পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডে, যেখানে প্রকৃতির অপরিমেয় সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে মানুষের অস্থিরতা ও দ্বন্দ্বের গভীর ক্ষতচিহ্ন, সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও পার্বত্য চুক্তি-বিরোধী সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফ (প্রসিত গ্রুপ)-এর চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি এবং রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাঙামাটি জেলার কাউখালী উপজেলায় এই অপশক্তির অত্যাচারে স্থানীয় জনপদ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। গত ৫ নভেম্বর ঘাগড়া ইউনিয়নের রিফিউজিপাড়া, লেবারপাড়া, চেলাছড়া, নোয়াআদম এলাকায় সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা টহল ও তল্লাশি অভিযান পরিচালিত হয়েছে সাধারণ মানুষের জানমালের সুরক্ষার্থে। সূত্রমতে, ইউপিডিএফ এই অঞ্চলের বৌদ্ধ বিহার, স্কুল এবং সাধারণ ঘরবাড়িকে নিজেদের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে, যেখানে সশস্ত্র গ্রুপ নিয়মিত টহল দেয় এবং চাঁদা সংগ্রহকারী দল অবাধে চাঁদাবাজি চালায়। এর ফলশ্রুতিতে স্থানীয়রা নিরন্তর ভীতি ও অত্যাচারের শিকার।

এই পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনী লেবারপাড়া ও হারাঙ্গী রিফিউজি পাড়ায় সন্ত্রাসীদের আস্তানায় তল্লাশি চালালে ইউপিডিএফ মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়ায় যে, হারাঙ্গীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালীন সেনাবাহিনী অবস্থান নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। বাস্তবে সেনাবাহিনী কোনো ক্লাসরুমে প্রবেশ করেনি বা শিক্ষার্থীদের পাঠদানে বাধা সৃষ্টি করেনি। এটি ইউপিডিএফ-এর সুপরিকল্পিত কৌশল, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক লাভ হাসিলের প্রয়াস। অথচ গত ৪ নভেম্বর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন স্কুলে ইউপিডিএফ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জন করিয়ে কালো ব্যাজ ধারণ করতে বাধ্য করেছে, যা তাদের কোনো এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। ওইদিন কাউখালী হারাঙ্গীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, পানছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় ও ডাবুয়া এলাকার কয়েকটি স্কুল এবং উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই জবরদস্তি চালানো হয়েছে। এহেন রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

আজ ৬ নভেম্বর কাউখালী উপজেলায় গত ৫ নভেম্বরের সেনা টহল ও তল্লাশিকে অজুহাত দেখিয়ে কতিপয় উগ্র শিক্ষক ইউপিডিএফ-এর নির্দেশে শিক্ষার্থীদের নিয়ে সেনাবাহিনী-বিরোধী মিছিল বের করে ইউএনও-র মাধ্যমে শিক্ষা উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং কাউখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এই অবৈধ কর্মসূচীতে শিক্ষকদের জবাবদিহি করেননি, যা অত্যন্ত বোধগম্যহীন এবং প্রশ্নবিদ্ধ মনে করেন স্থানীয় অধিবাসীরা।

স্থানীয় বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “কোমলমতি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক ও সন্ত্রাসী তৎপরতায় ব্যবহার করে সেনাবাহিনী-বিরোধী মিছিল ও স্মারকলিপি প্রদানের পর ইউএনও কেন তা গ্রহণ করলেন, এটি গভীর বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এই দায় এড়াতে পারেন না। রাষ্ট্রীয় অনুমতি ছাড়া কালো ব্যাজ ধারণ এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য জবাবদিহি হওয়া উচিত। ইউপিডিএফ-এর নির্দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অপব্যবহারকারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক।”

মোঃ কপিল উদ্দিন মন্তব্য করেন, “প্রশাসনের নাকের ডগায় সেনা-বিরোধী স্লোগান দিয়ে এই রাষ্ট্রবিরোধী কর্মসূচী চালাতে ইউএনও অনুমতি দিয়েছেন কি? না দিলে বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় কীভাবে এমন কার্যকলাপ সম্ভব? এতে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষ বাধলে ইউএনও কি দায় নেবেন?”
স্থানীয়দের অভিমত, যেসব শিক্ষার্থী সেনাবাহিনী-বিরোধী মিছিলে অংশ নিয়েছে এবং স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করে রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তৃত্বের প্রতি অবমাননা প্রদর্শন করেছে, তাদেরকে অবিলম্বে চিহ্নিত করে নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ আজকের এই অবাধ্যতা ও রাষ্ট্রবিরোধী উস্কানিই আগামী দিনে তাদেরকে দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে পারে—তার নিশ্চয়তা কে দেবে? এমনও সম্ভাবনা রয়েছে যে, এই শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে ইউপিডিএফ এবং তার সহযোগী অঙ্গসংগঠনের প্রভাববলয়ে চলে গেছে।
চিহ্নিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন:
১. সুমেন্দ্র চাকমা (পানছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, ১০ম), ২. নমি চাকমা (হারাঙ্গীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, ১০ম), ৩. থুইনাইসাং মহাজন (ডাবুয়া বৃক্ষ ভানুপুর উচ্চ বিদ্যালয়, ৯ম), ৪. জয়ন্ত চাকমা (তালুকদার পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, ৯ম), ৫. কেয়া মণি চাকমা (মিতিঙ্গাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, ৯ম), ৬. রনেল চাকমা (কাউখালী ডিগ্রি কলেজ, ডিগ্রি ১ম বর্ষ)।
স্থানীয়রা জোর দিয়ে বলেন, এই শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সতর্ক করা, তাদের সামাজিক-পরিচর্যা ও চলাফেরার উপর সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে—ইউপিডিএফ অর্থনৈতিক দারিদ্র্য, শিক্ষাসহায়তা এবং উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বহু অল্পবয়সী ছাত্রছাত্রীকে ধাপে ধাপে সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত করে সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে যুক্ত করেছে।
অতএব, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষা এবং পাহাড়ে শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে তাদের গতিবিধির উপর সুসংবদ্ধ নজরদারি অপরিহার্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পাহাড়ি শিক্ষক জানান, “ইউপিডিএফ চাপ প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের সেনাবাহিনী-বিরোধী মিছিলে নামিয়ে এনেছে। স্মারকলিপি তাদের সহযোগী সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম তৈরি করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সেনাবাহিনীর উপস্থিতির কারণেই আমরা নিরাপদে বসবাস করি; তারা না থাকলে ইউপিডিএফ-এর অত্যাচার, চাঁদাবাজি, খুন-গুমে আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব। প্রশাসন শিক্ষকদের নিরাপত্তা ও পরামর্শ না দেওয়ায় আমরা বাধ্য হয়ে তাদের নির্দেশ পালন করি। ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, শিক্ষার গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে এবং তারা সেনা ও বাঙালি-বিদ্বেষ শিখছে। শিক্ষা অফিসার ও ইউএনও-কে এগিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের সাম্প্রদায়িক কর্মসূচী থেকে রক্ষা করতে হবে এবং রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাড়া কার্বারী বলেন, “ইউপিডিএফ কয়েকদিন পরপর শিক্ষার্থীদের ব্যানার ধরিয়ে মিছিল করায়। পাহাড়ের গভীর স্কুলগুলোতে নিয়মিত ক্লাস হয় না, বর্গা শিক্ষক দিয়ে সপ্তাহে ২-৩ দিন চলে, তাতে শিক্ষার মান নষ্ট হয় না? সেনা অভিযানে শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত হওয়ার কথা বলা ইউপিডিএফ-এর ভাঁওতাবাজি মাত্র।”
এক হেডম্যান প্রকাশ করেন, “কাত্তিক চাকমা ইউপিডিএফ কাউখালীর সভাপতি, অমেরেন্দ্র চাকমা ইউপিডিএফ কাউখালীর সহকারী পরিচালক এবং ২নং ফটিকছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উষাতন চাকমা কাউখালীতে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মসূচীতে উৎসাহ ও অর্থ যোগান দেন। উষাতন চাকমা গত ২৪ অক্টোবর ও ২৮ অক্টোবর বর্মাছড়িতে সেনা ক্যাম্প স্থাপনের বিরুদ্ধে স্মারকলিপি দিয়ে, বৈঠক করে, মিডিয়ায় বক্তব্য রেখে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়েছেন। তারা শান্তিপ্রিয় পাহাড়কে অস্থির করে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চান। পাহাড়ি-বাঙালি সকলকে সজাগ হতে হবে।”

পার্বত্য চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, ইউপিডিএফ এখন ‘শিশু ইউপিডিএফ’-এ পরিণত হয়েছে, স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মসূচীতে ব্যবহার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সন্ত্রাসের বীজ বপন করছে। প্রশাসনকে অবিলম্বে কঠোর হস্তে এই অপতৎপরতা দমন করতে হবে, যাতে কেউ ইউপিডিএফ-এর সহযোগিতা না করে এবং পাহাড়ের শান্তি অক্ষুণ্ণ থাকে। এই অন্ধকারময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ না ঘটলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনোলোক চিরকালের জন্য বিষিয়ে যাবে, যা একটি জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।



