ধর্মান্তরিতকরণের নতুন ছদ্মবেশ: বান্দরবানে বিদেশি পর্যটকদের “খ্রিস্টানাইজেশন” তৎপরতা।

0

পার্বত্য চট্টগ্রাম—বাংলাদেশের একটি সংবেদনশীল ভূখণ্ড, যেখানে ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। বান্দরবানে বিদেশি নাগরিকদের গোপন ধর্মীয় কার্যক্রম এই টানাপোড়েনকে নতুন মাত্রায় উস্কে দিয়েছে। গত সোমবার ২০ অক্টোবর ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে বান্দরবানের একটি হোটেলে Life World Mission নামের একটি আন্তর্জাতিক এনজিওর ১ জন আমেরিকান ও ১১ জন দক্ষিণ কোরিয়ান নাগরিক স্থানীয় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের প্রায় নব্বই জন উপজাতিকে নিয়ে গোপন ধর্মীয় সভা আয়োজন করে। সভায় বাইবেল পাঠ, খ্রিস্টীয় প্রার্থনা, গান এবং আর্থিক ও শিক্ষাগত সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে অংশগ্রহণকারীদের খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা চলছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

এই খবর ছড়িয়ে পড়লে ২১ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান কাজী মজিবর রহমান নেতৃত্বে স্থানীয় জনসাধারণ হোটেল ডিমোর ঘেরাও করে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। পরে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ওই বিদেশিদের পুলিশ প্রটেকশনে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে পাঠানো হয়।

উক্ত “খ্রিস্টানাইজেশন” কার্যক্রমে অংশ নেওয়া বিদেশিদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়ানা কিম এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াংসান পার্ক, সুমি লি, বংসুন পার্ক, ইওন কিয়ং ও, ইওন কিয়ং বাইক, চ্যাংহো চো, হুন ইল চোই, সন উং কিম, চ্যাং সান চোই, হিউং ইল কিম ও চোল ই হং। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তারা উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে পাহাড়ের দরিদ্র উপজাতিদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। অর্থনৈতিক সহায়তা, শিশুদের শিক্ষা স্পনসরশিপ, এমনকি চিকিৎসা সহায়তার প্রতিশ্রুতিও ছিল এই প্রলোভনের অংশ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়—“পাহাড়ের সহজসরল উপজাতিদের ধর্মান্তরিত করার অপচেষ্টা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ।” তারা দাবি করে, এনজিওর ছদ্মবেশে বিদেশি নাগরিকরা সাংস্কৃতিক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে বান্দরবান জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনে কাজী মজিবর রহমান বলেন, “যখন উপজাতি বৌদ্ধ, হিন্দু বা প্রকৃতি উপাসক খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয় তখন কোনো উপজাতি সংগঠন, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা মানবাধিকার সংগঠন কথা বলে না; কিন্তু যদি কেউ স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, তখনই উগ্রবাদ ও ধর্মীয় নির্যাতনের তত্ত্ব সামনে আনা হয়।”

তথ্য ও পরিসংখ্যানের বাস্তব চিত্র: বিগত দুই দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্মান্তরিতকরণের প্রকৃত চিত্র একেবারেই বিপরীত। দৈনিক জনকণ্ঠের ২৪ এপ্রিল ২০২১ সংখ্যার তথ্য অনুযায়ী—

১৯৯৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৩৪৪ জন উপজাতি নাগরিক খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন, যেখানে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন মাত্র ৪৫০ জন। একই সময়ে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেছেন ৭৬ জন মাত্র।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ১৯৯১ ও ২০১১ সালের আদমশুমারির তুলনা করলে দেখা যায়—
১৯৯১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যা ছিল ৯৭৪,৪৪৫ জন। এর মধ্যে মুসলমান ছিলেন ৪২৯,৯৫৪ জন, অর্থাৎ ৪৪.১২ শতাংশ। ২০১১ সালে মোট জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১৫,৯৮,২৩১ জন, মুসলমানের সংখ্যা হয় ৬৮০,৮১০ জন, অর্থাৎ ৪২.৬০ শতাংশ—অর্থাৎ মুসলিম জনসংখ্যা কমেছে প্রায় ২ শতাংশ।

অন্যদিকে খ্রিস্টান জনসংখ্যা ১৯৯১ সালের ২২,২০৬ জন থেকে ২০১১ সালে বেড়ে ৫২,০৬৬ জনে দাঁড়িয়েছে—যা ১৩৪.৪৭ শতাংশ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত মানুষের সংখ্যা এখন ৬০ হাজারেরও বেশি।

গির্জার বিস্তার ও ধর্মীয় অবকাঠামোর তুলনামূলক চিত্র: ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে গির্জার সংখ্যা ছিল মাত্র ২৭৪টি। ২০২২ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬৪টি গির্জা। একই সময়ে বৌদ্ধ কিয়াংয়ের সংখ্যা ১১১৯ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৬৬০টি, হিন্দু মন্দির ২৭০ থেকে ৪৪৬টি। কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে খ্রিস্টান ধর্মীয় স্থাপনার বৃদ্ধি যে কতটা দ্রুতগতিতে ঘটেছে তা এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট।

এনজিওর ছদ্মবেশে ধর্মান্তর: তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, ইতোপূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান মিশনারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে কারিতাস, ওয়ার্ল্ড ভিশন, সনে ইন্টারন্যাশনাল, কমিউনিটি অ্যাডভান্সমেন্ট ফোরাম এবং ব্যাপ্টিস্ট চার্চ অব বাংলাদেশ প্রভৃতি এনজিও। এসব সংস্থা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের নামে উপজাতিদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করলেও এর অন্তরালে ধর্মান্তরিতকরণের প্রবল তৎপরতা বিদ্যমান। একবার কোনো পরিবার তাদের প্রোগ্রামে যুক্ত হলে ধীরে ধীরে তাদের ধর্মীয় রীতি, উৎসব এবং এমনকি নামপরিচয়েও পরিবর্তন আসে।

উদাহরণস্বরূপ, অনেক ত্রিপুরা পরিবার এখন ক্রিসমাস উদযাপন করছে, পূর্বপুরুষের পূজা বা ‘বিষু’ উৎসবের পরিবর্তে। বৌদ্ধ মারমাদের মধ্যে ‘Sunday Worship’ বা গির্জার প্রার্থনাও বাড়ছে দ্রুত। এই পরিবর্তন শুধু ধর্মীয় নয়—সাংস্কৃতিক ও সামাজিক স্বকীয়তার ওপরও গভীর আঘাত হানছে।

অপপ্রচার ও বিভ্রান্তির রাজনীতি: অন্যদিকে, বিগত বছর কিছু উপজাতি উগ্রবাদী গোষ্ঠী ড. ইউসুফ আলী নামে এক স্থানীয় ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ইসলাম ধর্মে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার অপপ্রচার ছড়িয়েছে। অথচ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিনি মূলত এতিম ও অনাথ শিশুদের শিক্ষা ও আশ্রয় দিচ্ছেন; কারো ওপর ধর্ম চাপিয়ে দিচ্ছেন না। অথচ খ্রিস্টান মিশনারিরা যখন স্পষ্টভাবে বাইবেল, অর্থ ও বিদেশি সহায়তার প্রলোভন দেখায়, তখন এসব গোষ্ঠী চুপ থাকে।

বিশ্লেষণ: ধর্মান্তরিতকরণ নাকি কৌশলগত প্রভাব বিস্তার?

ধর্মান্তরিতকরণ শুধু ধর্মীয় ইস্যু নয়; এটি সামাজিক-রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত কৌশলের অংশ বলেই অনেকে মনে করেন। পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত করে বিদেশি স্বার্থ বাস্তবায়নের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা—এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হতে পারে। এনজিওর তত্ত্বাবধানে খ্রিস্টান শিক্ষা ও সামাজিকীকরণের ফলে অনেক উপজাতি তরুণ-তরুণী এখন রাজধানী ও বিদেশে ধর্মীয় প্রশিক্ষণে যুক্ত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক গঠনকে আমূল বদলে দিতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—“প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্ম পালনের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের সমানভাবে থাকবে।” সেই অধিকার নিশ্চয়ই থাকবে, কিন্তু বিদেশি অর্থে পরিচালিত ধর্মীয় প্রভাব বিস্তার রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী।

বান্দরবানে বিদেশি মিশনারিদের প্রবেশ, তাদের গোপন ধর্মীয় সভা, এবং পরবর্তীতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ—সবকিছুই প্রমাণ করে যে পার্বত্য চট্টগ্রামে “খ্রিস্টানাইজেশন” এখন বাস্তব হুমকি। এ প্রক্রিয়ায় যারা ধর্মান্তরিত হচ্ছে, তারা হয়তো অর্থনৈতিক মুক্তির আশায় পথ খুঁজছে, কিন্তু বাস্তবে তারা হারাচ্ছে নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরিচয়।

আজ যখন কিছু সশস্ত্র উপজাতি সংগঠন ইসলামধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া নিয়ে অপপ্রচার ছড়াচ্ছে, তখন তাদের নীরবতা পাহাড়ে চলমান খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রভাব বিস্তারের সত্যকে আরও উন্মোচন করছে। সময় এসেছে সরকারের উচিত পদক্ষেপ নেওয়ার—দেশি-বিদেশি এনজিওর ধর্মীয় উদ্দেশ্যমূলক কার্যক্রম কঠোরভাবে নজরদারিতে আনা, এবং পাহাড়ের জনগণকে সচেতন করা যে উন্নয়ন নয়, প্রকৃত স্বাধীনতা আসে নিজস্ব ধর্ম, সংস্কৃতি ও মর্যাদা রক্ষার মাধ্যমে।

আগের পোস্টবাঘাইছড়িতে জেএসএস এর হামলা: বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট, এলাকায় আতঙ্ক।
পরের পোস্টচাকমা-মারমা বর্ণমালা বিতর্কে দেবাশীষ রায়ের ‘আদিবাসী’ পরিকল্পনা—পেছনের রাজনীতি কী?

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন