পারভেজ মাহরুফ | পার্বত্য চট্টগ্রাম
খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলজুড়ে এখন অবৈধ কাঠ বাণিজ্যের এক ভয়াবহ বিস্তার দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ফটিকছড়ি ঢুলুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের এলাকা পরিণত হয়েছে একটি বিশাল কাঠবাজারে। প্রতি সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার এই বাজার বসে, যেখানে প্রতিবাজারে প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার কাঠ বেচাকেনা হয়। এই কাঠ আসে মূলত লক্ষ্মীছড়ি ও রাঙামাটির নানিয়ারচর, কতুকছড়ি ও ঘিলাছড়ি এলাকার থেকে।
চট্টগ্রাম ফটিকছড়ি আংশিক খিরাম, খাগড়াছড়ি লক্ষ্মীছড়ি ও রাঙামাটি কাউখালী মিলিয়ে ঢলুপাড়া বাজার ঘিরে কাঠের একটি বিশাল পাচারচক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রায় ২ থেকে ৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কাঠ মজুত ও বিক্রির স্থান তৈরি হয়েছে। ইউপিডিএফ মূলদলের সহযোগিতায় এখানে কাঠ এনে স্টক করে পরে বিক্রি করেন। এই কাঠের উৎস বিভিন্ন, কখনও সরকারি বনাঞ্চল, কখনও ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় বা খাস জমি।
প্রায় দুই শতাধিক ব্যবসায়ী এই অবৈধ কাঠ বাণিজ্যে জড়িত, যাদের অধিকাংশের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজান এলাকায়। ব্যবসা চালাতে হলে সবাইকে ইউপিডিএফের কাছ থেকে বার্ষিক “চাঁদার টোকেন” নিতে হয়, যার দাম ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। সাপ্তাহের প্রতি বাজারে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার ঘনফুট কাঠ বিক্রি হয়। ইউপিডিএফ এই কাঠের প্রতিঘনফুট থেকে ১১০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত “রয়েলটি” আদায় করে, যা এক বাজারে কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
কাঠ পাচারের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী সম্প্রতি দুটি বড় অভিযান পরিচালনা করেছে।
গত ২৯ অক্টোবর: বর্মাছড়িমুখ বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৪,০০০ ঘনফুট কাঠ জব্দ করা হয়, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
এরপর গত ১ নভেম্বর: বর্মাছড়িমুখের বাকছড়ি সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে ৫০০ ঘনফুট কাঠ উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর সর্বদিক থেকে চাঁদার উৎস বন্ধে কাঠের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানের দাবি উঠে৷
গত ৫ নভেম্বর ১২০০ পিস গাছের লগ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বন বিভাগ জব্দ করে।
খিরাম-বর্মাছড়ি খাল ও ঝিরিঝর্ণা দিয়ে নামা এসব কাঠগুলো নানুপুর, গহিরা, ডাবুয়া, রাউজান বৃন্দাবন সড়কে পাচার হলেও কাঠ পাচারের আরেক বৃহৎ এলাকা হচ্ছে কাউখালী উপজেলা। কাউখালী সদর সড়কপথ ব্যবহার করে কাঠ এখন স্থানীয় করাতকলের পাশাপাশি রানিরহাট ও চট্টগ্রামে ডিপো পর্যন্ত পাচার হচ্ছে। সামনের শীত মৌসুমে অবৈধ কাঠ ও জ্বালানি কাঠ যাবে ব্যাপকভাবে। এমনটা আভাস পাওয়া গেছে।
স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, বন বিভাগ, পুলিশ এবং উপজেলা ও জেলা প্রশাসন এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফলে প্রতিদিন দিনরাত লক্ষীছড়ি ও কাউখালী হয়ে কাঠ যাচ্ছে অবিরামভাবে। এমনকি সরকারি কিছু সংস্থার সহযোগিতার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
কাউখালী ও বর্মাছড়ি এলাকার পাহাড়ি ও বাঙালি জনগণ জানাচ্ছেন, ইউপিডিএফ কাঠের রয়েলটি থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে তা অবৈধ অস্ত্র ক্রয় ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ব্যয় করছে। এতে শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাই নয়, বন সম্পদও ভয়াবহভাবে ধ্বংস হচ্ছে।
খাগড়াছড়ির স্থানীয় সাংবাদিক বকুল বিকাশ চাকমার তথ্যমতে, পারমিটের একটি কাঠবাহী ট্রাক থেকে মোট ১,৫৬,২০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এই অর্থ ভাগ হয়ে যায় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে:
সংগঠন/দল পরিমাণ (টাকা)
ইউপিডিএফ ১২,০০০
জাতীয় দল ১৮,০০০
জেএসএস ৮,০০০
বন বিভাগ ১৫,০০০
পুলিশ ৫,০০০-৮,০০০
অন্যান্য (রাজনৈতিক ও স্থানীয় গোষ্ঠী) ২৮,০০০
গাড়ি ভাড়া (ছোট/বড়) ২০,০০০-২৫,০০০
স্টাফ ৫,০০০
জেলা কাঠ ব্যবসায়ী ২৮,০০০
মোট: ১,৫৬,২০০ টাকা।

এই বিপুল অর্থের প্রতিটি কড়িই ইউপিডিএফের চাঁদা তহবিলে যুক্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রয়েলটির অর্থ কোথায় যাচ্ছে?
স্থানীয়রা বলছেন, ইউপিডিএফ কাঠ বাণিজ্যের এই রয়েলটি ব্যবহার করছে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অর্থ হিসেবে। এর মাধ্যমে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র মজুদ করা হচ্ছে এবং রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা বাড়ানো হচ্ছে। এই অর্থের মাধ্যমে ইউপিডিএফ ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো তথ্যসন্ত্রাস চালাচ্ছে, সরকারবিরোধী প্রচারণা ছড়াচ্ছে এবং প্রশাসনের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে।
জাতীয় ক্ষতি ও পরিবেশ ধ্বংস:
অবৈধ কাঠ পাচারের ফলে সরকার যেমন বিলিয়ন টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে পরিবেশগত ভারসাম্য ভয়াবহভাবে নষ্ট হচ্ছে। পাহাড়ের ভূমিক্ষয়, মাটিধস ও নদীভরাটের প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। অথচ বন বিভাগের বৈধ- অবৈধ খেলা বা পারমিট কিংবা ঘুস বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা ও রাজনৈতিক মদদে এই কাঠ বাণিজ্য দিন দিন আরও সংগঠিত হচ্ছে।
ঢলুপাড়া ও বর্মাছড়িমুখের কাঠ বাজার এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক বাণিজ্য নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা, পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি। ইউপিডিএফের কাঠ বাণিজ্যের এই অর্থপ্রবাহ যদি এখনই রুদ্ধ না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিণত হবে এক অস্ত্রনির্ভর অর্থসন্ত্রাসের দুর্গে, যেখানে বন, মানুষ ও রাষ্ট্র, তিনটিই হারাবে তাদের অস্তিত্বের ভারসাম্য।



