ভারতে অস্ত্র পাচার মামলায় খারিজ ১, জেএসএস সদস্যদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য পরোয়ানা।

0

ভারতের মিজোরামে বাংলাদেশী সশস্ত্র গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর সাথে যুক্ত একটি বড় অস্ত্র পাচার মামলায় গৌহাটি হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ (বিচারপতি আর. ফুকন ও অন্যান্য) জাতীয় তদন্ত সংস্থা (NIA)-এর আপিল খারিজ করে প্রধান অভিযুক্ত ভারতীয় নাগরিক রোহমিংলিয়ানা প্রকাশ হ্মিংটে/ হ্মিংগাকে খালাস দিয়েছে। গত ০৫.০৯.২০২৪ খ্রি. আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, NIA অস্ত্রের “দখল” (possession) প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে, জেএসএস-এর অন্য চার আসামী— ১) মনি ত্রিপুরি, ২) রবি চাকমা, ৩) সবুজ চাকমা এবং ৪) সি. লালনঘাকথাঙ্গা—জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর পালিয়ে গেছেন, এবং তাদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।

২০১৩ সালে মিজোরামের লেংপুই বিমানবন্দরের কাছে রোহমিংলিয়ানার খামারবাড়ি থেকে মিজোরাম পুলিশ ও আসাম রাইফেলসের যৌথ অভিযানে ৩১টি AK-47 রাইফেল, ১টি Ultimax 100 Mark-III রাইফেল, ১টি Browning Automatic Rifle, ম্যাগাজিন এবং ৮০৯ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার হয়। এই অস্ত্রগুলি মিয়ানমার থেকে ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত ছিল। NIA-এর তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, জেএসএস ভারত ও মিয়ানমার থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহী ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালায়। এই গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে ভারতের তদন্ত সংস্থা তাদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করে।

NIA বিশেষ আদালত প্রধান আসামী রোহমিংলিয়ানার বিরুদ্ধে প্রমাণ অপর্যাপ্ত পেয়ে গত ২৫.১০.২০১৮ তারিখে তাকে খালাস দেয়। পর NIA ওই প্রধান আসামী রোহমিংলিয়ানার বিরুদ্ধে আপিল করে। গৌহাটি হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে আপিল খারিজ করে দেয়। তবে নিম্ন আদালতে অন্য চার আসামীয়ের বিরুদ্ধে মামলা এখনও রয়েছে, পাশাপাশি সাইরাং থানায় বাংলাদেশি সংগঠন জেএসএস-এর সদস্যদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি আছে।

পলাতক আসামীদের খুঁজে বের করতে NIA-এর তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তবে, এই চার আসামী পালাতক থাকায় মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। এই রায় ভারত-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে অস্ত্র পাচার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে।

তবে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) প্রতিপক্ষ সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ভারতের গৌহাটি হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে আসামি রোহমিংলিয়ানার বিরুদ্ধে করা NIA আপিল খারিজের রায়ের ৬৯ পৃষ্ঠার কপি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে অপব্যাখ্যা ছড়াচ্ছে। তারা দাবি করছে, আদালত নাকি জেএসএস-কে “সন্ত্রাসী সংগঠন” হিসেবে ঘোষণা করেছে।

তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, আদালতের ওই রায়ের পূর্ণ ৬৯ পৃষ্ঠার কপি, মামলার ইতিহাস এবং অন্যান্য আসামিদের বিরুদ্ধে জারি করা জামিন অযোগ্য পরোয়ানা স্পষ্টভাবে দেখায় যে—ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (NIA)-র চার্জশিটে জেএসএস-এর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ উপস্থাপন করা হলেও গৌহাটি হাইকোর্ট নিজে জেএসএস-কে “সন্ত্রাসী সংগঠন” হিসেবে ঘোষণা করেনি।

অন্যদিকে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ বা ঘোষণা জারি করা হয়নি, যা আইন অনুযায়ী “সন্ত্রাসী সংগঠন” ঘোষণা করার বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়ার অংশ। ফলে ইউপিডিএফ ও তাদের ঘনিষ্ঠ মহলের প্রচারিত এই তথ্য বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তবতার পরিপন্থী।

এদিকে ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি মিজোরামের মামিত জেলার সাইথাহ গ্রামে পুলিশ একটি বড় অস্ত্র চালান অবরোধ করে, যাতে ৬টি AK-47 রাইফেল, ১৩টি ম্যাগাজিন এবং ১০,০৫০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়। এই অস্ত্রগুলো ছিল মায়ানমারের চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (CNF) এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টসের ইউপিডিএফ-এর মধ্যে বাণিজ্যের জন্য নির্ধারিত। পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে CNF-এর একজন নেতা ছিলেন এবং অন্তত দুজন ইউপিডিএফ-সংশ্লিষ্ট। মামিত জেলার ওয়েস্ট ফেইলেং পুলিশ স্টেশনে মামলা দায়ের হয়। পরে এই মামলা NIA-র কাছে হস্তান্তরিত হয় এবং জুলাই ২০২৫-এ পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দায়ের করা হয়।

উল্লেখ যে, সাইরাং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ০৯.০৩.২০১৩ তারিখে, অস্ত্র আইনের ধারা ২৫(1AA) এবং ধারা ৩৪ আইপিসি সহ পঠিত, ধারা ১৪ বিদেশী আইন সহ পঠিত, এর অধীনে সিরাং থানার মামলা নং ৮/২০১৩ নামে একটি মামলা দায়ের করেন এবং মামলার তদন্তের জন্য এসআই লিয়ানসাংজেলাকে অনুমোদন করেন। এসআই লালসাঙ্গা যখন তদন্ত পরিচালনা করছিলেন, তখন ভারত সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা-১ বিভাগ, ০৩.০৬.২০১৩ তারিখের চিঠিতে, জাতীয় তদন্ত সংস্থা আইন, ২০০৮ এর ধারা ৬(৫) এবং ধারা ৮ এর অধীনে ক্ষমতা প্রয়োগ করে মামলাটি জাতীয় তদন্ত সংস্থা (“এনআইএ”, সংক্ষেপে) তদন্তের জন্য স্থানান্তর করে। এরপর, এনআইএ একটি মামলা দায়ের করে, যার নাম RC-02/2013/NIA-GUW এবং তদন্ত সম্পন্ন করে। তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর, অভিযুক্ত মনি ত্রিপুরী, সবুজ চাকমা, রবি চাকমা, সি. লালংঘাকথাঙ্গা @ নঘাকা এবং বিবাদী রোহমিংলিয়ানা @ হ্মিংটে @ হ্মিংগার বিরুদ্ধে ১৯৬৭ সালের বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনের ধারা ২৩(২) এবং ১৯৫৯ সালের অস্ত্র আইনের ধারা ২৫(1AA) এর সাথে পঠিত, চূড়ান্ত প্রতিবেদন/চার্জশিট দাখিল করে। উক্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন/চার্জশিটের ভিত্তিতে, বিজ্ঞ বিচার আদালত অপরাধটি আমলে নেয় এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য পরোয়ানা  জারি করে।

আগের পোস্টলংগদুতে সেনা অভিযানে অবৈধ অস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য জব্দ।
পরের পোস্টপাহাড় পেরিয়ে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক মাঠে ইউপিডিএফ এর নৃশংস হামলায় আহত ৬

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন