ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের রাঙামাটি প্রতিনিধি সাংবাদিক হিমেল চাকমা তার বাবার অপহরণ ও হারানোর দুই যুগ পূর্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে গভীর বেদনায় ভরা একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি ২০০১ সালের ২১ অক্টোবর ইউপিডিএফের হাতে তার বাবাকে হারানোর ঘটনার বর্ণনা দেন এবং পাহাড়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন।
নিচে পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো—
“বাবা হারানোর ২ যুগ
২০০১ সালের ২১ অক্টোবর আজকের এ দিনে হারিয়েছিলাম বাবাকে। তখন আমি ৮ম শ্রেণীতে পড়তাম। সামনে বার্ষিক পরীক্ষা। সময়টা ছিল সন্ধ্যা ৭ টা ১৫ মিনিট। আমি পড়ার টেবিলে পড়ছিলাম। আমার পড়ার টেবিলের পাশে ছিলেন বাবা।
সেখান থেকে বাবাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে ইউপিডিএফের কর্মীরা। সেদিন নির্ঘুম রাত আমাদের। পরদিন যোগাযোগ হলে ছেড়ে দেবে এরপর বলে তারা নেয়নি। এভাবে ঘন্টা দিন রাত সাপ্তাহ মাস বছর যুগ গেল
কিন্তু বাবাকে ফেরত দেয়নি ইউপিডিএফ।
সেই ২১ অক্টোবর থেকে বাবা বিহীন পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু হয় আমার। বাবা ছাড়া একটি সন্তান কত অসহায় সেটা আমি উপলব্ধি করি। চিত্ত পিত্ত দুর্বল হয়ে বড় হয়েছি। সেজন্য বাবা হারা কোন সন্তান দেখলে আমি সাধ্যমত হাত বাড়িয়ে দিই।
পড়াশোনাটা ছিল আমার মুল লক্ষ্য। ভাল স্টুডেন্ট ছিলাম। ফলে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ পাই মাইসছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে। বাবার বন্ধুরা আমার পড়াশোনার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
বাবাকে হারিয়ে আমার হওয়ার কথা ছিল ইউপিডিএফ বিদ্বেষী। ধরার কথা ছিল অস্ত্র।
আমি শিখেছি তুমি অধম বলে আমি উত্তম হব না কেন? অপহরণকারীরা যদি বাবাকে নিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে তাহলে ওয়েলকাম। এখন হিসাব মিলিয়ে দেখি। ওরা কি অধিকার পেয়েছে?
আমার সাংবাদিকতায় কখনো আমি পক্ষপাত করি না। যে দল আমার বাবার অপহরণকারী অথচ আমাকে তকমা পেতে হয় হিমেল ইউপিডিএফ।
আমি সবকিছু উপলব্ধি করি। সব বুঝি। এ বুঝার মাঝে নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়। অহংবোধ নেই। মৃত্যুর ভয় নেই। কারণ হারানোর তো আর কিছুই নেই। বোবার স্বপ্ন দেখার মত করে দিন পার করি।
আমার বাবার মত আরো কতজন হারিয়ে গেছে পাহাড় থেকে সে তালিকা কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে নেই। বাবা হারানোর কষ্ট আমি বুঝি। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। কারণ পাহাড়ের সমস্যা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। এর সুন্দর সমাধান আছে। কিন্তু সেই সমাধানের দিকে আমাদের রাষ্ট্র হাঁটে না। রাষ্ট্র পাহাড়ে অস্ত্রের মজুদ বাড়াতে চায়। কিন্তু এ অস্ত্র আমার বাবাদের নিরাপত্তা দিতে পারে না।”
হিমেল চাকমার পোস্টে অনেক নেট ব্যবহারকারী মন্তব্য করে বলেন, “দুঃখজনক হচ্ছে সাংবাদিক হিমেল চাকমা, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন রাঙামাটি প্রতিনিধি তিনি তার অপহরণকারী ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের বিচার চান না, কিন্তু বাঙালি বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করেন অথচ ওনার প্রয়োজন ছিল ইউপিডিএফ এর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, খুন-গুম, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি এবং অস্ত্রবাজিসহ পাহাড়ের সন্ত্রাসবাদের সঠিক চিত্র।”
সাংবাদিক হিমেল চাকমার এই পোস্টটি পার্বত্য অঞ্চলে ইউপিডিএফ কর্তৃক সংঘটিত অপহরণ ও সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাসের এক মর্মস্পর্শী স্মারক হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। তিনি নিজের ব্যক্তিগত বেদনা ও রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের সীমাবদ্ধতা নিয়ে যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও মানবিক সংকটের বাস্তব চিত্রকে নতুন করে সামনে এনেছে।



