নেত্রনিউজের একপাক্ষিক প্রচারণা ও আদিবাসী বিতর্কের গভীরে সামরিক বাহিনী নিয়ে মিথ্যাচার।

0
ছবি: সুরাইয়া সুলতানা (বিথী) নেত্র নিউজ উপস্থাপক এবং ডানে ইয়েন ইয়েন স্বঘোষিত আদিবাসী নারী অধিকার কর্মী

নেত্র নিউজ দীর্ঘ সময় ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নানা প্রতিবেদন ও ফিচার প্রকাশের মাধ্যমে একধরনের একপাক্ষিক বয়ান প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১২ নভেম্বর তাদের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে একটি তথাকথিত মুখোমুখি প্রশ্নোত্তর পর্ব, যার বিষয়বস্তু, “আদিবাসীদের পরিচয়, রাষ্ট্রনীতি ও তাদের প্রতিরোধ” শীর্ষক ৩৮ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডব্যাপী ভিডিও আলোচনা। উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা ও প্রশ্নপত্রের দায়িত্বে ছিলেন সুরাইয়া সুলতানা (বিথী) এবং রানী ইয়েন ইয়েন, যিনি নিজেকে “আদিবাসী অধিকার ও সুরক্ষা কর্মী” হিসেবে স্ব-প্রত্যয়ন করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পার্বত্য অঞ্চলের বহুমাত্রিক সংকট, জাতিগত বিরোধ, পরিচয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ে আলোচনার পরিসরে কেবলমাত্র একজন নারী অধিকারকর্মীর বক্তব্যই কি সমগ্র বাস্তবতার প্রতিফলন? নাকি এটি আদতে “আদিবাসী” শব্দটিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও গণমননে প্রতিষ্ঠিত করার এক গুপ্ত প্রচেষ্টা, এক ধূর্ত কৌশল?

রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি কিংবা পার্বত্য বাঙালি সম্প্রদায়ের কোনো মতামত ব্যতিরেকে “আদিবাসী পরিচয়”, “অধিকার আদায়” ও “সামরিক শাসনের অভিযোগ” বিষয়ক তর্ক উত্থাপন নিঃসন্দেহে সাংবাদিকতার ন্যায়নীতি ও বস্তুনিষ্ঠতার পরিপন্থী। এমন একতরফা উপস্থাপনায় রাষ্ট্রবিরোধী অভিযোগকে পরোক্ষভাবে বৈধতা প্রদান এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিভ্রান্তি সৃষ্টির সম্ভাবনা থেকে যায়। ফলে যৌক্তিক প্রশ্ন উঠেই যায়, সুইডেনভিত্তিক একটি অনলাইন সংবাদমাধ্য থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি, নিরাপত্তা কাঠামো ও জাতিগত ভারসাম্য নিয়ে এভাবে কুপ্রচার চালানো কি কেবল সাংবাদিকতা, নাকি এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক সুগভীর ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনা, যেখানে সংবাদ নয়, উদ্দেশ্যই মুখ্য?

ছবি: উপস্থাপক নেত্র নিউজ

একটি সংবাদমাধ্যম কিংবা সাংবাদিকের দায়িত্ব কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়, বরং সেটি নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সাংবাদিকতার নীতিমালার আলোকে উপস্থাপন করা। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক নীতি অনিবার্যভাবে অনুসরণযোগ্য, যেগুলো কেবল পেশাগত আদর্শ নয়, বরং গণবিশ্বাসের মূল ভিত্তি। সংবাদ কখনো একপাক্ষিক হতে পারে না; এর পরিসর সর্বদা সত্য, প্রমাণ ও ভারসাম্যের সংমিশ্রণে গঠিত হতে হয়। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কর্তব্য হলো তথ্যের যথার্থতা যাচাই করা, প্রত্যেক পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা এবং কোনো পক্ষের মতামতকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন বা প্রভাবিত না করা। বিশেষত যখন কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয়, তখন অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য সংগ্রহ ও উপস্থাপন করা শুধু নৈতিক দায় নয়, বরং সাংবাদিকতার মৌলিক শর্ত, যা উপেক্ষা করলে সংবাদ হয়ে ওঠে প্রচারণা, আর সাংবাদিকতা রূপ নেয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তির অস্ত্রে।

এই লেখাটি পাঠককে সচেতন ও বিচারপ্রবণ রাখার উদ্দেশ্যেই বিশদভাবে লেখা হয়েছে। যদিও শুরুতে এটি হয়তো পাঠকের কাছে কেন পড়তে হবে তা বুঝিয়ে উপস্থাপন করা সম্ভব নাও হতে পারে, তবুও যারা নিজের জ্ঞানভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে সত্য ও অসত্যের পার্থক্য করতে ইচ্ছুক, তারা অবশ্যই পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর আমার প্রকাশিত নিবন্ধনগুলো পড়বেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয় যখন আলোচনায় আসে, তখন আমাদের সীমিত জ্ঞান বা অজ্ঞতার কারণে আমরা সহজেই কোনো একটি সম্প্রদায়ের পক্ষ নিয়ে ফেলি। আমরা “উপজাতি অধিকার” বা “আদিবাসী অধিকার” বিষয়কে অত্যধিক আবেগ ও সরলভাবে ধারণ করি। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ফিলিস্তিনি গাজা বা কাশ্মীরের পরিস্থিতির অনুরূপ নয়। ফিলিস্তিনি ও কাশ্মীরি জনগণকে কোনো গণমাধ্যম সরাসরি সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ দেয় না, এবং তাদের বক্তব্যও প্রচার করা হয় না। ১৯৪০ সাল থেকে দখলদার ইহুদি কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের উপর যেভাবে হত্যাযজ্ঞ, নারীদের উপর গণধর্ষণ ও নিপীড়ন চালানো হয়েছে, এবং কাশ্মীরে তিন দশকের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনী একইরকম গণহত্যা ও সহিংসতা চালিয়েছে, এগুলোর তুলনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে এমন কোনো সামরিক শাসন বা বেসামরিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে না। যদি আরো নিকট দেখিয়ে উদাহরণ দিই, পাশের দেশ মায়ানমার রাখাইন রাজ্যে যেভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে সে অনুরূপ নয় পার্বত্য চট্টগ্রাম।

Netra News (নেত্র নিউজ) মূলত সুইডেনভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যম, যার সদর দপ্তর মালমো, সুইডেনে অবস্থান করছে। যদিও তারা বাংলাদেশের বিষয়বস্তু নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করে, কিন্তু তাদের কাজের মূল ভিত্তি সুইডেনেই স্থাপিত। এই সংবাদমাধ্যম বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় সংবাদ প্রকাশ করে; তবে ইংরেজির তুলনায় বাংলায় প্রকাশিত সংবাদ সংখ্যাতেই প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে, সুইডেনভিত্তিক একটি সংস্থা কেন বাংলাদেশে এত মনোযোগ দেয়? বিশ্বের অন্যান্য দেশ বা ভাষার বিষয়কে বাদ দিয়ে কেন বাংলাদেশের বিষয়বস্তু বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে? বিষয়টি কেবল সাংবাদিকতার স্বাভাবিক প্রয়াসের মধ্যে পড়ে কি, নাকি এর পেছনে কোনো সুপরিকল্পিত কৌশল বা গুপ্ত উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে? তারা কি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, সামাজিক বা জাতিগত ইস্যুতে কোনো প্রভাব বিস্তারের জন্য বিশেষ মিশন পরিচালনা করছে? এইসব প্রশ্নের উত্তর অনুধাবন ছাড়া নেত্র নিউজের প্রতিবেদনের পেছনের উদ্দেশ্য, পক্ষপাত ও সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই করা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

পৃথিবীর অধিকাংশ ধর্মীয় এনজিও ও মিশনারি কার্যক্রম সুইডেন থেকে পরিচালিত হয়। সুইডেনকে প্রায়শই এমন দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে শান্তি ও শান্তিচর্চা সর্বদা অগ্রগণ্য, যেন গোটা বিশ্বের শান্তির উৎপত্তি সেখানে। কিন্তু বাস্তবতা এই প্রতিমূর্তির বিপরীত, গত কয়েক দশকে সেখানে উগ্রবাদীরা সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর ব্যাপক নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ, কোরআন পোড়ানোর ঘটনা এবং বর্ণবাদ-ভিত্তিক বৈষম্য চালিয়েছে। এই দ্বন্দ্ব ও বৈষম্য একটি ঘনিষ্ঠ চিত্র উপস্থাপন করে যে, সুইডেনের বহুজাতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তির আড়ালে সমাজে বিদ্যমান ক্ষমতার অস্বাভাবিক প্রয়োগ এবং সংখ্যালঘুদের উপর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ।

নেত্র নিউজ সুইডেন থেকে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এই গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে এমন সংবাদকর্মী, প্রতিনিধি ও উপস্থাপক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা মূলত বামপন্থী বা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত, যাদের মধ্যে ইসলাম-বিরোধী মনোভাব লক্ষ্যণীয় এবং যারা স্বাধীনচেতা হিসেবে নিজেদেরকে উপস্থাপন করে। তারা তথাকথিত মানবাধিকার-প্রচারক সেজে বিতর্কিত সংবাদ পরিবেশন করে এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য বা এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে খবর তৈরি ও প্রচার করে। এই কাঠামো, নিরপেক্ষতার অভাব এবং পক্ষপাতপূর্ণ প্রতিবেদনের সমন্বয়টি প্রশ্ন তোলে, নেত্র নিউজ কি সত্যিই সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করছে, নাকি এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে সুইডেনভিত্তিক একটি পলিসি-ভিত্তিক প্রভাব বিস্তারের উপায়?

আসলে এবার মূল নেত্র নিউজের মুখোমুখি প্রশ্ন “আদিবাসীদের পরিচয়, রাষ্ট্রনীতি ও তাদের প্রতিরোধ” বিষয়ক পর্বের প্রেক্ষিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দাবির দিকে নজর দিই। প্রথম পরিচয় হিসেবে বলা যায়, ইয়েন ইয়েন হলেন রাঙামাটি চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের প্রথম স্ত্রী তাতু রায়ের মৃত্যুর পর বিয়ে করা দ্বিতীয় স্ত্রী, যিনি নামের সঙ্গে পরিচয়ে চাকমা সম্প্রদায়ের নয়, বরং রাখাইন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামে রাখাইন সম্প্রদায়ের স্থায়ী বসবাসের কোনো উল্লেখযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায় না; ব্যবসায়ীক সূত্রে পার্বত্য এলাকায়, তাদের উৎপত্তি ও আদি আবাসস্থল মূলত মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য, যেখানে থেকে রোহিঙ্গা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশান্তর ঘটে। বাংলাদেশের মধ্যে রাখাইন সম্প্রদায়ের কিছু সীমিত বসবাসের ইতিহাস লক্ষ্য করা যায় কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনা এলাকায়। আজকের দিনে বাংলাদেশে আদিবাসী বা উপজাতি পরিচয় নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা আন্তর্জাতিক আইন, বাংলাদেশের সংবিধান ও ইতিহাস পর্যালোচনার আগে রাখাইন জনগোষ্ঠীর উৎপত্তিকে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা জরুরি। প্রশ্ন জাগে, সেখানে রাখাইন জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে কি? যদি স্বীকৃতি পাওয়া থাকে, তাহলে জাতিসংঘ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আইএলও কনভেনশন ১৭৯ (১৯৮৯) এর ‘বি’ অনুযায়ী মায়ানমার সরকার কি সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছে? এবং যদি না দিয়ে থাকে, তাহলে চাকমা সার্কেল চীফ অর্থাৎ আত্মস্বীকৃত রাজাকার ত্রিদিব রায়ের পুত্রবধূ হিসেবে আগমনকারী কথিত ইয়েন ইয়েন কেন নিজেকে আদিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন, মনে হয় যেন সমগ্র পৃথিবীতে শুধুমাত্র তারাই একমাত্র আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং দাবিদার, আর বাকি সবাই দখলদার।

তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির উদাহরণ টেনে বলেছেন যে চুক্তিটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার ও জাতিসংঘীয় মানদণ্ডের প্রতীক হিসেবে গণ্য, তবে সরকারই এই চুক্তি বাস্তবায়ন করছে না বলে তিনি যে দাবি করেন, তা তিনি জানা থাকা সত্ত্বেও আপাতত ভুল ধারনাপ্রসূত: চুক্তিতে সরকারের পক্ষে এমন কোনো বহুমাত্রিক শর্ত আরোপ করা ছিল না; কেবলমাত্র এক ব্যতিক্রমী প্রতিশ্রুতি ছিল, চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে জেএসএসকে সম্পূর্ণভাবে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তন করতে হবে এবং সরকারের পক্ষ থেকে এ প্রত্যাবর্তন সুনিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অথচ জেএসএস মৌলিক ধারাসমূহ লঙ্ঘন করে বর্তমানে পাহাড়ে অন্ত্র নিয়ে বিদ্যমান রয়েছে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, এই বাস্তবতায় সরকারের অবশিষ্ট বিধি কীভাবে কার্যকর হবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ; চুক্তিমাফিক সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফেরত নেওয়া জটিলতা তৈরি করবে, যদি না পূর্বশর্ত হিসাবে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রসম্ভারে নির্মূলতা ঘটানো না যায়। আমার বিশ্লেষণ মতে, যদি পাহাড়ে নিরস্ত্রীকরণ না ঘটে এবং “অধিকার” নামধারণ করে চাঁদাবাজি, অপহরণ-ব্যবসা, হত্যাকাণ্ড ও বিচ্ছিন্নতাবাদ অব্যাহত থাকে, তবে পূর্বে প্রত্যাহারকৃত ২৩৯টি ক্যাম্প ফিরিয়ে আনা হয়েছিল, সেসব পুনরায় স্থাপন করার দাবি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডীয় অখণ্ডতার স্বার্থে অনিবার্যভাবে জোরালো হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি জনগণ তাদের অধিকার ও কর্তব্য বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নয়; তারা সত্য উপস্থাপনের মানসিকতা অর্জন করতে পারেনি। বরাবরই জাতীয় রাজনীতিতে মগ্ন হয়ে নিজের স্বজাতি প্রেমকে প্রান্তিক রেখেছে, যার ফলে আজ তারা বিভক্ত এবং এক অবহেলিত জাতি হিসেবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

প্রশ্নের আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক শাসন চলছে বলে যে মন্তব্য ইয়েন ইয়েন করেছেন, তা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বাস্তবে পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম সমতলের মতো সিভিল প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাহাড়ে প্রশাসন ডিসি, এসপি, ইউএনও, ওসি দ্বারা পরিচালিত হয়, সামরিক বাহিনী নয়। এরই প্রমাণ চুক্তির আগে-পরে পাহাড়ে ৬৩৪ জন সেনাবাহিনী, পুলিশ, ভিডিপি, আনসার ও বিজিবি নিহত হওয়ার ঘটনা, চুক্তির পর ৩৭ জন অভিযানকালে নিহত হওয়া এবং অন্যান্যভাবে ৪৯ জনের নিহত হওয়ার পরিসংখ্যান; যদি পাহাড়ে সত্যিই সামরিক শাসন থাকত, তাহলে এই ধরনের নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি ঘটার কথা সামনে আনার সুযোগ হতো না। সুতরাং এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে সিভিল প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সামরিক শাসন এখানে কোনো বাস্তবতা নয়।

আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে ফিলিস্তিনি, কাশ্মীরি বা রোহিঙ্গাদের দুঃসহ প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করা একেবারেই কূটচাতুর্যপূর্ণ ভুল ধারণা। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা বা সেখানে সংঘটিত ঘটনা কোনোভাবে গাজা, কাশ্মীর বা রাখাইনের বিপর্যয়কর প্রেক্ষাপটের প্রতিসরূপ নয়। এখানে সেনা ও গোয়েন্দারা উপজাতি সম্প্রদায়ের জনপ্রতিনিধি ও হেডম্যান-কার্বারীর সঙ্গে আলোচনায় নিপুণ বিনয় প্রকাশ করেন এবং মানবাধিকার, উদারনীতি ও আন্তরিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড অনুসরণ করেন। বিপরীতে, পার্বত্য বাঙালিদের সঙ্গে আচরণ প্রায়শই তুচ্ছতা, তাচ্ছিল্য এবং ন্যূনতম সম্মানহীনতার ছাপ বহন করে।

উপস্থাপক বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষদের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী ট্যাগ দেওয়া হয়। একই কথার সুর টেনে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে কথা বলেছেন ইয়েন ইয়েন। বাস্তবিক অর্থেই পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দের মতো বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর পরিভাষা নিয়ে ক্রমাগত আপত্তি দেখা দেয়; স্বায়ত্তশাসনের আড়ালে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনার প্রশ্নও উঠেছে। সংবিধান অনুযায়ী, ২৩ (ক) ধারা এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, উপজাতি ও জাতিসত্তার সঙ্গে ‘আদিবাসী’ শব্দের সম্ভাব্য সাংঘর্ষিকতা এ বিষয়কে সংবিধান-বিরোধী হিসেবে পরিচিত করেছে। যদিও সংবিধান পরিষ্কারভাবে ‘উপজাতি’ স্বীকার করে, ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই, এই যুক্তি ধরেই ইয়েন ইয়েন বারবার আদিবাসী শব্দ সংবিধান বিরোধী নয় এবং পার্বত্য চুক্তির দোহাই দিচ্ছেন। তবে পার্বত্য চুক্তিতে আদিবাসী শব্দ ব্যবহৃত হয়নি; বরং চুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং জেলা পরিষদ আইনে একাধিকবার ‘উপজাতি’ শব্দ প্রতিস্থাপিত হয়েছে। চুক্তি সম্পাদিত কালে তৎকালীন এমপি দীপংকর তালুকদার, চুক্তির স্বাক্ষরকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি (জেএসএস) নেতা সন্তু লারমা এবং ইয়েন ইয়েনের স্বামী চাকমা সার্কেল চীফ দেবাশীষ রায়কে প্রস্তাব করেছিলেন চুক্তিতে ‘আদিবাসী’ হিসেবে উল্লেখ করতে; কিন্তু তখন তারা নিজেদের ‘উপজাতি’ হিসেবে দাবি করেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, ২৮ বছরের ব্যবধানের পর আজ কেন আবারও তারা ‘আদিবাসী’ দাবি নিয়ে আসছেন?

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের একটি অংশের মধ্যে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করা যায়; একই সঙ্গে ‘উপজাতি’ শব্দকে মানহীন, ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ জাতিসত্তা হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতাও বিদ্যমান। অথচ, প্রতিবেশী ভারতের লাখ লাখ উপজাতি-জনজাতি থাকা সত্ত্বেও তারা কখনও নিজেদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্তির জন্য এইরূপ কৌশল বা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেনি। বিশ্বব্যাপী প্রচুর উপজাতি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী বিদ্যমান; সেসবের মধ্যে আইএলও কনভেনশন ১৬৯ অনুযায়ী ‘এ’ ধারা উপজাতি সংজ্ঞা এবং ‘বি’ ধারা আদিবাসী সংজ্ঞা নিয়ে কোনো প্রকার মাতামাতি দেখা যায় না, কিংবা ‘এ’ সংজ্ঞা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ‘বি’ সংজ্ঞার ওপর ব্যাখ্যা দেওয়া হয় না। বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে, আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভের জন্য ব্যাপক ও সুসংগঠিত আয়োজন করা হচ্ছে; ২০০৭ সালের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সম্পর্কিত ঘোষণাপত্রের পর থেকেই নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে উপস্থাপিত করার চেষ্টা এবং ৯ আগস্ট ডামাডোলের মাধ্যমে আদিবাসী দিবস পালনের মতো কার্যক্রম লক্ষ্যনীয়। এছাড়া, বাংলাদেশে আদিবাসী স্বীকৃতির জন্য নির্দিষ্ট ফান্ডিংয়ের বিধান শুরু হওয়ার ফলে একপ্রকার কৃত্রিম ন্যারেটিভ তৈরী হয়েছে, যা আদিবাসী স্বীকৃতির দাবিকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে উস্কে দিচ্ছে।

যেমন আজ ইয়েন ইয়েন আদিবাসী স্বীকৃতির বিষয়ে সোচ্চার, তেমনি তার স্বামী ২০০৯ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠির মাধ্যমে নিজেদের ‘উপজাতি’ হিসেবে দাবি জানিয়েছিলেন; এই প্রেক্ষাপটে আজকের তার এই দাবী নতুন বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

অথচ জাতিসংঘের আইএলও কনভেনশন ১৬৯ (১৯৮৯)-এর আগেও ১৯৫৭ সালে একই সংস্থা আদিবাসী বিষয়ক বিধান রেখেছিল। তথাপি, কোনো সময় তারা নিজেদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির দাবি করেনি। কিন্তু ২০০৭ সালে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্রের পরও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু উপজাতি রাতারাতি নিজেদের ‘উপজাতি’ থেকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে উপস্থাপন শুরু করেছে। যদি বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ ঘোষণাপত্রের বিপরীতে ছিল। ঘোষণাপত্রে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, জাতীয় সম্পদে অংশগ্রহণ, স্বায়ত্তশাসন, ভূমি অধিকার, জাতীয়তা লাভের অধিকার এবং সামরিক কার্যক্রম স্থগিত করার অধিকারকে এই দাবির আড়ালে ব্যবহার করে তারা একটি কৃত্রিম ন্যারেটিভ নির্মাণ করছে। নিজেদের উপজাতি পরিচয় মুছে দিয়ে এভাবে তারা বিশ্বের অন্যান্য উপজাতিদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করছে একইভাবে বাঙালি জনগোষ্ঠীকে দখলদার হিসেবে অভিহিত করছে।

তারা দাবী উপস্থাপন করেন যেন বাংলাদেশ সরকার এটি মেনে নিলে সকল সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। বাস্তবে কি তাই? মোটেও নয়। পার্বত্য অঞ্চলের প্রকৃত সমস্যা হলো, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, সাম্প্রদায়িক মানসিকতা এবং দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতাবাদ। আদিবাসী স্বীকৃতি এই জটিলতা সমাধান করবে না; বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক ও সামাজিক জটিলতার নতুন স্তর সৃষ্টি করবে।

রানী ইয়েন ইয়েন যে উপজাতিদের প্রতি বর্তমানে ‘আদিবাসী’ মর্যাদা দাবি করেন, তারা আসলে উপজাতি কোটা সুবিধা গ্রহণ করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক ও সামাজিক-রাজনীতিক ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভোগ করছে। বর্তমান কোটা সংস্কারের পরও ৫ শতাংশের প্রাপ্যদের মধ্যে অনেকে ১ শতাংশের আওতায় বজায় রাখছেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়োগে ৫ শতাংশ থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কোটা ব্যবহার চালু রয়েছে। এসব উপজাতিদের সংখ্যা দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে ১ শতাংশও হবে না, তা সত্ত্বেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে সবকিছু তাদের অধীনস্থ করার দাবি তুলছেন: আইনি বিধি, প্রশাসনিক প্রণালী, স্মৃতি-পরিচয় ও সাংস্কৃতিক উদ্বৃত্তই যেন তাদের একচেটিয়া অধিকার। এমনকি তাঁরা দাবী করেন, পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালি বসবাস ও সামরিক উপস্থিতি সম্পূর্ণত: উৎখাত করতে হবে, এ ভূখণ্ড তাদের একচ্ছত্র স্বায়ত্তশাসন ব্যতীত আর কাউকে থাকার অধিকার নেই; অন্যথায় তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিনষ্ট হয়ে যাবে-এ রকম একতরফা প্রতিকাথা রচিত হচ্ছে। এসব আবদারকে সুশীল সমাজ ও বাম রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অনবিচল সমর্থন লাভ করছে। আপনার মতে, উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর এই দাবিগুলো কি সত্যিকারের আর্তনাদ, নাকি সুচিন্ত্যহীন, সরলকৃত ও কৌশলগত রাজনৈতিক দাবি?

আদিবাসী বিষয়টি বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি উপজাতির মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম প্রভৃতি জাতির একটি পর আর কোনো ভাষার অস্তিত্ব নেই। অথচ নৃবিজ্ঞানী মরগান ৫০০০-এরও বেশি ভাষার উল্লেখ করেছেন। আদিবাসী স্বীকৃতির জন্য নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে—যথাস্থানে ভূমিপত্রের প্রমাণ এবং হাজার বছরের স্থায়ী বসবাসের ইতিহাস। যারা এই বসবাস বা উৎপত্তির ইতিহাস প্রমাণ করতে পারেন না, তারাও আদিবাসী হিসেবে গণ্য হতে পারে; কিন্তু যাদের অতীত বসবাসের ইতিহাস মাত্র ২০০–৩০০ বছর, যথাস্থানে নয়, অথবা পূর্ব ইতিহাস পার্শ্ববর্তী দেশে, তারা আদিবাসী বা ভূমিপুত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। এটাই মরগানের আদিবাসী সংজ্ঞা।
জাতিসংঘের আইএলও কনভেনশন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্পষ্ট সংজ্ঞা না দিলেও কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড উল্লেখ করেছে। তবে বাংলাদেশের উপজাতিরা কেবল রাষ্ট্রের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ভাষা ও সংস্কৃতিতে অভিন্ন থাকার কারণে নিজেকে আদিবাসী দাবি বৈধ মনে করে এবং যুক্তি দেয় যে, ঔপনিবেশিক শাসনের কাল থেকে অর্থাৎ তারা ৭১ সালের পূর্ব থেকেই রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের প্রথম ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা ছিল না, আর্য ছিল প্রথম ঔপনিবেশিক স্থাপক। ব্রিটিশদের আগে এখানে মোগল ঔপনিবেশিকও ছিল৷ সবকিছু বিবেচনায় আইএলও কনভেনশন ১৬৯-এর ধারা (বি) তাদেরকে আদিবাসী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে না; বরং কনভেনশন ১৬৯ এর ধারা (এ)- তাদের ‘উপজাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ অসচেতন বলে তারা আন্তর্জাতিক আইনের অপব্যাখা দেয়। তারা কনভেনশনের একটি অনুচ্ছেদ তুলে ধরে। এটি তাদের বর্ণচুরি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতির বাংলাদেশে আগমনের ইতিহাস মাত্র ২০০–৩০০ বছরের বেশি নয়। এরা মঙ্গোলীয় মহাজাতির শাখা, যা বিভিন্ন সময়ে তিব্বত, মিয়ানমার ও ভারতের মঙ্গোলীয় যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে বিতাড়িত হয়ে শরণার্থী হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। আজকের উপজাতিরা নিজেদের প্রভাব, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রথা-রীতি উদ্‌ঘাটন করার চেষ্টা করেন, কিন্তু বাস্তবে তাদের অতীতের প্রমাণ ক্ষীণ, তাদের পূর্বপুরুষ মূলত যাযাবর জীবনযাপন করতেন। ইতিহাস এটাই বলে।

পার্বত্য অঞ্চলের জঙ্গলে তারা আশ্রয় নিয়ে বসতি স্থাপন করলেও তাদের কোনো কালে স্বীকৃতি ছিল না। ব্রিটিশ শাসনই তাদের স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। যেটাকে তারা ‘প্রথাগত অধিকার’ বা পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘বিশেষ শাসিত অঞ্চল’ হিসেবে উপস্থাপন করে, তা ব্রিটিশ হুকুমে মোঘল শাসনের পরে প্রবর্তিত হয়েছে। হিল ম্যানুয়েল ১৯০০ সালের পরিপ্রেক্ষিতে চালু হয়েছে, অর্থাৎ মাত্র ১০০–১২৫ বছরের পুরনো।

তাদের এই প্রাচীনত্বহীন ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তারা বাঙালিকে দখলদার, সেটেলার, অবৈধ, অপরাধী বা খারাপ জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করে, তা বোধগম্য নয়। ব্রিটিশরাই উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি; ইংরেজিতে এটি কেবল ‘Tribal’ শব্দের মাধ্যমে স্বীকৃত। হিল ম্যানুয়েল ৫২ ধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামের এদেরকে অভিবাসী–শরণার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের চার হাজার বছরের স্থায়ী বাঙালিকে দখলদার, সেটেলার বা নীচু জাতি আখ্যায়িত করা, এবং নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ ও উপজাতি পরিচয় বাদ দিয়ে “আদিবাসী” হিসেবে তুলে ধরা, জাতিসংঘের আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী সাধারণ পার্ট (এ) এর সংজ্ঞার উলঙ্গ অবমাননা ছাড়া কিছু নয়।

বিশ্বের আফ্রিকার প্রাচীন উপজাতিরা আইএলও ১৬৯ এর সংজ্ঞার (এ) মেনে চলে, কিন্তু বাংলাদেশে ২০০–৩০০ বছরের অভিবাসী হিসেবে এসে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দাবি করা বৈধ নয়। ‘উপজাতি’ শব্দটি বাংলাদেশের নিজস্ব রূপক নয়; এটি জাতিসংঘের স্বীকৃত একটি আন্তর্জাতিক পরিভাষা। উপজাতি পরিচয় মুছে আদিবাসী গ্রহণের পেছনে রয়েছে রাষ্ট্র ভাগের গভীর ষড়যন্ত্র।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা বাঙালি জনগণ এবং রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। তারা আধুনিক জীবনের স্বপ্ন পোষণ করে, বাঙালিদের কাছ থেকে শিক্ষা, প্রযুক্তি, সহযোগিতা ও কর্মদক্ষতা অর্জন করে, কিন্তু দিনের শেষে বাঙালি-বিদ্বেষমূলক বক্তব্যে আত্মপ্রকাশ করে। এসব উপজাতির একটি অংশ অকৃতজ্ঞ এবং তার প্রভাবেই পৃথিবীর কোথাও তাদের স্থায়ী আবাস প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ বাঙালি উদার মনোভাবের জাতি, যা অন্যান্য জাতিসত্তার প্রতি সহমর্মিতা ও আন্তরিকতা প্রদর্শন করে। সেই কারণে আজ উপজাতিরা এদেশে আদিবাসী দাবিদার হলেও বাঙালি নিজের ভূখণ্ডে পরবাসী অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত।
উপজাতিদের উচিত, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, এনজিও, মিশনারি ও ‘আদিবাসী’ শব্দের প্রলোভনমূলক অর্থায়নের জালটিতে ফাঁদে না পড়া এবং নিজেদের স্বকীয়তা, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা।

স্বাধীনতার পর, জেএসএস-এর সশস্ত্র শাখা ‘শান্তিবাহিনী’ গঠনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। সরকারের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৬–৭৭ সালে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা হয় এবং ১৯৭৯ সালে বাঙালি পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা হয়। দীর্ঘ ২০ বছরের সংঘাত বন্ধের পর, সরকার শান্তিবাহিনীর দাবিদাওয়া মেনে ১৯৯৭ সালে একটি সমঝোতা চুক্তি সম্পাদন করে।

কিন্তু চুক্তির শর্তানুযায়ী শান্তিবাহিনী সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেনি। একাংশের মধ্যে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গঠন হয় এবং পরবর্তীতে আরও কিছু ক্ষুদ্র উপদল সৃষ্টি হয় সংস্কার ও গণতান্ত্রিক। ২০২০ সালের পর মগ পার্টি ও কেএনএফ-এর আবির্ভাবও লক্ষ্য করা যায়। এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী ছয়টি সংগঠনের দাবি ভিন্ন ভিন্ন এবং সরকারের পক্ষে একসাথে তাদের সকলের সঙ্গে চুক্তি বা সমঝোতা করা সম্ভব নয়। বরং, তাদের আজকের দাবিগুলো মূলত ১৯৯৭ সালের চুক্তির অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে জেএসএসকে প্রদত্ত অধিকার।

বর্তমান সময়ে গঠিত জাতি-ভিত্তিক সংগঠনগুলোর উচিত, তাদের অধিকারগুলো জেএসএস থেকে অনুধাবন করা এবং তা আদায়ের জন্য আইনগত ও সংলাপমুখী পথ অবলম্বন করা। তবে তারা তা না করে অসাংবিধানিক দাবি উপস্থাপন করে জটিলতা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি জেএসএসও বিভিন্ন সময় সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়নে অনীহা বা ব্যর্থতার অভিযোগ প্রবর্তন করে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। তাই প্রকৃত বাস্তবায়ন নিরীক্ষণ জরুরি, চুক্তি কতটুকু কার্যকর হয়েছে তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

এই প্রসঙ্গে রাঙামাটির তৎকালীন এমপি দীপংকর তালুকদারের বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের ৮ মাস পূর্বে তিনি বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৮টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চুক্তি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং স্বাক্ষরকারী পক্ষ জেএসএস যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, সরকার চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। তবে এর আগে পাহাড় থেকে অবৈধ উদ্ধার এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নির্মূল করা অপরিহার্য।

নেত্র নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নিরসনের সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন ইয়েন ইয়েন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, আদিবাসী অধিকারকর্মী হিসেবে তিনি কেন সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে সকল উপজাতি সংগঠনকে নিয়ে একত্রিত বৈঠকের উদ্যোগ নিচ্ছেন না? সরকার আলোচনায় বসতে প্রস্তুত, যদি তিনি সত্যিই সমাধানের পথে অগ্রসর হতে চান। কেবল সরকারের উপর দায় চাপিয়ে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে সমস্যা নয়, বিভাজনই আরও গভীর হবে

আগের পোস্টবাঘাইছড়িতে বাঁশের ভেলার আড়ালে কাঠ পাচারের চেষ্টা ব্যর্থ, প্রায় ১২ লাখ টাকার কাঠ উদ্ধার।
পরের পোস্টকাপ্তাইয়ের বিভিন্ন স্পট দিয়ে শুরু হয়েছে কাঠপাচার।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন