কাউখালীতে বাঁশ পাচারকারী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি স্থানীয় পাহাড়ি- বাঙালি।

0

জাকির হোসেন | কাউখালী

রাঙামাটি কাউখালীতে চট্টগ্রাম রাঙ্গুনিয়া রানীরহাটের বাঁশ পাচারকারী একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রতিবছর জুন-জুলাই মাসে পাহাড়ের একটি আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করে। ঘাগড়ার কুজইছড়ি মইনে পাড়ায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ চাঁদা হিসেবে পরিশোধ করে। সূত্র মতে, প্রতিবছর এই চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় কোটি টাকারও বেশি। সংগঠনটি যাতে বাঁশ পাচারে কোনো বাধা সৃষ্টি না করে এবং অস্ত্র সংগ্রহে অর্থ জোগাতে পারে— সেই উদ্দেশ্যে এই অর্থ প্রদান করা হয়। এছাড়াও সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রায়ই সংগঠনের নেতাদের দামি ব্র্যান্ডের উপহার সামগ্রী প্রদান করে থাকে। গোপন সূত্রে আরও জানা যায়, মাঝে মাঝে সংগঠনটিকে নানাবিধ রসদও সরবরাহ করা হয়।

সূত্র আরও জানায়, সন্ত্রাসী সংগঠনটি কাউখালীর বাঁশঘাটা (ইছামতী খাল) পর্যন্ত বাঁশের চালি নামানোর জন্য বৃহস্পতিবার ও সোমবার খালে পানি ছাড়ে। এই দুই দিন ছাড়া বাকি সময় খালের পানি নিয়ন্ত্রণ করে রাখে এবং উৎসস্থলগুলোতে পানি প্রবাহ বন্ধ রাখে। এর ফলে নির্দিষ্ট দিন ছাড়া খালে বাঁশ নামানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। অর্থাৎ সংগঠনটি সচেতনভাবে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে দুই দিন বাঁশ পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পাহাড়ি বাসিন্দা বলেন, সন্ত্রাসী সংগঠনটি প্রায়ই বাঁশের উপর ধার্য চাঁদার পরিমাণ ইচ্ছেমতো বাড়িয়ে দেয়। তখন আমরা নিরুপায় হয়ে পড়ি। কারণ সংগঠনটি হঠাৎ করেই বাঁশ বাজারে আনা বন্ধ করে দেয় বা খালের পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে বাঁশ আনা সম্ভব হয় না। শেষ পর্যন্ত তাদের দাবি অনুযায়ী চাঁদা দিতে বাধ্য হতে হয়। চাঁদা পরিশোধের পরই তারা পুনরায় খালে পানি ছাড়ে। এভাবেই সংগঠনটি পুরো বাঁশ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে। শুধু কাউখালীর ইছামতী খাল নয়, বর্মাছড়ি ও সাত্তার খালেও একইভাবে পানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাঁশ চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয়।

এই বাঁশ পাচারকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আরো রয়েছে, নানান অভিযোগ-
কাউখালী উপজেলার বেতছড়ি এলাকায় ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টার পর অতিরিক্ত বাঁশ বোঝাই এক ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে পড়ে। মুহূর্তেই আশপাশের দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জনমনে তীব্র আতঙ্কের সঞ্চার ঘটে। এলাকাবাসীর দাবি—এই স্থানেই পূর্ববর্তী বছরগুলোতে অনন্ত পনেরটির অধিক বাঁশবোঝাই ট্রাক উল্টে দুর্ঘটনার সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনার পর পুলিশ ঘটনারস্থলে আসলে পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়ায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গুনিয়ার রানীরহাটের প্রভাবশালী বাঁশ পাচারকারী সিন্ডিকেটের ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পায় না। দীর্ঘদিন ধরে তারা প্রশাসনের একটি অংশকে ‘ম্যানেজ’ করে অবৈধভাবে অতিরিক্ত বাঁশ বোঝাই ট্রাক ও জীপ চালাচ্ছে। এমনকি জুন-জুলাই-আগস্ট যে তিন মাস বাঁশ কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে—চারা গজানের সেই মৌসুমেও—অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রশাসনকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে নির্বিচারে বনাঞ্চল থেকে বাঁশ আহরণ করে থাকে। এছাড়াও বন বিভাগ বাঁশ নেওয়ার ক্ষেত্রে যে পারমিট প্রদান করে তাও জালিয়াতি এবং ট্রাকে নিয়মের বাহিরে বাঁশ লোড করে৷ যা দেখার এবং তদারকি করার কেউ নেই। মূলত সরিষায় ভূত৷

এলাকাবাসীর বক্তব্য অনুযায়ী, কাউখালী বাঁশঘাটা কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অবৈধ লাইন—যেখান থেকে নিয়মিতভাবে চাঁদা উত্তোলন করা হয়। প্রতিটি বাঁশবোঝাই ট্রাক থেকে নাকি প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি, প্রভাবশালী মহল এবং অন্যান্য মাধ্যম নিয়মিত অর্থগ্রহণ করে থাকে। এই চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কের কারণে রানীরহাটের ব্যবসায়ীরা কোনো আইনকানুনকেই তোয়াক্কা করে না। তাদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়—“প্রশাসন আমাদের কাছ থেকে টাকা নেয়, আমাদের কিছুই করতে পারবে না।”

কাউখালীর কয়েকজন স্থায়ী বাসিন্দা জানান, প্রায় সমস্ত বাঁশই আহরিত হয় কাউখালী উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। বাঁশ পরিবহনের মূল খালও কাউখালী এলাকার মধ্য দিয়েই প্রবাহিত। কেবল বাঁশঘাটার একটি ক্ষুদ্রাংশ চট্টগ্রাম রাঙ্গুনিয়া সীমান্তে অবস্থিত। কিন্তু সেই সীমান্তসংলগ্ন অংশকে কেন্দ্র করেই পুরো বাঁশ বাণিজ্য, চাঁদা উত্তোলন ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে রানীরহাটের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর হাতে বন্দী। তারা কাউখালীর স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করে থাকে, যার পেছনে রয়েছে প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তির আশ্রয়-প্রশ্রয়।

এদিকে অতিরিক্ত বাঁশ বোঝাই ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলে কাউখালী সড়ক এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। স্কুলপড়ুয়া শিশুসহ সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কায় ভয়ে চলাচল করে। এই ট্রাকগুলোর অতি-ভারবাহী চাপ ও অতিরিক্ত বোঝাই সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ খুঁটি, তার ও দোকানপাটে নিয়মিত ক্ষতি সাধন করছে। তবুও ক্ষতিগ্রস্তরা কোনোরূপ প্রতিকার পান না। অভিযোগ করলে উল্টো প্রশাসনের কিছু সদস্য অর্থের বিনিময়ে ভুক্তভোগীদের হয়রানি করে থাকে।

স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই এসব অসাধু বাঁশ ব্যবসায়ী ও তাদের গাড়িচালকদের দাপটে জিম্মি হয়ে আছে। প্রশাসনের উদাসীনতা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত মহলের মদদে এই অবৈধ বাণিজ্য আজ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

এলাকাবাসীরা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট বিনীত আবেদন জানিয়েছেন—অবিলম্বে অবৈধ পাচার ও অতিরিক্ত বাঁশ পরিবহন ও বেপরোয়া গতিতে চলাচলকারী ট্রাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। নচেৎ যে কোনো সময় বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা সংঘটিত হতে পারে, যার দায় প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারবে না।

আগের পোস্টপিসিসিপি’র প্রতিবাদে ভূমি কমিশনের বৈঠক স্থগিত।
পরের পোস্টশরণার্থী টাস্কফোর্স সভা আয়োজন নিয়ে উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে পিসিএনপি।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন