পার্বত্য চট্টগ্রামের নীরব পাহাড়ি জনপদে সময়ের পর সময় ধরে একই ছবি দেখা যায়—যখন কোনো ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে, অভিযুক্ত যদি বাঙালি হয়, তখন উপজাতি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো যেমন ইউপিডিএফ, জেএসএস সহ হিল উইমেন্স ফেডারেশন, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ সরব হয়ে প্রতিবাদী ভূমিকা গ্রহণ করে। তারা তৎক্ষণাৎ সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দেয়, সভা-সমাবেশের ডাক দেয় এবং সামাজিক-রাজনৈতিক কৌশলে এই ঘটনাকে পুঁজি করে।
কিন্তু, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিজস্ব উপজাতি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ধর্ষণ বা যৌন অপরাধ সংঘটিত হলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। রাঙামাটি কাপ্তাই চিৎমরমের চংড়াছড়ি ও খাগড়াছড়ি মাটিরাঙা বেলছড়ি ইউনিয়নের অযোদ্ধা এলাকায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে এই সংগঠনগুলো একটুও সাড়া দেয়নি। কোনো বিবৃতি, সভা, মানববন্ধন বা প্রতিবাদী উদ্যোগ তাদের দেখা যায়নি। এই দ্বৈত মানদণ্ডের কারণে পরিষ্কার হয়, এই সংগঠনগুলোর প্রতিবাদী চেতনা কেবল বাঙালি অপরাধীদের ওপরই সীমাবদ্ধ এবং তারা এটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
পূর্বেকার গত ২৩ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি সিঙ্গিনালা এলাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনা উদাহরণ স্বরূপ। অষ্টম শ্রেণির মারমা ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে জুম্ম ছাত্র জনতা ব্যানারে ইউপিডিএফ অবরোধের নামে নাশকতা চালায়। তারা ১৪৪ ধারা লঙ্ঘন করে সেনা ও বাঙালিদের উপর হামলা চালায়, বাঙালিদের ঘর-বাড়ি, দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাট করে। সড়ক অবরোধ করে। এই সংঘর্ষে ১১ সেনা সদস্য আহত এবং ৩ উপজাতি নিহত হন। ঘটনাটি তথ্য সন্ত্রাসের মাধ্যমে প্রচারিত হয়, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে সারাদেশ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে।
এই দ্বন্দ্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেখা যায়, চাকমা সার্কেল চীফ দেবাশীষ রায়ের দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়েন ইয়েন রাখাইন বাঙালি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করতেন। তবে সম্প্রতি পার্বত্য উপজাতিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি নিয়ে তিনি নীরব।
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা উপজেলার বেলছড়ি ইউনিয়নের অযোদ্ধা এলাকায় সম্প্রতি সংঘটিত এক কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা এই দ্বৈত মানদণ্ডের স্পষ্ট উদাহরণ। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের এক কিশোরীকে স্থানীয় উপজাতি যুবকরা জোরপূর্বক সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে। ঘটনার পর স্থানীয়রা অভিযুক্ত রনি বিকাশ ত্রিপুরা (৩২) ও ডেটল বাবু (১৭) আটক করে পুলিশে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে কিশোরীর বড় বোন বাদী হয়ে ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। অপর দুই অভিযুক্ত—সুমন বিকাশ ত্রিপুরা (১৮) ও রিমন ত্রিপুরা (২২)—পলাতক রয়েছেন।
মাটিরাঙা থানা পুলিশ জানায়, ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে প্রথাগত নিয়মে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও ব্যর্থ হয়। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং দু’জনকে আটক করতে সক্ষম হয়।
এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশে যৌন অপরাধকে ঘিরে এক ধরণের সামাজিক ও রাজনৈতিক পক্ষপাত লক্ষ্য করা যায়। যখন অপরাধীর জাতি বাঙালি হয়, তখন প্রতিবাদী চেতনা প্রকাশ পায়; অপরদিকে, যখন অপরাধী একই উপজাতি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত, তখন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতি স্থানীয় জনগণের মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক সামাজিক মানসিকতাকে অস্থির করে তোলে।
প্রশ্ন উঠতে বাধ্য করে—কেন এমন দ্বৈত মানদণ্ড? একদিকে, দলগুলি বাঙালি অপরাধীদের বিরুদ্ধে ন্যায্য ও প্রতিবাদী চেতনা প্রদর্শন করে। অন্যদিকে, একই ধরনের অপরাধ উপজাতি সম্প্রদায়ের দ্বারা সংঘটিত হলে তারা নীরব থাকে। এটি প্রমাণ করে যে, এই ধরনের প্রতিবাদ ও মানবাধিকার আন্দোলন কখনও সত্যিকারের ন্যায়বিচার নয়; বরং তা রাজনৈতিক ও জাতিগত স্বার্থের উপর নির্ভরশীল।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও চিন্তার উদ্রেক করে। ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি কোনো জাতি, সম্প্রদায় বা দলকে বাঁচাতে পারে না। অপরাধী যে-ই হোক না কেন, সমাজে ন্যায় ও সুরক্ষার অনুভূতি নিশ্চিত করা জরুরি। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা এ ক্ষেত্রে এক দুঃখজনক ছবি উপস্থাপন করে—যেখানে রাজনৈতিক স্বার্থ ও সম্প্রদায়িক স্বার্থ মানবিক ন্যায়বিচারের চেয়ে প্রাধান্য পায়।
এছাড়া, সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নারীদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অভাব স্থানীয় জনগণ ও সুশীল সমাজের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য এই ধরনের ঘটনার সঠিক তদন্ত ও সমাধান ছাড়া সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দুষ্কর।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা দেখছি, পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি একটি সামাজিক সংকট। যখন রাজনৈতিক ও সম্প্রদায়িক স্বার্থ মানবিক ন্যায়বিচারের ওপরে প্রাধান্য পায়, তখন শিকারী ও নির্যাতিতার মধ্যে পার্থক্য আরও গভীর হয়। এই নারীরা প্রায়শই নীরবতার পাহাড়ে তাদের কষ্টকে একা বহন করতে বাধ্য হন।
সর্বশেষে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে যৌন অপরাধের ঘটনায় দ্বৈত মানদণ্ড সমাজ ও ন্যায়বিচারের জন্য একটি গভীর প্রহরী। অপরাধীর জাতি পরিবর্তিত হলে প্রতিবাদের তীব্রতা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া পরিবর্তিত হয়—এটি পুরো অঞ্চল ও দেশের নৈতিক মানদণ্ডের জন্য উদ্বেগের বিষয়। মানবিক, ন্যায়সঙ্গত এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, নিরাপত্তা এবং সামাজিক সংহতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।



