পার্বত্য চট্টগ্রাম—যেখানে মানবাধিকারের স্লোগান, জাতিসংঘের নীতিকথা আর তথাকথিত জাতিগত অধিকারের আন্দোলনের ঢোল প্রতিনিয়ত বাজে, সেখানে আজও এক অন্ধকার বাস্তবতা নিঃশব্দে ছড়িয়ে আছে। একই অপরাধ—কিন্তু বিচার ও প্রতিক্রিয়ায় ভয়ংকর বৈষম্য। ধর্ষক যদি হয় বাঙালি, তখন পাহাড় উত্তাল হয়ে ওঠে; কিন্তু ধর্ষক যদি হয় স্বজাতি, তখন প্রথাগত বিচারের নামে অপরাধেরই বৈধতা দেওয়া হয়। এই দ্বিচারিতা শুধু নৈতিক পতনের নয়, এটি আইনি ও মানবিক শূন্যতার নগ্ন উদাহরণ।
খাগড়াছড়ির ঘটনার মাস পার না হতেই পাশের জেলা রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরম ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড চংড়াছড়ি মূখ এলাকায় ঘটে আরেক মর্মান্তিক ঘটনা। প্রতিবন্ধী এক মারমা নারীকে একই সম্প্রদায়ের তিন লম্পট যুবক—অনুচিং মারমা (৫০), কালা মারমা (৫৫) ও মং উ মারমা (৩৫), ধারাবাহিকভাবে ধর্ষণ করে। ভয়ংকর তথ্য হলো, এই ধর্ষণের ফলে ভিকটিম পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। অথচ ১৭ অক্টোবর স্থানীয়ভাবে ‘প্রথাগত বিচার’-এর নামে যে রায় দেওয়া হয়, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্ক হয়ে থাকবে—একটি শুকর জরিমানা এবং ভিকটিমের কাছ থেকেই ৫ হাজার টাকা আদায়! অর্থাৎ ধর্ষণের শিকার নারীই হলো শাস্তিপ্রাপ্ত!
এই রায়ে বিচার পরিসমাপ্তি হলেও অন্তঃসত্ত্বা নারীর সন্তানের পিতার পরিচয় বের করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। DNA পরীক্ষা ছাড়া এটি বের করা সম্ভব নয় আর এজন্য প্রয়োজন ছিল পুলিশ কেইস। অর্থাৎ দেশের প্রচলিত বিচার। একজন নারী সারাজীবন তার সন্তানের পিতৃপরিচয় নিয়ে ভুগবে; একইভাবে সন্তানও সামাজিকভাবে অপমান ও প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায় বড় হবে। এটি শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি সমাজিক অবিচার—যেখানে ‘প্রথাগত’ নামে নারী ও শিশুর ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়।
কার্বারী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই প্রথাগত বিচার হয়েছে বলে স্বীকারও করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে—ধর্ষণ, যা রাষ্ট্রীয় আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ, সেখানে কীভাবে ঐতিহ্যের আড়ালে আইনের বিকৃতি ঘটানো হলো? পৃথিবীর কোনো সমাজে ধর্ষণের শিকার নারীর কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের নজির নেই। কিন্তু পাহাড়ে সেটিই ঘটল।
খবর পেয়ে চন্দ্রঘোনা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিকটিম ও তার পরিবারকে আইনগত সহায়তা দিতে গেলে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী দলের বাধার মুখে পড়ে। সশস্ত্র উপস্থিতি এতটাই ছিল যে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। অর্থাৎ পাহাড়ে আইন নয়, অস্ত্র ও দলীয় প্রভাবই নির্ধারণ করে ন্যায়বিচার হবে কি না। এই ভয়ানক বাস্তবতায় নারী শুধু নির্যাতিত নয়, সমাজ ও সন্ত্রাসী রাজনীতির হাতে বন্দী।
দ্বিচারিতার নগ্ন উদাহরণ: এই ঘটনায় কোনো প্রতিবাদ হয়নি। না পাহাড়ি নারী সংগঠন, না বাম ঘরানার রাজনৈতিক দল, না মানবাধিকার কমিশন—সবাই নীরব। দেশের মিডিয়া পাড়াও শান্ত। অথচ যখন অভিযুক্ত বাঙালি হয়, তখন আকাশ-বাতাস কেঁপে ওঠে প্রতিবাদের স্লোগানে। চাকমা সার্কেল চীফ দেবাশীষ রায়ের স্ত্রী ইয়েন ইয়েন তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ন্যায়বিচার চাই’ আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠেন। কিন্তু প্রতিবন্ধী মারমা নারীর এই ঘটনায় তাঁর রহস্যজনক নীরবতা প্রমাণ করে, ন্যায়বিচারের আহ্বান নয়—রাজনীতি ও জাতিগত পক্ষপাতই তাঁদের আসল উদ্দেশ্য।
এর আগে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার সিঙ্গিনালা এলাকায় এক উপজাতি অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীকে গণধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। সেনাবাহিনী দ্রুত অভিযুক্ত চয়নশীল দাসকে আটক করে। কিন্তু মেডিকেল রিপোর্টে পরে প্রমাণিত হয়—ধর্ষণের কোনো আলামতই পাওয়া যায়নি। অথচ এই অভিযোগকে ঘিরে ইউপিডিএফ ও তাদের সহযোগী সংগঠন: পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ ব্যানারকে ব্যবহার করে পাহাড় অস্থিতিশীল করতে মাঠে নামে।
২৫ সেপ্টেম্বর তারা সমাবেশের পর অঘোষিত অবরোধ ডাকে। অবরোধে সড়কে গাছ ফেলা, যান চলাচল বন্ধ, সেনাবাহিনীর গাড়ি আটকানোর চেষ্টা—সবই ঘটে। রামগড়ে বিজিবির গাড়িকে পর্যন্ত পিছু হটতে হয়। পরদিন ২৬ সেপ্টেম্বর তারা খাগড়াছড়ি শহরে সমাবেশ করে সেনাবাহিনীর গাড়ি ভাংচুর করে। এই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে প্রশাসন বাধ্য হয় ১৪৪ ধারা জারি করতে। ২৭ সেপ্টেম্বর সংঘর্ষে গুইমারায় তিনজন নিহত হয়, আহত হয় অনেক, রামসু বাজার জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, বহু দোকান লুট হয়—এটাই তথাকথিত ন্যায়বিচারের রূপ!
ধর্ষণের প্রমাণ না থাকলেও বাঙালি ও সেনাবাহিনীকে দায়ী করে প্রচারণা চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট, ঢাকায় কিছু বাম ও তথাকথিত মানবাধিকার কর্মীর প্রেস রিলিজ—সব মিলিয়ে এটি ‘তথ্য সন্ত্রাসে’র এক নিখুঁত উদাহরণ। পাহাড়ের শান্তি, নিরাপত্তা বাহিনীর ভাবমূর্তি এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণা তৈরিই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
চংড়াছড়ি ঘটনার ‘প্রথাগত বিচার’ আসলে অপরাধ লুকানোর হাতিয়ার। উপজাতি সমাজের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এই প্রথার দোহাই দিয়ে ধর্ষকদের রক্ষা করেন এবং নারীর ন্যায়বিচার কেড়ে নেন। এতে শুধু ভিকটিমের প্রতি অবিচার হয় না, বরং রাষ্ট্রীয় আইনেরও অবমাননা ঘটে। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী, ধর্ষণ রাষ্ট্রদ্বারা পরিচালিত অপরাধমূলক মামলা—এটি ব্যক্তিগত আপসযোগ্য নয়। কিন্তু পাহাড়ে অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর ভয়ে আইন সেখানে পৌঁছায় না।
পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে—বাঙালি কর্তৃক কোনো অভিযোগ উঠলে সেটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হয়, কিন্তু স্বজাতি কর্তৃক অপরাধ ঘটলে সেটি ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে ধামাচাপা দেওয়া হয়। এর পেছনে আছে ইউপিডিএফ, জেএসএস ও কেএনএফ এর মতো আঞ্চলিক দলগুলোর গভীর রাজনৈতিক হিসাব। তারা জাতিগত ঐক্যের নামে অপরাধীদের রক্ষা করে, যেন রাষ্ট্রীয় আইন সেখানে দুর্বল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংস্থা, এনজিও ও জাতিসংঘে তারা শুধু বাঙালিবিরোধী বিবৃতি পাঠায়, কিন্তু নিজের সমাজের নারীর প্রতি দায়বদ্ধতা শূন্য।
প্রশ্ন জাগে—একই ভূখণ্ডে দুটি বিচারব্যবস্থা কেন? রাষ্ট্রের সংবিধান বলে, “আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান।” কিন্তু বাস্তবে পাহাড়ে যেন দুটি রাষ্ট্র—একটি দৃশ্যমান, আরেকটি অদৃশ্য। একদিকে সেনাবাহিনী ও প্রশাসন আইন প্রয়োগ করতে গেলে বাধা, অন্যদিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও উপজাতি নেতৃত্ব ‘প্রথা’ নামের আড়ালে আইনের জায়গায় নিজস্ব শাসন কায়েম করছে। রাষ্ট্রের নীরবতা এই অপরাধচক্রকে আরও সাহসী করে তুলছে।
এই নিয়ে আআইনজ্ঞরা মনে করেন, পাহাড়ে ধর্ষণ শুধু নারী নির্যাতনের বিষয় নয়; এটি একটি রাজনৈতিক অস্ত্র, যা জাতিগত বিভাজনকে জিইয়ে রাখে। রাঙামাটির প্রতিবন্ধী নারী কিংবা খাগড়াছড়ির তথাকথিত ভিকটিম—দুজনই এক রাজনৈতিক নাটকের অংশ হয়ে গেছেন। একজন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত, অন্যজন রাজনৈতিক প্রচারণার বলি।
সচেতন মহল বলছেন, ধর্ষক যদি স্বজাতি হয়, তবে ‘প্রথাগত বিচার’; কিন্তু বাঙালি হলে ‘দ্বিচারিতা’, অবরোধ ও হুল্লোড়—এই বাস্তবতা পাহাড়ের নারীকে বারবার অপমানিত করছে। এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রকে এই দ্বৈত মানদণ্ডের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার। পাহাড়ে নারী মানেই ‘রাজনীতি নয়, মানুষ’—এই মানবিক বোধই হতে হবে নতুন সূচনার মূল কথা।



