অবৈধ কাঠের চাঁদায় কেনা অস্ত্র ইউপিডিএফ বাঙালি ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার।

0

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিস্তব্ধ পাহাড়ের অন্তরে এক ভয়ংকর অর্থযুদ্ধ চলছে — গাছ কেটে যে কাঠ নামছে, তার প্রতিটি ঘনফুট যেন বন্দুকের গুলিতে রূপ নিচ্ছে। এই কাঠ পাচার থেকেই সংগৃহীত বিপুল চাঁদা এখন ইউপিডিএফের অস্ত্রভাণ্ডার, যা রাষ্ট্র, বাঙালি ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভীতিকর সত্য হলো—এই কাজে সহযোগী হয়ে উঠেছে স্থানীয় বাঙালিরাও, যারা রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবে ইউপিডিএফের হয়ে চাঁদা আদায় করে।

স্থানীয় অধিবাসীদের ভাষ্যে, ইউপিডিএফ-এর চাঁদাবাজির মূল উৎস এখন পাহাড়ের বনভূমি। তাদের দাবি—সংগঠনটির অন্তত ৭০ শতাংশ অর্থ আসে অবৈধ কাঠ পাচার থেকে। এই কাঠচক্রের প্রতিটি ধাপে ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণ ও ভাগ রয়েছে। পাহাড়ি গ্রাম থেকে কাঠ কাটা শুরু হয়ে যখন ট্রাক ও জীপ ভরে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি কিংবা চট্টগ্রামের ডিপো পর্যন্ত পৌঁছে, ততক্ষণে প্রতিটি গাড়ি থেকে ‘চাঁদার টোকেন’ হিসেবে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলা জুড়ে ইউপিডিএফের এই কাঠ-চাঁদা নেটওয়ার্ক থেকে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়।

এই বিপুল অর্থ শুধু সংগঠনের টিকে থাকার উৎস নয়—এটিই পরিণত হচ্ছে তাদের অস্ত্র কেনা, প্রশিক্ষণ, ও সশস্ত্র সন্ত্রাস বজায় রাখার প্রধান পুঁজি। “কাঠের চাঁদা দিয়েই ইউপিডিএফ অস্ত্র ক্রয় করে, যা পরবর্তীতে রাষ্ট্র তথা বাঙালি ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়,”—বলেছেন স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি।

অর্থের উৎস ও কাঠ থেকে বন্দুক:

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রধান ভরকেন্দ্র অর্থ। আর এই অর্থ আসে অবৈধ কাঠের বাণিজ্য থেকে। কাঠ বিক্রির প্রতিটি স্তরেই ‘টোকেন’ নামের এক অদৃশ্য কর আদায় করা হয়। কেউ বাগান বিক্রি করলেই দিতে হয় চাঁদা, আবার যিনি কাঠ কিনছেন তাকেও দিতে হয় নির্ধারিত হারে অর্থ এবং পরিবহন গাড়ি চালককে করতে হয় টোকেন। এই চাঁদা থেকেই তৈরি হয় ইউপিডিএফের গোলাবারুদের জোগান, রাজনৈতিক তৎপরতা, কূটনীতিক তৎপরতা ও মিডিয়া অপপ্রচার।

চাঁদার টাকার হিসাব:

এই চাঁদা আদায়ের পদ্ধতি এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যে, এটি এখন এক পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক জাল। নিচে সেই ভয়ানক আর্থিক চিত্র তুলে ধরা হলো—

১. ক্রেতাকে প্রতি ঘনফুট কাঠে দিতে হয় ১৫০ টাকা চাঁদা।
(যে পরিমাণ কাঠ ক্রয় করা হোক না কেন, ঘনফুট ভিত্তিক এই চাঁদা সরাসরি ইউপিডিএফের তহবিলে যায়।)

২. পারমিটধারী প্রতিটি গাড়িকে দিতে হয় ১০,০০০–১৫,০০০ টাকা ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রণ এলাকা। জেএসএস, ইউপিডিএফ, সংস্কার এম.এন ও গণতান্ত্রিক বর্মা নিয়ন্ত্রণ এলাকায় প্রতিটি গাড়ি হইতে ২৫,০০০ থেকে ৩৫,০০০ টাকা পর্যন্ত।
(অভিযোগ আছে, অনেক ক্ষেত্রে বন বিভাগ নিজেই এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করে; কেউ না দিলে পারমিট বন্ধ করে দেওয়া হয়।) বাঙালি এলাকায় ইউপিডিএফ নিয়োজিত ব্যক্তি বা তার মনোনীত ব্যক্তিকে ৪০০০ থেকে ৫০০০ টাকা দিতে হয়। যেগুলো স্থানীয় বিভিন্ন মহল ভাগবাটোয়ারা করে নেয় এবং একটি অংশ ইউপিডিএফ এর জন্য পাঠানো হয়।

৩. অবৈধ কাঠবাহী অর্থাৎ পারমিট ছাড়া প্রতিটি গাড়ির চাঁদা ৫০০০–৭,০০০ টাকা।
(এই অর্থ স্থানীয় বাঙালিরা আদায় করে এবং পরে ইউপিডিএফে পাঠায়।)

৪. নিষিদ্ধ পাহাড়ি গাছগাছালি কেটে ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে নেওয়া গাড়ির জন্য ইউপিডিএফ নেয় ৫,০০০ টাকা এবং বাঙালি এলাকা বা উপজেলা সদর দিয়ে জ্বালানি কাঠ নেওয়ার সময় দিতে হয় ১,৫০০–২,৫০০ টাকা প্রতি গাড়ি।

৫. বাগান বিক্রেতাদেরও দিতে হয় ইউপিডিএফকে নির্ধারিত পরিমাণ চাঁদা।

৬. অনেক ব্যবসায়ীকে মাসিক, বাৎসরিক বা এককালীন টোকেন নিতে হয়, যার নির্দিষ্ট হার নির্ভর করে ইউপিডিএফ নেতাদের ইচ্ছার উপর। এসব ব্যবসায়ীরা ইউপিডিএফ কে বিভিন্নভাবে রসদও সরবরাহ করে।

৭। অবৈধভাবে লাইসেন্স বিহীন করাতকলকে বাৎসরিক লাখ টাকা পরিমাণ চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদা দিয়ে চলে করাতকল।

এই সব উৎস থেকে বছরে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা, যা কল্পনাতীত। এই বিপুল তহবিলই ইউপিডিএফের সন্ত্রাসী কার্যক্রম, অস্ত্র কেনাবেচা ও তথাকথিত রাজনৈতিক প্রচারণার মেরুদণ্ড।

অবৈধ কাঠ চোরাকারবারি সিন্ডিকেট সেনাবাহিনীর এসআরপি/এলআরপি উপর চোখ রাখে। তারা এই খবরাখবর ইউপিডিএফসহ আঞ্চলিক দলগুলোকে সরবরাহ করে। যার কারণে সেনাবাহিনীর অভিযান এবং বিভিন্ন কার্যক্রম বাধাপ্রাপ্ত হয়।

পরিবেশ ও অর্থনীতি এ পাহাড়ের মৃত্যু:

অবৈধ কাঠ পাচারের ফলে পাহাড়ি বনাঞ্চল আজ প্রায় শূন্য। নদী ও ঝর্ণার উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে। বান্দরবানের লামা ও রুমা অঞ্চলে অনেক জায়গায় পানির উৎস নেই; আকাশ থেকে চিত্র নিলে দেখা যায় পাহাড় ন্যাড়া, পোড়াভূমির মতো পাহাড়।
এই ধ্বংস কেবল পরিবেশগত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তারও। কারণ, যত বেশি কাঠ কাটা হবে, তত বেশি অর্থ যাবে ইউপিডিএফের হাতে, আর তত বেশি অস্ত্র ফিরে আসবে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।

অবৈধ কাঠ পাচারপথের বিস্তার:

কাঠ পাচার এখন পাহাড়ের প্রতিটি সড়কে ছড়িয়ে পড়েছে। রাঙামাটি মানিকছড়ি, কাপ্তাই, কাউখালী, লক্ষীছড়ি, মানিকছড়ি, রামগড়, মাটিরাঙা, পানছড়ি ও দীঘিনালা — এই রুটগুলো দিয়ে প্রতিদিন কাঠবাহী জীপ ও ট্রাক চলছে। এছাড়াও দিনে-রাতে অবৈধ কাঠ করাতকলে রাখা হয়, আর মধ্যরাতে চলে যায় গন্তব্যে। চিরাই কাঠ যায় এবং অনেক সময় ফার্নিচার তৈরি করে নিচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা ও বন কর্মকর্তাদের একটি অংশ এই চক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ উঠেছে যে, উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের কয়েক শতাধিক ইটভাটার জ্বালানি সরবরাহ হয় পার্বত্যাঞ্চলের নিষিদ্ধ বনাঞ্চল থেকে কাটা কাঠ দিয়ে। শীত মৌসুমে এই কাঠবাহী ট্রাকগুলো দিনে-রাতে প্রকাশ্যে চলাচল করলেও প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকে। অথচ বন আইনে সকল প্রকার কাঠ পরিবহন ও বিক্রি নিষিদ্ধ, এবং ইটভাটা আইনও জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই অবৈধ কাঠ পরিবহন থেকে ইউপিডিএফ এবং তাদের মদদপুষ্ট বাঙালি সহযোগীরা বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায় করে থাকে। কাঠের প্রতিটি চালান, ট্রাক কিংবা টোকেনের বিনিময়ে সংগৃহীত এই অর্থই পরে সংগঠনের অস্ত্র ক্রয় ও সশস্ত্র নেটওয়ার্ক বিস্তারে ব্যবহার হয়। ফলে পাহাড়ের বনভূমি যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি রাষ্ট্রের ভেতরে জন্ম নিচ্ছে এক ভয়ংকর আর্থিক সন্ত্রাসব্যবস্থা—যার মূলে ইউপিডিএফের চাঁদা সাম্রাজ্য।

এদিকে বান্দরবান অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি কাঠ পাচার হয় লামা এবং কাপ্তাই-রাজস্থলী বাঙ্গালহালিয়া সড়কে। এই সড়কে জেএসএস, অন্যান্য সংগঠন ও রাজনৈতিক মহল চাঁদাবাজি করে।

রাজনৈতিক ও মানবিক ঢাল: “আমরা গরিব বাঙালি, অবৈধ কাঠ পাচার না করলে খাব কী?”

এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হচ্ছে—কাঠ পাচারকে ন্যায্যতা দিতে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা বাঙালিদের দারিদ্র্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তারা বলে, “আমরা গরিব, কাঠ ব্যবসা না করলে খাব কী?”—কিন্তু বাস্তবে এই বক্তব্য কেবল প্রশাসনকে ধোঁকা দেওয়ার অস্ত্র। কারণ এই ব্যবসার মূল লাভ যায় ইউপিডিএফের হাতে, আর সামান্য ভাগ পায় মধ্যস্বত্বভোগী বাঙালিরা। এই কাঠ ব্যবসা করে গুটিকয়েক বাঙালি, যারা পাহাড় ও চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা। বেশিভাগ পাহাড়ের বাঙালি এই অবৈধ ব্যবসা করেনা। এইভাবেই একদল মানুষ নিজেদের স্বার্থে সন্ত্রাসের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখছে।

প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অদৃশ্য ম্যানেজমেন্ট:

স্থানীয় বাঙালিরা বলছেন, প্রশাসন চাইলে এই চক্র ধ্বংস করা অসম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—কেন তারা ব্যর্থ?
উত্তর লুকিয়ে আছে ম্যানেজমেন্টের আড়ালে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু বন কর্মকর্তা কিংবা স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যক্তি ইউপিডিএফপন্থী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে “ম্যানেজমেন্ট ফি” নিয়ে চোখ বন্ধ রাখেন। ফলে সরকারি নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ভয়ানক ব্যবধান, যা ইউপিডিএফের অর্থনৈতিক দানবকে আরও শক্তিশালী করছে। এখানে যেভাবে তথাকথিত পারমিটের নামে বিভিন্ন বাগানের গাছ অবৈধভাবে ঢুকানো হয় একইভাবে অবৈধভাবে কাঠ নিয়ে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়।

অর্থ থেকে অস্ত্র, অস্ত্র থেকে ভয়:

চাঁদা ও কাঠের এই প্রবাহের শেষ গন্তব্য একটাই — অস্ত্র। পাহাড়ের সীমান্ত রুট বা আকাশ পথ দিয়ে এই অর্থ বিদেশে পাঠিয়ে ইউপিডিএফ ক্রয় করছে আধুনিক রাইফেল, বুলেট ও কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি। সূত্রে জানা গেছে, কাঠের টাকা দিয়ে ইউপিডিএফ ক্রয় করছেন, ৮১, এম-৪, একে-৪৭, একে-৫৬, এম-১৬ সহ রয়েছে রকেট লাঞ্চার। এই অস্ত্রই ব্যবহার হচ্ছে বাঙালি, সেনা টহলে হামলা ও রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণায়। অর্থাৎ, একফোঁটা কাঠের রসও আজ পরিণত হচ্ছে রক্তে।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, প্রতিকার: এখনই না হলে কখনো নয়।

যদি অবৈধ কাঠ পাচার ও চাঁদা বন্ধ করা না যায়, তাহলে ইউপিডিএফের লাগাম টানা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এখন প্রয়োজন:
১️. অবৈধ কাঠ ব্যবসায় জড়িতদের উপর নজরদারি।
২️. বনবিভাগের শুদ্ধি অভিযান: দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের অপসারণ ও কঠোর শাস্তি।
৩️. ইউপিডিএফ এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে, তাদের অবৈধ কাঠ বা পারমিট ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া।
৪️. সেনা ও প্রশাসনিক সমন্বয়: রাত্রিকালীন টহল, কাঠ পরিবহনের রুটে নজরদারি ও করাতকলে অভিযান এবং ফার্নিচারের নামে কাঠ পরিবহন বন্ধ করা।
৫. কাঠ পাচারের প্রধান সড়ক খাগড়াছড়ি লক্ষীছড়ি সড়ক এবং রাঙামাটি কাউখালী সড়কে নজরদারি করলে ইউপিডিএফ এর চাঁদার উৎস অর্থনৈতিক শক্তি ভেঙে যাবে।

পরিবেশবাদী ও সচেতন মহল মনে করেন, বন কেবল গাছ নয়, এটি রাষ্ট্রের শ্বাস:

পার্বত্য চট্টগ্রামের বন নিঃশেষ হওয়া মানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিঃশেষ হওয়া। অবৈধ কাঠ পাচার বন্ধ না হলে, ইউপিডিএফ অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, আর রাষ্ট্র দুর্বল হবে। আজ পাহাড়ে কাটা প্রতিটি গাছ মানে আগামী প্রজন্মের জন্য এক ফোঁটা পানি কমে যাওয়া, এক বন্দুক বেশি তৈরি হওয়া।
যদি এখনই এই অর্থচক্র ভাঙা না যায়—তাহলে একদিন পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু বনশূন্য নয়, রাষ্ট্রশূন্য হয়ে পড়বে।

আগের পোস্টবর্মাছড়ির দুর্গম পাহাড়ি জনপদের গল্প: কেন সেনা ক্যাম্প প্রয়োজন?
পরের পোস্টগুইমারার ভিডিপি সদস্যদের শিম চাষে সফলতা: স্বনির্ভরতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন