সাম্প্রতিক সময়ে খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বার্মাছড়ি এলাকা ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বার্মাছড়িতে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প বা প্যাট্রোল বেস স্থাপনের উদ্যোগ নিলে স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়ে। গোয়েন্দা সূত্র এবং স্থানীয়দের মতে, এই বাধার পেছনে রয়েছে পাহাড়ের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), যারা নিরীহ স্থানীয় লোকজনকে উসকে দিচ্ছে।
গত এক বছরে খাগড়াছড়িতে একাধিক সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো ২৮ সেপ্টেম্বরের রামসু বাজারের হামলা, যেখানে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের গুলিতে তিনজন স্থানীয় উপজাতি যুবক নিহত হয়। এই ঘটনা সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা পর্যালোচনাকে তীব্র করে তোলে এবং দুর্গম এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের পরিকল্পনা শুরু হয়।
বার্মাছড়ি এলাকাটি ভূ-কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্গম, গহিন জঙ্গলে ভরা এলাকাটি ইউপিডিএফের হেডকোয়ার্টার। এটি পার্বত্য অঞ্চল এবং সমতল এলাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এটি অস্ত্র চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। লক্ষ্মীছড়ি সদরের সঙ্গে বার্মাছড়ির কোনো পাকা সড়ক না থাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে দ্রুত পৌঁছানো কঠিন, যা ইউপিডিএফের অবস্থানকে আরও শক্ত করেছে। তারা সড়ক নির্মাণে বরাবরই বাধা দিয়ে আসছে, কারণ পাকা সড়ক নিরাপত্তা বাহিনীর সুবিধা বাড়াবে।
১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির একটি শর্ত অনুযায়ী অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলো পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করার কথা বলা আছে। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ৩৫২টি ক্যাম্পের মধ্যে ২৩৯টি প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমানে বিশাল পার্বত্য অঞ্চলে মাত্র ১১৩টি ক্যাম্প রয়েছে।
এই ক্যাম্প প্রত্যাহারের কারণে বার্মাছড়ির মতো দুর্গম এলাকাগুলো পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের জন্য একরকম অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সেনা উপস্থিতি কমে যাওয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর তৎপরতা সীমিত হয়েছে। শান্তিচুক্তি সত্ত্বেও চাঁদাবাজি, অপহরণ ও খুনোখুনি বন্ধ হয়নি। চুক্তির শর্তানুসারে প্রত্যাহারকৃত সেনা ক্যাম্পের স্থানে পুলিশি কার্যক্রম জোরদার করার পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি, যার পূর্ণ সুবিধা নিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।
ইউপিডিএফ তাদের কূটকৌশলের অংশ হিসেবে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে উপজাতি পরিবার পুনর্বাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বৌদ্ধ বিহার ও কিয়াংঘরের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে ওই স্থানগুলোতে সেনা ক্যাম্প পুনর্নির্মাণে বাধা দেওয়া। বার্মাছড়িতে অস্থায়ী প্যাট্রোল বেস স্থাপনে ধর্মীয় ইস্যুকে সামনে এনে নারী ও শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আন্দোলন সৃষ্টি করা তাদের সেই চিরাচরিত কৌশলেরই অংশ।
নিবন্ধে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ আনা হয়েছে, যা ভারতের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং সরকারের উঁচু পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা পার্বত্য অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র দলগুলোর সঙ্গে মিটিং করেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য ‘রাজনীতির তুরুপের তাস’ হিসেবে ব্যবহার করা।
ভারত ইউপিডিএফকে তাদের ‘ফার্স্ট চয়েজ’ মনে করছে এবং তাদের অস্ত্র, গোলাবারুদ, প্রশিক্ষণ ও আশ্রয় দিচ্ছে। শুধু নির্বাচন ভন্ডুল করাই নয়, বরং বাংলাদেশে তাদের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা সৃষ্টির চক্রান্ত চলছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এ ধরনের চক্রান্ত পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও ভারত করেছিল, যা ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
ইউপিডিএফের এই অবস্থানকে জাতীয় নিরাপত্তা কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে বৃহৎ আকারে নাশকতার প্রস্তুতির ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই ইউপিডিএফ সেনাবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে বাধা দিচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চক্রান্তে কেবল বিদেশি অপশক্তিই নয়, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক ও সুশীল সমাজের নাগরিক সেজে দেশি একটি চক্রও জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে এ বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছে।
এই দেশি-বিদেশি সম্মিলিত চক্রান্তের বিরুদ্ধে সরকারের এখনই যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা গুরুতর হুমকির মুখে পড়তে পারে।



