রক্তের দামে কেনা পাহাড়ের শান্তি: বিচ্ছিন্নতা দমনে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগ

0

পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও একসময় এই ভূখণ্ডের সাথে রাষ্ট্রের সংযোগ ছিল দুর্বল। বিচ্ছিন্নতাবাদ, অরাজকতা এবং দুর্গম জীবনযাপনের কারণে এখানকার মানুষের জীবন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই জনপদে শান্তি ফিরিয়ে আনা, স্বাভাবিক শাসন প্রক্রিয়া চালু রাখা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে যে প্রতিষ্ঠানটির অনন্য ভূমিকা রয়েছে, তা হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এই বাহিনীর সদস্যরা কেবল দেশরক্ষার দায়িত্বই পালন করেননি, বরং তাঁদের আত্মত্যাগ, কষ্টসাধ্য পরিশ্রম এবং সুদূরপ্রসারী উন্নয়ন পরিকল্পনা আজ পাহাড়ের দৃশ্যপটকে আমূল পরিবর্তন করেছে।

স্বাধীনতা লাভের পরপরই পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) গঠিত হওয়ার পর তারা ‘শান্তিবাহিনী’ নামে সশস্ত্র শাখা গঠন করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৯৭৫ সাল থেকে তারা প্রশাসনিক স্থাপনা, টহলরত সেনাসদস্য এবং সাধারণ জনগণের উপর নৃশংস হামলা চালাতে শুরু করে, যার ফলে পাহাড়ে এক মারাত্মক অরাজকতা সৃষ্টি হয়। এই চরম পরিস্থিতিতে, দেশের অখণ্ডতা রক্ষা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করে।

পাহাড়ের দুর্গম ও জনবিচ্ছিন্ন অঞ্চলসমূহে দায়িত্ব পালন করা সেনাবাহিনীর জন্য ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। শত প্রতিকূলতার মাঝেও তাঁদের নিত্য যাপন, দুর্গম পথে টহল, অভিযানে অংশগ্রহণ এবং নিরস্ত্র বাঙালি ও উপজাতি জনগোষ্ঠীর জীবনরক্ষা ছিল এক অসামান্য দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে ১৯৭৯ সাল থেকে যখন সরকার বাঙালি পুনর্বাসনের কার্যক্রম শুরু করে, শান্তিবাহিনীর আগ্রাসী আক্রমণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে পাহাড়ে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে। একদিকে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখা এই চরম দায়িত্ব সেনাবাহিনী একই সাথে ভারসাম্যপূর্ণভাবে পরিচালনা করেছে। শান্তিবাহিনীর তীব্র গেরিলা আক্রমণ, খাদ্য-ওষুধের সংকট এবং দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালন ছিল এক মহাকাব্যিক সংগ্রাম।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় অবদান হলো উন্নয়ন ও আধুনিক রাষ্ট্রগঠনে তাঁদের ভূমিকা। একসময়ের অন্ধকারে ডুবে থাকা এই অঞ্চলে তাঁরা এনেছেন আলো, নিঃসঙ্গতায় ডুবে থাকা মানুষকে ফিরিয়ে দিয়েছেন রাষ্ট্রের সান্নিধ্য। পাহাড়ের সভ্যতার আলো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানমুখী কার্যক্রম এ সমস্ত কিছুই সেনাবাহিনীর সুপরিকল্পনা ও কর্মদক্ষতার ফসল।

পাহাড়ের খাড়া ঢালুতে রাস্তাঘাট নির্মাণ, দুঃসাধ্য স্থানে ব্রিজ-কালভার্ট স্থাপন এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন করে দুর্গম অঞ্চলগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করেছেন। দূরদূরান্তে স্কুল-কলেজ স্থাপন, অসুস্থদের চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেয়া, প্রসূতিদের জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা এবং খাদ্য-ওষুধের সংকট মোকাবিলা করেছে। নাইক্ষ্যংছড়ি, বাঘাইছড়ি ও পানছড়ির মতো দুর্গম অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষও আজ শিক্ষা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা এবং উন্নত জীবনধারা ভোগ করছে। ১৯৭৯ বা ১৯৯৭ সালের পূর্বে যেখানে প্রায় আদিম জীবনযাপন ছিল, আজ সেখানে আলো জ্বলেছে এবং শিশুদের হাতে বই উঠেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আজকের পর্যটন শিল্প সেনাবাহিনীর আন্তরিক প্রচেষ্টার ফল। একসময় যে অঞ্চলগুলো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দুর্গ ছিল এবং যেখানে প্রবেশ করা ছিল জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ, সেই সাজেক, নীলগিরি, আলুটিলা, বগালেক, থানচি আজ হাজার হাজার পর্যটকের গন্তব্য। সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে এসব স্থান স্থানীয়দের আয়ের উৎস এবং রাষ্ট্রের সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে সেনাবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কর্মপদ্ধতি ছিল বহুমাত্রিক। তাঁরা এক হাতে অস্ত্র, অন্য হাতে উন্নয়নের বার্তা নিয়ে পাহাড়ে এসেছেন। অস্ত্রের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয়দের মন জয় করা ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সেনাবাহিনী কখনোই দমনমূলক আচরণ করেনি, বরং তারা পাহাড়ের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

এক একজন সেনা শহীদের রক্তে আজ পাহাড়ে গড়ে উঠেছে উন্নয়নের ভিত্তি। এই সাহসী পুরুষেরা পাহাড়ে শুধু চাকরি করেননি, বরং সেখানে তাঁরা জীবন রেখে গেছেন, ভবিষ্যৎ রেখে গেছেন। এমনকি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পরও সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, এখানকার মানুষের নিরাপত্তা এবং শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখতে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাহাড়ে পুনর্বাসিত বাঙালি এবং সাধারণ উপজাতি জাতিসত্তার মানুষ বিশ্বাস করেন, সেনাবাহিনী না থাকলে এই পাহাড় অরক্ষিত হয়ে পড়বে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে কথিত ‘সেনাশাসন’ শব্দটি এক প্রকার অপপ্রচার মাত্র। সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন এবং অভূতপূর্ব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্যগুলো নতুন প্রজন্মের জানা উচিত। যারা আজ সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবি তুলেন, তারা যেন জানেন, এই ক্যাম্পই একদিন তাদের সন্তানকে পড়াশোনার সুযোগ দিয়েছে, অসুস্থ মাকে চিকিৎসা দিয়েছে, দুর্গম পাহাড়ে খাদ্য পৌঁছে দিয়েছে।সকল মিডিয়ার উচিত সেনাবাহিনীর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা, যেন অপপ্রচারের ধোঁয়াশায় কেউ আর বিভ্রান্ত না হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগ, কষ্টসাধ্য পরিশ্রম এবং উন্নয়নের এই ইতিহাস চিরকাল অম্লান থাকবে।

আগের পোস্টসার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ সেনাবাহিনী; কেন পার্বত্য চট্টগ্রামে অপরিহার্য?
পরের পোস্টরাঙামাটির বিলাইছড়ি জোনের উদ্যোগে ৭০ জন গরীব শিক্ষার্থীর মাঝে শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন