ত্য চট্টগ্রামের চাকমা ও মারমা ভাষার প্রাক প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকে বাংলা বর্ণমালা সংযোজনের বিষয়টি সম্প্রতি রাজনৈতিক এজেন্ডা প্রমোট করার সুযোগ জন্ম দিয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মহোদয়ের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়, যাতে এই সংযোজনকে বন্ধ করার দাবি তোলা হয়। পরবর্তীতে, ২১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে কথিত রাজা দেবাশীষ রায় (চাকমা সার্কেল চীফ), কথিত রাজা সাচিংপ্রু চৌধুরী (মং সার্কেল চীফ) সহ কয়েকজনের পক্ষ থেকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়, যাতে স্মারকলিপির সমর্থন করা হয় এবং সরকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। কিন্তু এই দাবিগুলো কতটা যুক্তিযুক্ত? আজকের এই ব্লগে আমরা স্মারকলিপি এবং প্রেস বিজ্ঞপ্তির মূল পয়েন্টগুলো পর্যালোচনা করব এবং সেগুলোকে ঐতিহাসিক, আইনি এবং বাস্তব তথ্যের আলোকে বিশ্লেষণ করব।
- স্মারকলিপি এবং প্রেস বিজ্ঞপ্তির সারাংশ:
স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়েছে যে, চাকমা ও মারমা ভাষার পাঠ্যপুস্তকে নিজস্ব বর্ণমালার পাশাপাশি বাংলা বর্ণমালা যোগ করা শিশুদের শিক্ষায় ক্ষতিকর। মূল যুক্তি:– নিজস্ব বর্ণমালার মর্যাদা হ্রাস এবং ভাষাগত আত্মপরিচয় সংকট।
– আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের লঙ্ঘন এবং শিক্ষা প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি।
– উচ্চারণ বিকৃতি এবং ভাষার অস্তিত্বের ঝুঁকি।
– জাতীয় অঙ্গীকার (যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭) এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালা (UNDRIP, UNESCO) লঙ্ঘন।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, শুধু নিজস্ব বর্ণমালা ব্যবহার করা, বাংলা প্রতিবর্ণীকৃত বইগুলোকে সহায়ক উপকরণ হিসেবে রাখা, শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই স্মারকলিপির উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, ২০১৭ সাল থেকে আদিবাসী ভাষায় বই প্রকাশ করা হলেও, দ্বৈত বর্ণমালা শিক্ষায় বিঘ্ন ঘটাবে। সান্তালি ভাষার ক্ষেত্রে এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে মৌখিক অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। স্মারকলিপি ও প্রেস বিজ্ঞপ্তি স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন দেবাশীষ রায়, সাচিংপ্রু চৌধুরী, শ্রীমৎ শ্রদ্ধালঙ্কার মহাথেরো ও গৌতম দেওয়ান প্রমুখসহ ২৪ জন।
আদিবাসী দাবির পিছনে সত্যতা কতটা?
স্মারকলিপি এবং প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নিজেদের “আদিবাসী” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু এটি একটি ভুল ধারণা বা রাজনৈতিক এজেন্ডা। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ ক অনুচ্ছেদে এই জাতিসত্তাগুলোকে “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী” বা “উপজাতি” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যাতে তাদের ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (১৯৯৭) এর শুরুতেই এ অঞ্চলকে “উপজাতীয় অধ্যুষিত অঞ্চল” বলে বর্ণনা করা হয়েছে। চুক্তির “খ” খণ্ডের জেলা পরিষদ আইনে স্পষ্টভাবে “উপজাতি” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে, এই জাতিসত্তাগুলো বাংলাদেশের আদি আদিবাসী নয়। তারা ভারত, মায়ানমার (চম্পক নগর), তিব্বত এবং মঙ্গোলিয়া থেকে আসা, এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে শরণার্থী হিসেবে আগমন করেন মাত্র ২০০-৩০০ বছর আগে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধির ৫২ ধারায় ব্রিটিশরা তাদের অভিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি চুক্তি সম্পাদনের সময় যখন তাদেরকে আদিবাসী হিসেবে প্রস্তাব দেওয়া হয় তখন সন্তু লারমা এবং দেবাশীষ রায় নিজেরা বলেছিলেন যে, দেশে উপজাতি আছে কিন্তু আদিবাসী নেই। রাঙ্গামাটির সাবেক এমপি দীপংকর তালুকদারের সাথে আলোচনায় তারা “উপজাতি” হিসেবে চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
দেবাশীষ তত্বাবধায়ক সরকার আমলে ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা৷ তখন তিনি উপজাতি হিসেবে চিঠি পাঠান।
হঠাৎ কেন আদিবাসী দাবি?
২০০৭ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রকাশিত “আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সংবলিত ঘোষণাপত্র”-এর পর থেকেই বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতিরা হঠাৎ করেই নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি করতে শুরু করে। আগে যারা স্বেচ্ছায় উপজাতি পরিচয় ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় কোটা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছিল, তারাই এখন “উপজাতি” শব্দটি শুনলেই ক্ষুব্ধ হন। কারণ, ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের জন্য দেওয়া হয়েছে বিশেষ আন্তর্জাতিক অধিকার—নিজস্ব ভূমি, জাতীয় লাভের অধিকার, সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা, ভাষা, স্বশাসন ও আন্তর্জাতিক তহবিলের সুবিধা। এসব সুবিধা অর্জনের আকাঙ্ক্ষাই এখন তাদের দাবির মূল চালিকা শক্তি। অথচ জাতিসংঘের ILO কনভেনশন ১৬৯ অনুযায়ী তারা উপজাতি হিসেবে A এর মৌলিক শর্ত পূরণ করলেও আদিবাসী হওয়ার B শর্ত পূরণে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ।
স্মারকলিপির প্রথম স্বাক্ষরকারী দেবাশীষ রায় নিজেকে “রাজা” হিসেবে দাবি করেন, কিন্তু তিনি মাত্র চাকমা সার্কেল চীফ। যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির অধীনে তিনি এই পদে আছেন, সেখানে কোথাও “আদিবাসী” শব্দ নেই। ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শাহানারা ইয়াসমিনের চিঠিতে দেবাশীষ রায়কে নাগরিক সনদ প্রদানে সংবিধান অনুযায়ী শব্দ ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়। চুক্তির “খ” খণ্ডের ১ নং ধারায় “উপজাতি” শব্দ বলবৎ রাখার কথা বলা হয়েছে। বোমাং এবং মং সার্কেল এই নির্দেশ পালন করলেও, চাকমা সার্কেল উপেক্ষা করছে।
পাঠ্যপুস্তকে বাংলা বর্ণমালা যোগের যুক্তি:
স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়েছে যে, দ্বৈত বর্ণমালা শিশুদের ক্ষতি করবে। কিন্তু বাস্তবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের মধ্যে ৯৯% এরও বেশি মানুষ চাকমা বা মারমা বর্ণমালা জানে না। সরকার চুক্তির শর্ত অনুসারে মাতৃভাষায় শিক্ষা চালু করতে চাইলেও, সংশ্লিষ্ট ভাষার শিক্ষক পাওয়া যায় না। উপজাতিদের বারবার আহ্বান করা হয়েছে এগিয়ে আসার জন্য, কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি। পাঠ্যপুস্তক তৈরির পরও পাঠদান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শিক্ষকের অভাবে। তাই, শিক্ষক প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে বাংলা বর্ণমালা যোগ করা হয়েছে, যাতে শিশুরা সহজে বুঝতে পারে এবং শিক্ষা অব্যাহত থাকে। এটি শিশুদের সুবিধার জন্য, কোনো ক্ষতির জন্য নয়। সান্তালি ভাষার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের উদাহরণ দেওয়া হলেও, চাকমা-মারমার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন—এখানে বাস্তবতা হলো শিক্ষকের অভাব।
এই স্মারকলিপির পিছনে লুকানো এজেন্ডা:
এই স্মারকলিপি এবং প্রেস বিজ্ঞপ্তি আসলে “আদিবাসী” শব্দকে প্রমোট করার এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি এগিয়ে নেওয়ার একটি চেষ্টা মাত্র। স্বাক্ষরকারীরা অনেকে পূর্বে উপজাতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও, এখন ভোল্ট পাল্টিয়ে আদিবাসী দাবি করছেন। এটি অহেতুক বিতর্ক তৈরি করা, যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলবে। সরকারের উদ্যোগটি শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য, যা জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০ এবং চুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষা শিক্ষা একটি সংবেদনশীল বিষয়, কিন্তু এটিকে রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। স্মারকলিপি এবং প্রেস বিজ্ঞপ্তির দাবিগুলো আইনি এবং ঐতিহাসিক তথ্যের সাথে মেলে না। সরকারের সিদ্ধান্ত—দ্বৈত বর্ণমালা যোগ—একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ, যা শিক্ষক প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত শিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখবে। আমরা সকলে মিলে সত্যিকারের উন্নয়নে কাজ করি, মিথ্যা দাবির ফাঁদে না পড়ি। আপনাদের মতামত কমেন্টে জানান!



