কেন ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রভাবশালী নেতারা মুক্ত বাতাসে ঘুরে?

0
ছবি সংগৃহীত: সন্তু, প্রসীত, নাথান, দেবাশীষ, ইয়েন ইয়েন, মাইকেল

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি বাংলাদেশের সবচেয়ে জটিল, স্পর্শকাতর এবং দীর্ঘমেয়াদি সংকটের একটি। এ অঞ্চলে যখনই কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতার নাম উচ্চারিত হয়, তখনই প্রশ্ন ওঠে, এত অভিযোগ, এত মামলা, এত রক্তপাতের পরও কেন তারা আজও মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? এ প্রশ্নের উত্তর একক কোনো কারণে নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নীতি, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক চাপ, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং স্থানীয় ক্ষমতার সমীকরণের এক বিচিত্র মিশ্রণ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনগুলো (জেএসএস, ইউপিডিএফ, কেএনএফ প্রভৃতি) যেখানে দশকের পর দশক ধরে সংগঠিত, সশস্ত্র এবং প্রশিক্ষিত বাহিনী গড়ে তুলেছে, সেখানে বাঙালি সম্প্রদায় থেকে কোনো সমমানের সশস্ত্র বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তৈরি হয়নি। ফলে পাহাড়ে যা আছে তা হলো একপেশে ক্ষমতার খেলা। যার হাতে বন্দুক আছে, যার পেছনে সশস্ত্র ক্যাডার আছে, সে-ই আজ প্রকাশ্যে হাঁটতে পারে।

সন্তু লারমা ১৯৯৭ সালের চুক্তির পরও অস্ত্র জমা দেননি। চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তিনি আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে উপমন্ত্রী পদমর্যাদা ভোগ করছেন, পুলিশ প্রটোকল পাচ্ছেন। এটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব নয়; এটি রাষ্ট্রের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, চুক্তিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সন্তু লারমাকে “অস্পর্শযোগ্য” করে রাখা।

স্বায়ত্তশাসন দাবির ইউপিডিএফ সংগঠনের সভাপতি প্রসীত বিকাশ খীসার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলার ওয়ারেন্ট আছে। স্থায়ীভাবে বম পার্টি নামে খ্যাত কেএনএফ সভাপতি নাথান বমের বিরুদ্ধে ব্যাংক ডাকাতি, অপহরণ, সেনা-পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ। কিন্তু তাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। এর কারণ কি শুধু ভূখণ্ডের দুর্গমতা? নাকি রাষ্ট্রের আন্তরিক অনীহা?

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে সরকার একটি “নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা”কে মেনে নিয়েছে। অর্থাৎ পুরোপুরি যুদ্ধ নয়, আবার পুরোপুরি শান্তিও নয়। এই অস্থিরতা বজায় রাখতে গেলে কিছু “প্রভাবশালী” নেতাকে মাঠে রাখতেই হবে। তাদের গ্রেপ্তার করলে হয়তো নতুন নেতৃত্ব উঠে আসবে, যারা হয়তো আরো উগ্র হবে, কিংবা বঙালি জনগোষ্ঠী শক্তিশালী হবে হয়তো পার্বত্য সমস্যা মিটে যাবে —এই আশঙ্কা থেকে সরকার “স্ট্যাটাস কো”কে প্রাধান্য দিচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শত শত দেশি-বিদেশি এনজিও কাজ করে। তাদের অনেকেরই এজেন্ডা রাজনৈতিক। কেউ “আদিবাসী অধিকার”, কেউ “সংখ্যালঘু নিপীড়ন”, কেউ “খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচার”কে সামনে রেখে কাজ করে। এই সংগঠনগুলো উপজাতি নেতাদের অর্থ, প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রচারণা এবং কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার সরবরাহ করে।

নাথান বমের কেএনএফ-এর পেছনে মিজোরামের খ্রিষ্টান নেটওয়ার্কের ভূমিকা স্পষ্ট। চাকমা সার্কেল চীপ দেবাশীষ রায়ের দ্বিতীয় স্ত্রী রাখাইন বংশোদ্ভূত ইয়ান ইয়ান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নারী সংগঠন সম্পৃক্ত হচ্ছেন ও আদিবাসী ফোরামে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে “হিরোইন” হয়ে উঠেছেন। এই আন্তর্জাতিক লবিং বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যে, এই নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে “মানবাধিকার লঙ্ঘন”এর অভিযোগ উঠবে। এছাড়াও তাকে ঘিরে স্থানীয় নিরাপত্তা সংস্থা গুলোর নজরদারি, গতিবিধি উপর কার্যক্রম নেই বলে জানা গেছে। ১৯৯৭ সালের চুক্তির পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি সম্প্রদায়কে পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল করা হয়েছে। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, চাকরি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, জমির মালিকানা, সবকিছুতে উপজাতি আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাঙালি তরুণদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠার কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। ফলে পাহাড়ে আজ যা আছে তা হলো উপজাতি জাতীয়তাবাদের একচেটিয়া রাজত্ব।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য সীমান্তের মত বান্দরবানের রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি—এই অঞ্চল ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নেই, পর্যাপ্ত বিজিবি চেকপোস্ট নেই, সীমান্ত সড়কের অভাব আছে। নাথান বম একদিন বাংলাদেশে, পরদিন মিজোরামে। এই সীমান্তের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র, অর্থ ও নিরাপদ আশ্রয় পায়।

সন্তু লারমা, প্রসীত খীসা, নাথান বম, মাইকেল চাকমারা মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কারণ তারা কেবল ব্যক্তি নন, তারা একেকটি রাজনৈতিক প্রজেক্টের প্রতীক। তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা মানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান ক্ষমতার সমীকরণ টিকিয়ে রাখা। যতদিন এই সমীকরণ ভাঙা না হবে, যতদিন বাঙালি সম্প্রদায়কে শক্তিশালী করা হবে না, যতদিন সীমান্ত সুরক্ষিত ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন এই প্রশ্ন থেকেই যাবে:
“এত অভিযোগের পরও তারা কেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে?”
উত্তরটি আমরা সবাই জানি। কিন্তু সাহস করে বলতে বা করতে চাই না।

আগের পোস্টপার্বত্য চুক্তির আদ্যোপান্ত শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় পার্বত্য প্রেক্ষাপটে জ্বালাময়ী বক্তব্য।
পরের পোস্টদীঘিনালার পাহাড়ে বৌদ্ধ বিহারের নামে বাঙালিদের ভূমি দখল চলছে।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন