ্যাভিত্তিক বরাদ্দ নীতি: প্রতিটি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যার অনুপাতে বরাদ্দ নির্ধারণ করা।
    ২। নিরপেক্ষ কমিটি গঠন: বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় সকল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করা।
    ৩। স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ: বরাদ্দের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ এবং তা পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়া।
সংগৃহীত

পার্বত্য চট্টগ্রামে বরাদ্দে বৈষম্য একটি গুরুতর সমস্যা, যা তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্ট। চাকমারা তাদের জনসংখ্যার তুলনায় ২-৩ গুণ বেশি সুবিধা পেয়েছে, যেখানে বাঙালি, মারমা, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠী তাদের প্রাপ্যের তুলনায় অনেক কম পেয়েছে। এই বৈষম্য দূর করতে নিরপেক্ষ ও জনসংখ্যাভিত্তিক বরাদ্দ নীতি প্রণয়ন জরুরি। অন্যথায়, এই অঞ্চলের সামাজিক সম্প্রীতি ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সকল জনগোষ্ঠীর প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।

লেখক: অনন্ত অসীম, রাঙামাটি ০২/০৪/২০২৫

আগের পোস্টবাংলাদেশ ভেঙে চট্টগ্রাম বন্দর দখল করি, বিজেপি নেতা প্রদ্যোত দেব বর্মা।
পরের পোস্টপাল্টাপাল্টি অপহরণের অভিযোগে উত্তেজনা: খাগড়াছড়িতে সংঘাতের আশঙ্কা।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন