জেএসএস সন্তু গ্রুপ কর্তৃক এমএন লারমা স্মরণে চাঁদা উত্তোলন।

0

 পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর সহযোগী অঙ্গসংগঠন কথিত “আদিবাসী শ্রমজীবী কল্যাণ সমিতি, চট্টগ্রাম মহানগর” এর পক্ষ থেকে সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীতে চাঁদা তোলার চিঠি বিতরণ শুরু হয়েছে। “১০ নভেম্বর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী” এবং “২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৮তম বর্ষপূর্তি” উপলক্ষে এই চাঁদা আহ্বান করা হচ্ছে।

গত ২৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত এক চিঠিতে আহ্বায়ক জ্ঞান বকুল চাকমা মোবা: ০১৬৪৭৫২১৩৬৬,  স্বাক্ষরিত নোটিশে উল্লেখ করা হয় যে, “জুম্মজনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নিতে” এবং “দুই দিবসের কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন” করতে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে এককালীন আর্থিক অনুদান প্রদান করতে হবে। চিঠি দেওয়া হয়, বাবু অনিক বাপ, বিশিষ্ট সমাজ সেবক, মাইলের মাথা, ইপিজেট, চট্টগ্রামকে।

চিঠিতে “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, কেন্দ্রীয় কমিটি”র নাম ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে এটি চট্টগ্রাম শহরে বসবাসরত শ্রমজীবী উপজাতি জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের একটি নতুন পন্থা বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায়:

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যেই, ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)” বা সংক্ষেপে “জেএসএস” প্রতিষ্ঠা করেন। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অখণ্ডতা উপেক্ষা করে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের জন্য বিশেষ স্বীকৃতি ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে চার দফা প্রস্তাব দেন। সরকার তা প্রত্যাখ্যান করলে তিনি “শান্তিবাহিনী” গঠন করে সশস্ত্র আন্দোলনের পথে যান, যা দেশের ভেতরে সন্ত্রাস, অপহরণ, হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের সূচনা ঘটায়।

১৯৮৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই শান্তিবাহিনীর অভ্যন্তরে বিভক্তি শুরু হয়। “লারমা বাহিনী” ও “প্রীতি বাহিনী” নামে দুটি উপদল একে অপরের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। একই বছরের ১০ অক্টোবর এরশাদ সরকার শান্তিবাহিনীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে বিভক্তি আরও তীব্র হয়। অবশেষে ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর প্রীতি বাহিনীর হাতে নিহত হন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। এই ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা আটজন সহযোগীও প্রাণ হারান।

প্রীতি বাহিনীর নেতা প্রীতি লাল চাকমা পরবর্তীতে ভারতের আগরতলায় পালিয়ে যান এবং তার বাহিনীর অনেক সদস্য আত্মসমর্পণ করে। লারমার মৃত্যুর পর জেএসএস-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন তারই ভাই জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। সূত্র: গোলাম মুর্তজা, রাহমান বিপ্লব।”

সন্তু মারমার নেতৃত্বে জেএসএস ১৯৯৭ সালের ২-রা ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করে।

হত্যার ৪২ বছরেও নীরবতা:

লারমার মৃত্যুর ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও তার হত্যার বিচার আজও হয়নি। বিস্ময়ের বিষয়, জেএসএস (সন্তু গ্রুপ) কিংবা পার্বত্য চুক্তির বিরোধী ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) উভয় দলই কখনো এই হত্যার বিচার দাবি করেনি। অথচ দুই দলই লারমাকে “জুম্ম জাতির পিতা” হিসেবে আখ্যা দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতা ইঙ্গিত দেয় যে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও বড় রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিল, যার সাথে আজকের নেতৃত্বও সম্পৃক্ত হতে পারে। দীর্ঘ সময় লারমার মৃত্যুবার্ষিকী পালন না করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আবার শুরু হয়েছে, তবে তা মূলত আর্থিক সুবিধা অর্জনের একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রামে নতুন চাঁদাবাজির রূপ:

বর্তমানে জেএসএস তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পাহাড় থেকে সরিয়ে চট্টগ্রাম শহরে বিস্তার করছে। জ্ঞান বকুল চাকমার নেতৃত্বে গঠিত কথিত “আদিবাসী শ্রমজীবী কল্যাণ সমিতি” নামের এই সংগঠন শ্রমজীবী পাহাড়ি জনগণের কাছে চাঁদার চিঠি পাঠাচ্ছে, যেখানে অনুদানকে “আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম” নামে আড়াল করা হয়েছে।

স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি কোনো সাংস্কৃতিক বা স্মরণমূলক উদ্যোগ নয়; বরং এটি পুরনো চাঁদাবাজি কৌশলের নতুন সংস্করণ। পার্বত্য এলাকায় সন্ত্রাস, খুন-গুম, অপহরণ ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ তারা বজায় রেখেছিল, এখন তা শহরাঞ্চলেও বিস্তৃত হচ্ছে।

প্রশ্ন ও উদ্বেগ:

১. মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার হত্যার বিচার দাবি না করে তাঁর নাম ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্য কী?
২. জেএসএস-এর বর্তমান নেতৃত্ব কেন তাঁর হত্যার বিষয়ে নীরব?
৩. শহরে বসবাসরত সাধারণ শ্রমজীবী উপজাতি জনগণ কি এই সংগঠনের আর্থিক চাপে পড়ছে না?

জাতীয় স্বার্থে প্রশ্ন উঠছে—পার্বত্য চট্টগ্রামে যে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবাদের বীজ একসময় বপন হয়েছিল, তা কি এখন চট্টগ্রাম নগরীতেও বিস্তার লাভ করছে?

পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের প্রকৃত উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব, যখন আঞ্চলিক দলগুলো অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও বিভাজনের রাজনীতি পরিত্যাগ করবে। লারমার নাম ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের এই উদ্যোগ শুধু ইতিহাসের অপমান নয়, বরং তার আদর্শের পরিপন্থী এক প্রতারণা। যদিও লারমা আদর্শবান ছিলেন না, তিনি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসবাদের প্রবক্তা।

চট্টগ্রামে সম্প্রতি বিতরণকৃত এই চিঠি সেই পুরনো ভয়াল দিনেরই নতুন ইঙ্গিত বহন করছে-যেখানে “জাতীয় অধিকার” ও “আত্মনিয়ন্ত্রণ” কথাগুলো ব্যবহার হচ্ছে চাঁদাবাজির হাতিয়ার হিসেবে।

আগের পোস্টখাগড়াছড়িতে সেনা ক্যাম্প স্থাপনে বাধা প্রদানের প্রতিবাদে ঢাবিতে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিল।
পরের পোস্টইউপিডিএফের গুলিতে নিহত তিনজন পাহাড়ি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ পিসিসিপির।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন