আমি বহু বছরের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের মুখ চিনে, তাদের দুঃখ-সুখ শুনে শুনে বুঝেছি, এখানকার বাঙালি সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় শত্রু কেউ বাইরের নয়, আমরা নিজেরাই। একজন আরেকজনের উঠে আসা সহ্য করতে পারি না। কেউ একটু চালকের আসনে উঠলেই তাকে টেনে নামাতে চাই। কেউ একটু আলোর মুখ দেখলেই তার চোখে অন্ধকার ঢেলে দিতে মন ছটফট করে। এই হিংসা, এই পরশ্রীকাতরতা, এই ছোট মনের খেলা আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে দশকের পর দশক। আর সেই খেলার সর্বশেষ শিকার হয়েছেন একজন তরুণ, সৎপথে হেঁটে আসা মানুষ, হাবিব আজম।
হাবিব আজম আজ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য। তিনি এই জায়গায় এসেছেন নিজের শ্রমে, মেধায়, দীর্ঘ সংগ্রামের আগুনে ঝলসে। কেউ কেউ বলেন, “বাঙালি কোটায় এসেছেন।” আমি বলি, কোটায় এলেও বা যোগ্যতায় এলেও, তিনি এসেছেন। এই পরিষদেই আরো তিনজন বাঙালি সদস্য আছেন। কিন্তু তাঁদের নাম ক’জন বাঙালি জানে? প্রয়োজনের সময় তাঁদের কাউকে কোথাও পাওয়া যায় না। দুঃখজনক হলেও সত্য, কোনো বিপদে এদের কাছে বাঙালি জাতি কোনও সমর্থন পাবেন না। তবু তারা “বাঙালি কোটার” সদস্য। অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, এদের মাধ্যমে বাঙালির অধিকার বা স্বার্থে কোনও অগ্রগতি হবে না। বাঙালি সংগঠনের বাইরে যারা রাজনৈতিক দল বা দলবিহীনভাবে আসেন, তারা বাঙালি জাতির কল্যাণে কাজ করেন না; বরং চেয়ারম্যানকে জি-হুজুর সংস্কৃতিতে নিজেদের বরাদ্দ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন। গত বছর ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর মন্ত্রণালয় যখন নতুন অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন করে, তখন ১৫ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন বাঙালি। বাকি ১১ জন বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। দু’জনের সদস্যপদ মামলায় স্থগিত। বর্তমানে ১২ জনের মধ্যে বাঙালি ৪ জন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সমালোচনার তির শুধুই হাবিব আজমের দিকে। উপজাতি এতজন সদস্য এবং বাকি তিন বাঙালি সদস্য যেন দুধে ধোয়া তুলসীপাতা। তাঁদের নিয়ে কারো মুখে একটি কথাও নেই। হাবিব আজমকে সদস্য ঘোষণার পর দেখেছিলাম উপজাতি উগ্র সংগঠনের সমর্থকরা তাকে নিয়ে সাম্প্রদায়িক সংগঠনের নেতা হিসেবে বিভিন্নভাবে বিতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন৷ এখন একই কাজের দায়িত্ব নিয়েছে কিছু বাঙালি, যারা চিহ্নিত।
জেলা পরিষদের বেতন-ভাতা, সম্মানী যা আসে, তা দিয়ে একজন সদস্যের অফিস খরচ, মেহমান আপ্যায়ন চলে কি না সন্দেহ। জেলা পরিষদের পুরো বাজেট তো হাবিব আজমের পকেটে যায় না। তাহলে আমরা তার কাছে এত আশা আর প্রত্যাশা করি কেন? সবকিছু তো তার সাধ্যের মধ্যে নয়। এটা তো সবার বুঝা দরকার। পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর দুর্নীতি, নিয়োগে বৈষম্য, প্রকল্পের অনিয়ম, স্বজন প্রীতি এসব গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কথা হয় শুধু হাবিবের নামে। যারা এই অভিযোগ তুলছেন, তাঁদের নিজেদের হাত কতটা পরিষ্কার? তাঁরা কি কখনো জেলা পরিষদের বার্ষিক বরাদ্দের হিসাব দেখেছেন? প্রকল্পগুলো শতভাগ কার্যকর হচ্ছে কি না খতিয়ে দেখেছেন? নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোথায় বৈষম্য হচ্ছে, সে বিষয়ে একটি শব্দও বলেছেন? না। শুধু একজন তরুণ বাঙালি নেতার পিছনে লেগে আছেন। এটা নিছক সমালোচনা নয়, এটা পরিকল্পিত চরিত্র হনন। একই পদে যদি কোনও রাজনৈতিক দলের নেতা থাকতেন, তাহলে কি কারো সাহস হতো তার সামনে বা পেছনে দাঁড়িয়ে এই কথা বলার?
হাবিব আজমের জীবনের শুরু থেকেই বাঙালি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যখন যেখানে দরকার পড়েছে, শত বাধা উপেক্ষা করে তিনি এগিয়ে গেছেন। সন্ত্রাসীদের মুখোমুখি হয়েছেন, গুলি-বোমার হুমকি উপেক্ষা করেছেন। এমন সাহস কি আমাদের সবার আছে? তাঁর ভুল থাকতেই পারে। ভুল ধরিয়ে দেওয়া স্বজাতির দায়িত্ব। কিন্তু ভুল ধরানোর নামে তাঁকে একঘরে করে দেওয়া, ঢাকায় ৪০ লাখ টাকা দিয়ে গাড়ি কেনার মিথ্যা গল্প রটানো, বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়ে হয়রানির ব্যর্থ চেষ্টা করা, এটা কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ নয়। এটা কেবল হিংসার প্রতিফলন। যারা এ কাজ করছেন, তাঁরা হয়তো হাবিবের কাছে অন্যায় সুবিধা চেয়ে পাননি, নয়তো তাঁর উত্থান তাঁদের রক্তচক্ষুতে পড়েছে।
একটি কথা তাদের মনে রাখা উচিত, হাবিব আজমের স্ত্রী একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। তাঁর পরিবারে স্থায়ী উপার্জনের ব্যবস্থা আছে, সংসারে সচ্ছলতা আছে। তিনি নিজেও জানেন, জীবনে যা প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি কিছুর জন্য লোভ করার কোনো কারণ নেই। জেলা পরিষদের সদস্য পদে তিনি এসেছেন মাত্র এক বছর হলো। এই সময় এমন কী করা যায়? যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতায় নেই। স্বল্প সময়ের জন্য নেওয়া এই দায়িত্ব তিনি নিয়েছেন পর্যটন শিল্পের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকে, ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়।
যে বরাদ্দ তিনি পান, তা পর্যটন খাতের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য। সেই বরাদ্দও তাঁর হাতে আসে না পুরোটা, আসে চেয়ারম্যানের অনুমোদন ও পরিষদের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। এমনকি কেউ যদি অনিয়ম করতেও চান, সেই অঙ্কও কখনো ৪০ লাখ টাকা হয় না। তাহলে প্রশ্ন জাগে, যে গুটিকয়েক ব্যক্তি রাতদিন “৪০ লাখ টাকা দিয়ে ঢাকায় গাড়ি কিনতে চেষ্টা করেছে” এই মিথ্যা গল্প ছড়িয়ে হাবিব আজমের চরিত্রহনন করছেন, তাঁরা আসলে কোন জাতের মানুষ?
যাঁরা জানেন না পরিষদের বাজেট কীভাবে বণ্টন হয়, কীভাবে প্রকল্প অনুমোদন হয়, কীভাবে টাকা খরচ হয়, কিন্তু মুখে ফেনা তুলে গল্প ফেঁদে বেড়াচ্ছেন, তাঁদের বিবেক কি একবারও প্রশ্ন করে না? নাকি এঁরা সেই শ্রেণির লোক, যাঁদের কাছে সত্যের চেয়ে হিংসা বড়, যাঁদের কাছে একজন সৎ মানুষের উত্থান অপরাধ, আর নিজের অন্ধকার মনের প্রতিচ্ছবি অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়াই যাঁদের একমাত্র কাজ?
এই গল্পকারদের একবার ভেবে দেখা উচিত, যে যিনি নিজের শ্রমে দাঁড়িয়েছেন, যিনি জীবনে কারও কাছে হাত পাতেননি ব্যক্তিগত স্বার্থে তাঁকে “৪০ লাখের গাড়ি” দিয়ে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করে আসলে নিজেদের ছোট মনের পরিচয়ই দিচ্ছেন। এই হিংসার আগুনে পুড়ে শেষ পর্যন্ত পুড়বে কে? হাবিব আজম নয়, পুড়বে এই সমাজের বিশ্বাস, পুড়বে আমাদের একতা, পুড়বে আমাদের ভবিষ্যৎ।
তাই যারা এই মিথ্যার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁদের কাছে একটাই অনুরোধ, অন্তত একবার সত্যের সামনে দাঁড়ান। হাবিব আজমের মতো একজন তরুন বাঙালি যুবককে টেনে নামিয়ে আপনারা কাকে জেতাচ্ছেন? নিজেদেরই তো হারিয়েছেন, বারবার।
আমরা যদি সত্যিই বাঙালি জাতির ভালো চাই, তাহলে প্রশ্ন করি, জেলা পরিষদে বাঙালি কোটায় যে অন্য তিন সদস্য আছেন, তাঁদের কাজের খতিয়ান কোথায়? পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদে যে বাঙালি প্রতিনিধিরা আছেন, তাঁদের নিয়ে কেন কেউ মুখ খোলেন না? কোনোদিন কি কেউ একজন উপজাতীয় সদস্যের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর কাজের হিসাব চেয়েছেন? না। কারণ সেখানে ভয় আছে। আর হাবিবের ক্ষেত্রে ভয় নেই, কারণ তিনি আমাদেরই সন্তান। তাই তাঁর গলাই টিপে ধরা সহজ। এই মানসিকতাই আমাদের পিছিয়ে রেখেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ উপজাতীয় সম্প্রদায়ের আধিপত্য কায়েম হচ্ছে কেন? কারণ আমরা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত। একজন আরেকজনকে টেনে নামাচ্ছি। যতদিন এই আন্তঃকোন্দল থাকবে, ততদিন যতই হাবিব আজমের মতো তরুণ উঠে আসুক, তাঁকে চুপসে দেওয়া হবে। আমরা যদি তাঁর পাশে দাঁড়াতাম, তাঁর গতিরোধ না করতাম, তাহলে আজকের জেলা পরিষদের সদস্য হাবিব আজম কাল আরো বড় দায়িত্বে থাকতেন। বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব আরো শক্তিশালী হতো।
আজ হাবিব আজমের বিরুদ্ধে যারা বিষোদ্গার করছেন, তাঁদের একবার ভেবে দেখা উচিত, তিনি যদি আপনার ব্যক্তিগত উপকার না করেন, তবু তিনি একজন বাঙালি সংগঠন থেকে উঠে আসা তরুণ নেতা, যিনি রাষ্ট্রের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁর পাশে দাঁড়ালে অন্তত একজন বাঙালির কাছে আপনার কথা বলার জায়গা থাকবে। অন্য কোনো দল বা সম্প্রদায়ের নেতার কাছে সে সুযোগ কখনো পাবেন না।
সুতরাং আসুন আমরা একটু থামি। নিজেদের মনের আয়নায় চেয়ে দেখি। আমরা কি সত্যিই বাঙালি জাতির উন্নতি চাই, নাকি শুধু নিজের স্বার্থ আর হিংসার বৃত্তে ঘুরপাক খেতে চাই? হাবিব আজমকে টেনে নামিয়ে আমরা কাউকে জেতাতে পারব না। আমরা কেবল নিজেদেরই হারাব। এই হার থেকে যদি একবারের জন্যও আমরা মুক্তি চাই, তবে আজ থেকেই শুরু করি—একজন বাঙালি আরেকজন বাঙালির পাশে দাঁড়ানো। তবেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সমাজ আলোর মুখ দেখবে। তবেই আমরা সত্যিকারের জাতি হয়ে উঠতে পারব।



