মাধ্যমিক শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের শিক্ষক নিয়োগে ১০ জনের মধ্যে ৭ জনই উপজাতি!

0

অন্তত অসীম 

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের “মাধ্যমিক শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের” শিক্ষক নিয়োগে ফের বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদারের স্বাক্ষরে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, মোট ১০ জন নির্বাচিত প্রার্থীর মধ্যে ৭ জন উপজাতি এবং মাত্র ৩ জন বাঙালি। অর্থাৎ নিয়োগের ৭০ শতাংশই উপজাতি সম্প্রদায় থেকে করা হয়েছে। এটি স্থানীয়ভাবে “একটি পরিকল্পিত বৈষম্য ও মেধা অবমূল্যায়নের উদাহরণ” হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ২৪ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে “গণিত বিষয়” এর চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, ৬ জন চাকমা সম্প্রদায়ভুক্ত, ১ জন তঞ্চঙ্গ্যা, এবং ৩ জন বাঙালি প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। বাদ পড়েছেন মারমা, ত্রিপুরা, পাংখোয়া, লুসাই সম্প্রদায়ের প্রার্থীরা।

স্থানীয়রা বলছেন, “নিয়োগে উপজাতি আধিপত্যের একচ্ছত্র প্রভাব আজও বিদ্যমান। মেধার ভিত্তিতে নয়, জাতিগত পছন্দের ভিত্তিতে নির্বাচন হচ্ছে।”

জেলা পরিষদের নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য ও অনিয়ম অভিযোগ রয়েছে৷ তার কারণে চলতি বছরের প্রায় নিয়োগে বিতর্ক এড়াতে চূড়ান্ত ফলাফলে প্রার্থীদের নাম প্রকাশ না করে কেবল রোল নম্বর প্রকাশ করা হত। এর আগেও শিক্ষাবৃত্তির জন্য মনোনীতদের তালিকা প্রকাশের সময় একই কৌশল নেয়া হয়েছিল।

তবে সচেতন মহল বলছে, নাম গোপন রাখার এই পদ্ধতি মূলত বৈষম্যমূলক নিয়োগ ঢাকতে নেওয়া কৌশল। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

গত ২৪ অক্টোবরের মাধ্যমিক শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের শিক্ষক চূড়ান্ত নির্বাচিত তালিকায় নাম প্রকাশ করার পর ফের জেলা পরিষদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ উঠে।

কোটা বিলুপ্তির পরও পাহাড়ে অঘোষিত কোটা চালু: উচ্চ আদালতের রায় ও সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বর্তমানে দেশে উপজাতিদের জন্য মাত্র ১ শতাংশ কোটা বহাল রয়েছে। কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলে নিয়োগে এখন পর্যন্ত ৫ থেকে ৯০ শতাংশ উপজাতি কোটা কার্যকর রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় ৩১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে নিয়োগে উপজাতি কোটা চালু থাকবে কিনা জানতে পত্র দেয়। জবাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে জানায়—
“উচ্চ আদালতের রায় এবং নতুন কোটা নীতিমালা অনুযায়ী বিশেষ জাতি বা গোষ্ঠীর প্রতি অগ্রাধিকার প্রদানের সুযোগ নেই।”

তবুও রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ নিজস্ব “স্থানীয় ধারা” দেখিয়ে নিয়োগে উপজাতিদের অগ্রাধিকার বজায় রেখেছে।

আইনি অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক দ্বৈততা: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জবাবে উল্লেখ করা হয়—“পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯”-এ স্থানীয় উপজাতিদের অগ্রাধিকার প্রদানের একটি ধারা আছে। ফলে মন্ত্রণালয় বিষয়টি আইন, বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার জন্য পাঠানোর পরামর্শ দেয়। অর্থাৎ—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো ঝুলে আছে।

এ অবস্থায় পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো উপজাতি কোটা কার্যকর রেখেছে, যা অনেকের মতে “রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বৈধ রূপায়ণ।”

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ: রাঙ্গামাটির বাঙালি প্রার্থীরা বলছেন— “আমরা সমান যোগ্য হয়েও বাঙালি হওয়ার অপরাধে বারবার বঞ্চিত হচ্ছি। সরকার যেখানে কোটা বিলুপ্ত করেছে, সেখানে জেলা পরিষদ কিভাবে একতরফাভাবে উপজাতি নিয়োগ বজায় রাখে?”

তারা আরও অভিযোগ করেন, “এভাবে চলতে থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মসংস্থান বাঙালিদের নাগালের বাইরে চলে যাবে, যা বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।”

অন্যদিকে সচেতন মহল মনে করছে, নাম প্রকাশ না করে রোল প্রকাশের কৌশল নিয়োগে অনিয়ম ও পক্ষপাত ঢাকার একটি প্রশাসনিক উপায়, যা আইনের ব্যত্যয়।

আইনি ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণ: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ কোটা নীতিমালা (২৩ জুলাই ২০২৪) অনুযায়ী— উপজাতিদের জন্য ১ শতাংশ কোটা বহাল থাকবে, কিন্তু নির্ধারিত কোটা প্রার্থী না থাকলে পদ সাধারণ মেধা তালিকা থেকে পূরণ করতে হবে, কোনো জেলা বা গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার প্রদানের সুযোগ থাকবে না।

এই প্রেক্ষাপটে রাঙামাটি জেলা পরিষদের নিয়োগ কাঠামো সংবিধানের ২৭ ও ২৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী, যেখানে “রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে সমান সুযোগের নিশ্চয়তা” প্রদান করা হয়েছে।

সচেতন মহলের মত: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও গবেষকরা বলছেন— “কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর আদালতের রায় কার্যকর থাকলেও পার্বত্য মন্ত্রণালয় ও জেলা পরিষদসমূহ তা মানছে না। এটি একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য।

আরও বলা হচ্ছে, কোটা নামক ফাঁদে এখন মেধা ও যোগ্যতা পরাভূত হচ্ছে। ফলে পাহাড়ের শিক্ষা ও প্রশাসনে উপজাতি আধিপত্য স্থায়ী রূপ নিচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের এই নিয়োগ শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং প্রশাসনিক বৈষম্যের প্রতীক। সরকার যেখানে জাতীয় পর্যায়ে কোটা বিলুপ্ত করে সমঅধিকারের নিশ্চয়তা দিতে চায়, সেখানে স্থানীয় পর্যায়ে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।

৭০ শতাংশ উপজাতি নিয়োগের এই পরিসংখ্যান আবারও প্রমাণ করছে—পার্বত্য চট্টগ্রামে “সমঅধিকারের সংবিধানিক অঙ্গীকার” আজও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।

আগের পোস্টস্বজাতি কর্তৃক গণধর্ষণ ও স্থানীয় কারবারীদের প্রথাগত বিচারের নামে ধামাচাপার প্রতিবাদে মানবন্ধন।
পরের পোস্টখাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ এর নাশকতামূলক কর্মকান্ডের পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ড

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন