ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ম্রো জনগোষ্ঠীর’ জুমভূমি দখলের অভিযোগ।

0

প্রতিবেদন ম্রো জনগোষ্ঠীর কান্না:

পাহাড়ে ভূমি দখলের একটি পরীক্ষিত কৌশল হলো ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে অনেক আবাদি-অনাবাদি ভূমির উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা। বৌদ্ধ ধর্মগুরু উ. উইচারা ভিক্ষু এবং তৈন মৌজার হেডম্যান মংক্যনুগং-এর নেতৃত্বে বান্দরবান লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নস্থ ২৮৫ নং সাংগু মৌজায় মারাইতং পাহাড়ে ম্রো জনগোষ্ঠীর যুগযুগান্তরীয় জুমভূমি ধর্মের নামে বেআইনিভাবে দখলের প্রচেষ্টা এই কৌশলের সুস্পষ্ট উদাহরণ। ম্রোরা, যারা অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে সহজসরল, এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আজ বুধবার ২৯ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে সকাল ১০ ঘটিকায় লামা উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করেন।

জানা গেছে, ১৯৯২ সালে আলীকদম ভরিরমুখ বিহার অধ্যক্ষ উ. উইচারা ভান্তে’র আবেদনের প্রেক্ষিতে ম্যারাইনতং পাহাড়ে বুদ্ধ প্রতিবিম্ব, ভাবনা কেন্দ্র ও জাদী নির্মাণের জন্য মেরেঞ্জা পাহাড় বৌদ্ধ ধর্মীয় ধম্ম জাদী ও বিহারে নামে সাংগু মৌজা হতে পাঁচ একর জায়গা দান করেন। কিন্তু ম্রোদের অভিযোগ এই ভিক্ষু ধর্মীয় উপাসনাল ও রিসোর্টের নামে ৫০ একরের বেশি জায়গা দখল করে আছেন। এই নিয়ে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

ছবি: মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদানে ম্রো জনগোষ্ঠী

সাম্প্রতিক সময়ে ম্যারাইনতং পাহাড় থেকে ম্রোদের উচ্ছেদ করে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে রিসোর্ট তৈরি জন্য উ. উইচারা ভান্তে বেশ কয়েকবার ম্রোদেরকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য, হুমকি, ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদা দাবি করে আসছে। ম্রো’রা চাঁদা না দেয়ায়, উ: উইচারা ভান্তে ও তৈন মৌজার মারমা হেডম্যান মংক্যনুগংয়ের নেতৃত্বে আলীকদমের প্রভাবশালী কতিপয় ব্যক্তিরা ২৮৫নং সাংগু মৌজায় সন্ত্রাসী তান্ডব চালায়।

গত ০৪/০৪/২০২৫ সাঙ্গু মৌজা হেডম্যান চংপাত স্রো এর নির্মিত ৩টি জুমঘর ভাঙছুর চালিয়ে ২১ লক্ষ টাকার মালামাল লুটপাট করে ও রিসোর্ট কেয়াটেকার হতে নগদ ১ লক্ষ ২ হাজার টাকা জোর পূর্বক ছিনিয়ে নেয়।

এই ঘটনায় লামা থানায় অভিযোগ করা হয়। পরে বিগত ২৯ এপ্রিল/২৫ লামা উপজেলা নির্বাহী আদালতে একটি ফৌজদারী মামলা করা হয়। মামলার পর ৫ ই মে লামা ও আলীকদম উপজেলার পুলিশ ও প্রশাসন সরেজমিন মারাইতং পাহাড়ে যৌথ তদন্তে গিয়ে ভাঙচুর লুটতরাজের ঘটনার সত্যতা,আলামত পান। ওইদিন প্রশাসন ১৪৪/১৪৫ ধারা জারী করেন এবং লামা-আলীকদম উপজেলা প্রশাসন যৌথ নির্দেশনা দিয়ে দুই পক্ষকে বিরোধীয় ভূমিতে নতুন করে কোনো কিছু নির্মাণ না করার নিষেধাজ্ঞা দেন।

এর আগে বৌদ্ধ মূর্তি ভেঙে ম্রোদের বিরুদ্ধে মামলা করার অভিযোগও রয়েছে উ. উইচারা ভিক্ষুর বিরুদ্ধে। বর্তমানে মারমা হেডম্যান মংক্যনুগং কর্তৃক ম্রোদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে।

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কতিপয় ধর্মগুরুরা বিভিন্ন গোষ্ঠীর ইন্ধনে সরকারি খাসভূমি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন ধর্মীয় স্থাপনার নামে ভূমি দখল করে নেন। প্রশাসনও আন্তর্জাতিক চাপ, অপপ্রচার বা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের আশঙ্কায় বাধা দেয় না। ফলস্বরূপ, থাইল্যান্ড-চীন-জাপানের চেয়ে উন্নতমানের বৌদ্ধ স্থাপনা গড়ে উঠছে, যাদের বরাদ্দ আসে, জেলা প্রশাসন, পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় এবং দেশী-বিদেশী এনজিও থেকে। বিপরীতে, মসজিদ নির্মাণে সর্বোচ্চ ১ টন চাল, ৫ বান টিন ও ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ হয়।

এই কৌশল ম্রোদের জুমভূমিতে প্রয়োগিত। উ. উইচারা ভিক্ষু (আলীকদম ভরিমুখ আশ্রম) এবং মারমা হেডম্যান মংক্যনুগং-এর নেতৃত্বে মারাইতং পাহাড়ে বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে দখলের প্রচেষ্টা চলছে। এতে সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি অন্তর্ভুক্ত। ম্রোরা বলেছেন, “আমরা জুম করে দু’মুঠো ভাত খেয়ে সন্তানদের পড়ালেখা শিখানোর স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছি। ভূমিদস্যু উ: উইচারা ভান্তে গংয়ের নাটকীয় ঘটনায় মিথ্যা মামলার কারণে সেই স্বপ্ন ভেস্তে যাচ্ছে।”

এর আগে ২৪ মে ২০২৫: লামা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি এ মানববন্ধন পালন করেছিলেন। সাংগু মৌজার ম্রো-মারমা বাসিন্দারা জুমভূমি জবরদখল, ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার, সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা ও মিথ্যা মামলার প্রতিবাদ করেন সেসময়।

আজ ২৯ অক্টোবর লামা উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানববন্ধন ও স্মারকলিপিতে স্লোগান ছিল: “ভূমিদস্যুদের বিচার চাই”, “আমাদের জুমভূমি ফেরত চাই”। ব্যানারে উল্লেখ: যুগযুগান্তরীয় জুমভূমি ধর্মকে ঢাল করে বেআইনি দখলের পায়তারা; প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং বিভ্রান্তিকার বক্তব্যের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই দখল কেবল ভূমি নয়, ম্রোদের অর্থনৈতিক অস্তিত্বের উপর আঘাত। জুম চাষ ছাড়া তাদের উপার্জনের বিকল্প নেই। ধর্মগুরু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায় শতাধিক একর দখল করছেন, যা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় সম্ভব। ঐতিহাসিকভাবে, ম্রো ন্যাশনাল ডিফেন্স পার্টি (এমএনডিপি) অধিকার রক্ষায় সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে, পরে আত্মসমর্পণ করে। ২০২১ সালে পর্যটন নির্মাণের ফলে চিম্বুকপাহাড়-নাইতং থেকে ম্রো উচ্ছেদের অজুহাত তুলে জেএসএস ম্রোদের ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আজ মারমা বৌদ্ধ ভিক্ষু ও হেডম্যান কর্তৃক ধর্মের নামে এবং রিসোর্টের নামে যে ম্রোদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে তা নিয়ে জেএসএস নীরবতা পালন করছে! তাই ম্রোদের বর্তমান আন্দোলন বৈধ এবং যৌক্তিক বলে প্রতিয়মান হয়।

সচেতন মহল মনে করে, বৌদ্ধ ধর্মের অপব্যবহারের মাধ্যমে ম্রোদের জুমভূমি দখল একটি সুসংগঠিত কৌশল, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ধ্বংস ডেকে আনে। উ: উইচারা ভিক্ষু ও মংক্যনুগং-এর নেতৃত্বে মারাইতং পাহাড়ের দখল প্রমাণ করে ধর্মগুরুরা ধর্মকে ঢাল করে উপার্জন কেড়ে নিচ্ছেন। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং অসম বরাদ্দ ব্যবস্থা এই অন্যায়কে উৎসাহিত করে। ম্রোদের প্রতিবাদ-মানববন্ধন, স্মারকলিপি-তাদের অধিকার রক্ষার শেষ অস্ত্র। সুষ্ঠু তদন্ত, ভূমি ফেরত এবং ধর্মীয় অপব্যবহার রোধে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন, নতুবা পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও শান্তি বিপন্ন হবে।

তবে এই জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জানা যায়, ম্রো (বা মুরং) জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি অত্যন্ত প্রান্তিক উপজাতি, যাদের জনসংখ্যা প্রায় ৩৯,০০৪ জন। এরা বান্দরবান জেলার লামা, আলীকদম, থানছি, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার একটি মৌজায় ঘনীভূত। আদি নিবাস মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য হলেও, এরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এবং ভার ইন্দিয়ার পশ্চিমবঙ্গেও বসবাস করে। বান্দরবানে মারমাদের পর এরা দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজাতি।

অর্থনৈতিকভাবে ম্রোরা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তাদের প্রধান জীবিকা জুম চাষ, যা পাহাড়ি ঢালে অস্থায়ী আবাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই চাষ পদ্ধতি যুগযুগ ধরে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও সন্তানদের শিক্ষার স্বপ্নকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু দুর্গমতা, প্রতিকূল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আধুনিকতার অভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে এরা পিছিয়ে। সাংস্কৃতিকভাবে এরা প্রকৃতি পূজারি; ঐতিহ্যবাহী ধর্ম ‘তোরাই’ এবং পরবর্তীতে ‘ক্রামা’ ছিল। খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রলোভনে অনেকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছে, কিন্তু বৌদ্ধধর্ম গ্রহণকারী সংখ্যা রয়েছে।

উইকির তথ্য মতে, তাদের সামাজিক কাঠামো গোত্রভিত্তিক: ঙারুয়া, প্রেন্জু, সাংকান, জালা, কানবক, নাইজাহ, তাং, দেং, রুমওয়া, উইয়াচা, রেংতিং ইত্যাদি। বিবাহ একই গোত্রে নিষিদ্ধ; তিন পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়, যেখানে কন্যার দেহমূল্য ১০১ টাকা রৌপ্যমুদ্রা এবং মায়ের দুধের দাম ১০ টাকা প্রদান করতে হয়। তালাক প্রথা বিদ্যমান। পোশাক অত্যন্ত সাধারণ: মেয়েরা ‘ওয়ানক্লাই’ (৮-১০ ইঞ্চি চওড়া ছোট পরিধেয়), পায়ে ‘খক খ্যান’ (নুপুর), কোমরে ‘রোওয়া কম’ (বিছা); পুরুষরা ‘ডং’ (লেংটি-বিদ্রি)। নারী-পুরুষ উভয়েই লম্বা চুল রাখে, মাথায় ‘ছুরুত’ (চিরুনী) গেঁথে, ফুল গুঁজে; দাঁতে লোহা-উত্তপ্ত বাঁশের রসের প্রলেপ দেয়।

সংস্কৃতিতে নৃত্য উল্লেখযোগ্য: ১৫-২০ জন যুবক-যুবতী অর্ধচন্দ্রাকারে দাঁড়িয়ে ‘প্লুং’ বাঁশির সুরে নাচে, মুখে রঙের প্রলেপ লাগিয়ে। বিবাহিত মেয়েরা অংশ নেয় না। এই সহজসরল জীবনাচার ম্রোদের প্রান্তিকতাকে আরও স্পষ্ট করে, যা ভূমি দখলের শিকারে তাদের অসহায়ত্ব বাড়ায়।

আগের পোস্টইউপিডিএফের গুলিতে নিহত তিনজন পাহাড়ি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ পিসিসিপির।
পরের পোস্টতিন পাহাড়ি হত্যার বিচারের দাবিতে বান্দরবানে পিসিসিপির বিক্ষোভ।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন