প্রথমবারের মতো শনিবার (২২ নভেম্বর) সকাল ১০টায় রাঙামাটি প্রেসক্লাব মিলনায়তনে “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আদ্যোপান্ত শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা” অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে ডায়লগ ফর পিস অব চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস (ডিপিসি)।
প্রধান অতিথি লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এস. এম. আইয়ুব বলেন,
“পার্বত্য চুক্তি কেন করা হয়েছে? ভুক্তভোগী কারা, উপকারভোগী কারা? কেন চুক্তি করেছেন? এখানে সামরিক বাহিনীকে পাঠানো হয়েছে শান্তি স্থাপন করার জন্য, প্রতিটি ইঞ্চি জায়গার সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার জন্য। তারা সেটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছে।
আমি আপনাকে বলতে পারি, পার্বত্য চুক্তির আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম সামরিক বাহিনীর কব্জায় ছিল। অপ্রয়োজনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত একটা চুক্তি করা হয়েছে। কেন করা হয়েছে? এটা করা হয়েছে শুধুমাত্র এখানে ভারতের উপস্থিতিটা নিশ্চিত করার জন্য। শেখ হাসিনা, মনে রাখবেন, বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের ঘৃণা করবে সারাটি জীবন। যদি বাংলাদেশে একজন স্বাধীনচেতা লোকও থাকে, আপনাদের কবর রচিত হয়েছে। আর এইদিকে তাকাবেন না—চোখ উপড়ে ফেলা হবে। সেটাই বাস্তবতা। আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি সম্প্রদায়, আমি আশা করি তারা সবাই বুঝতে পারবে যে এখানে সবার প্রতি অবিচার করা হয়েছে, কারো প্রতি সুবিচার করা হয়নি।”

প্রধান আলোচক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ বলেন, “পার্বত্য চুক্তি বাংলাদেশের নাগরিকদের নয়—সে পাহাড়ি হোক বা বাঙালি হোক, কারোরই স্বার্থরক্ষাকারী নয়। এই চুক্তির কোনো বৈধতা নেই। আপনারা যত বড় আইনজীবীই হন না কেন, আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তি তুলে ধরতে পারেন; কিন্তু আমি সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি—এটি একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের মাধ্যমে ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত। পার্বত্য চুক্তি ভারতের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সম্পাদিত।”
এসময় সবচেয়ে আলোচিত ও জ্বালাময়ী বক্তব্য প্রদান করেন জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মো. আইয়ুব চৌধুরী, তিনি বলেন: “মানতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামে যখনই কেউ কোন আইন সম্পর্কে অবগত হয়, তখন তাকে দমিয়ে রাখা হয়। কোনো সাহায্য করা হয় না। বাজার ফান্ড এলাকায় আগে ছিল পাহাড়ি, এখন আছে বাঙালি। এখন আইন একটা জারি করে বন্দোবস্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। আমার গায়ে যদি হাত উঠে, এক হাত এক গালে মেনে নেব; কিন্তু দুই হাতে গলা টিপে ধরবো। সরকার হয়তো মনে করে, এখানে ১৭ কোটি বাঙালি আছে, পার্বত্য ৫/৬ লাখ পার্বত্য বাঙালি মারা গেলে কি! এখন যে প্রজন্ম, তাদেরকে বোঝানো যাবে না; অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হবে। আর হিংসা দিয়ে শান্তি আশা করা যায় না।
এখানে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে হিংসা নাই, কিন্তু কোনো কোনো পাহাড়িদের মধ্যে এত বেশি হিংসা! আমাদের বলে সেদহাবা, হালাহাবা, সেটেলার; আর্মিদের বলে সিদিরে। আমি নিজেকে বলি ‘সেটেলার’। “I am setteler.” আপনি কোন দেশ থেকে আসছেন? মিজোরাম না হয় আসাম থেকে আসছেন, আমি কোথায় থেকে আসছি? আমি এখানকার লোক। আমার শরীরে যে রক্ত, তোমার শরীরেও একই রক্ত। ডিএনএ টেস্ট পরীক্ষা করালে দেখা যাবে ৫০ হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা সবাই আফ্রিকা থেকে এসেছে। যারা পাহাড়ে গেছে তারা ফর্সা, আর যারা সমতলে এসেছে তারা আমার মতো কালো। এই হলো তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য।
আমাদের কিন্তু এত বেশি হিংসা নেই। আপনাদের মধ্যে একটা পাহাড়ি মেয়ে এক বাঙালি ছেলের সঙ্গে ঘুরলে পরে এই মেয়ে ও পরিবারকে অত্যাচার করে। আমি তো বনরূপা বাজারে প্রতিদিন থাকি, কত বাঙালি মেয়ে পাহাড়ি ছেলের সঙ্গে প্রেম করে ঘুরতেছে; আমরা তো দেখি। কখনো তো আমার খারাপ লাগে না। কেন আপনাদের খারাপ লাগবে? আপনাদের মেয়েরা যখন চীনে পাচার হচ্ছে, তখন তো আপনারা প্রতিবাদ করেন না! আর জাপান–অস্ট্রেলিয়ায় পাচার হচ্ছে, এটা নিয়ে কোনো এলিট তো প্রতিবাদ করেন না। কিন্তু যখন একটা পাহাড়ি মেয়ে বাঙালির সাথে প্রেম করে বা বিয়ে করে—তখন আপনারা নিগৃহীত করেন।
লংগদুর একটা ঘটনা জানি, একটা পাহাড়ি মেয়ে যশোরের একটা ছেলেকে বিয়ে করে চলে গেছে। ওই মেয়েকে বাধ্য করছে এখানে চলে আসতে। ৭ দিন ধরে গণধর্ষণ করেছে ওরা। কী লজ্জাজনক! সামাজিক বিচারে আপনারা ধর্ষণের বিচার–সমাধান করেন—ববলতে লজ্জা লাগে আমার। বিচার আপনারা করতে জানেন? বাঙালিরা তো এভাবে বিচার করে না। আপনারা বলেন, বাঙালিরা ধর্ষণকারী! আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারবো পাহাড়িরা প্রতিনিয়ত ধর্ষণ করে। কিন্তু সেটা নিয়ে আপনারা কথা বলেন না।
আপনারা বলেন মিলিটারি ধর্ষণ করছে—বাংলাদেশ মিলিটারি আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশের কাজ করে; কখনো তাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ নেই। এজন্য বলি, আমার ‘রিপ্রেজেন্টেটিভ’ লাগবে—আমি ব্যক্তি আয়ুব না। এখান থেকে প্রতিনিধি লাগবে, শান্তি এগিয়ে নেওয়ার জন্য। তা যদি না হয়, তাহলে মিলিটারি লাগবে। তা কি আপনারা পারবেন?
এই যে অস্ত্র আসতেছে—অস্ত্র কোথায় থেকে আসে? মায়ানমার ও ভারত থেকে আসে। কিসের টাকা দিয়ে? বাঙালি ঠিকাদারদের চাঁদাবাজির টাকা দিয়ে। ওদের কাছে জোর করে গলা টিপে চাঁদা নেয়; গাছ ব্যবসায়ীদের থেকে টাকা নেয়। আপনারা বলেন এগুলো? বলতে পারেন না। সহজ করে বলেন আমার মত; তাহলে বুঝবো যে আপনারা শান্তি চান।
এই শান্তি চুক্তি হওয়ার পরে কারো কাছে অস্ত্র থাকার কথা না। গত বৃহস্পতিবার যখন এখানে হরতাল ডাকলো—সেনাবাহিনীর একটা স্কুল ‘লেকাস পাবলিক’; কিন্তু তারা চালু রেখে পরীক্ষা নিয়েছে। আন্দোলনে ছুরি মারছে। পাহাড়িরা বলে থাকে সেনাবাহিনী বাঙালির পক্ষে থাকে—অবশ্যই না। আমি ‘সাফারার’, I’m sufferer—সব বাঙালি sufferer। বাংলাদেশ আর্মি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে যে রাষ্ট্রের প্রশাসন আছে—বাঙালি sufferer.
গ্রামে থাকেন পাহাড়িরা বেশি। শান্তিবাহিনী, কুকি–চিন, আরো কি আছে এদের হাতে পাহাড়িরা ক্ষতিগ্রস্ত। এমনও শুনেছি কোনো বাসায় যদি সুন্দরী মেয়ে থাকে, ওই সুন্দরী মেয়ের জন্য পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ট্যাক্স দিতে হয়।
যদি চুক্তি হয়ে থাকে, চুক্তি আপনারাও পড়েছেন, আমিও পড়েছি—অস্ত্র জমা দেওয়ার কথা; কারো কাছে অস্ত্র থাকার কথা না। এখন যদি কোনো পাহাড়ির কাছে অস্ত্র থাকে, সমতলে অস্ত্র থাকলে যেরকম ক্রসফায়ার দেয়, সেইরকম ক্রসফায়ার দিলে অস্ত্র থাকবে না। সরকার অনেকভাবে চেষ্টা করেছে আর সম্ভব না।
একটা সলিউশন আছে, মিলিটারি ও রাজনৈতিক সলিউশন। পাহাড়িদের হাতে অস্ত্র আছে—বাঙালিরাও অস্ত্র তুলে নেবে। সেনাবাহিনী আমাদেরকে সাপোর্ট করছে না—আমি যতটুকু দেখেছি। এখানে মিলন বড়ুয়া আন্দোলন করছে; জাহাঙ্গীর আলম মুন্না একসময় পালিয়ে যেতে হয়েছে ওদের ভয়ে। ৯২ সালে যে মারামারি হয়েছে—২০ জনের তালিকায় তার নাম দিয়েছে।
ওই গত ২০ নভেম্বর আন্দোলন হলো, ওখানে একটা পাহাড়ি মেয়ে পুলিশ–সদস্য চট্টগ্রাম থেকে আসছে চিঠি দেওয়ার জন্য। সে কিন্তু জানে পরিস্থিতি। সে সুন্দর করে আন্দোলনকারীদের পরিচয় দিয়ে বলতে পারতো—‘আমি পুলিশের লোক, চিঠি নিয়ে এসেছি।’ সেখানে সেনাবাহিনী ছিল। তুমি গোয়েন্দার লোক না—পরিচয় দিতে পারতে। তুমি সিভিলে তাদের সাথে উগ্র আচরণ করে হেনস্তার শিকার হয়েছো—আর তাদের মারতে চাও।
এই যে আমাদের সার্কেল চিফ বা রাজা—যদিও আমি ওনার সনদ পেয়েছি, কিন্তু আমাদের অনেক বাঙালি পাচ্ছে না। তারা জায়গা–জমি ক্রয়–বিক্রয় বা চাকরিসহ বিভিন্ন কাজে হয়রানির শিকার হচ্ছে। একটা বৈষম্য। এটা নিয়ে কীভাবে রিপোর্ট করা যায়?
আমি তখনকার সময় সেনাবাহিনী কর্তৃক—বিএনপি কর্তৃক—নিগৃহীত হয়েছি। ১ বছর রাঙামাটি আসতে পারিনি। পার্বত্য চুক্তি আমি নিগৃহীত হয়ে সুবিধা ভোগ করতে পারিনি। আজকে পাহাড়িরা সেই সময় সরকার ও অন্যান্যরা সুবিধা ভোগ করেছে—কিন্তু আমার তো কোনো বেনিফিট হয়নি। আমি তো কোনো রাজনৈতিক সুবিধা পাইনি, কোনো প্রশাসনিক সুবিধা পাইনি—আমি কিছুই পাইনি।
আজকে প্রোগ্রামে আপনারা কথা বলেছেন, এখন আমার কথাগুলো আমি বলবো। সময় ১টা পর্যন্ত আছে। এই দেখুন, পার্বত্য চুক্তি—সন্তু মারমা স্বাক্ষর করেছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে। তিনি কি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করেন? এখানে আমার কথা বলেছেন? অবশ্যই না।
এটা ভারতের একটা ষড়যন্ত্র। রাওয়াতে মনীষ দেওয়ান বলেছে—’পার্বত্য চুক্তি হয়েছে; শান্তিবাহিনী কাজ করছে’। এটার জন্য আমাদের সরকার বা সেনাবাহিনীও দায়ী। কারণ ২৪ ডিভিশন চট্টগ্রাম থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়—পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্রিগেডগুলো। ওখান থেকে যা বলা হয়, সরকার তা শোনে। সরকার সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দিয়েছে—সেনাবাহিনী যেভাবে বলে সরকার সেভাবে চলে।
এই চুক্তি করার সময় সেনাবাহিনী স্থানীয় বাঙালি প্রতিনিধিদের রাখেনি। এজন্য এই চুক্তি ২৮ বছর না—২৮ হাজার বছরেও সম্পূর্ণ বাস্তবায়নযোগ্য নয়। এই চুক্তিতে যতটুকু বলা হয়েছে—স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে। উপজাতি বলা হয়েছে—এখন আবার আদিবাসী দাবি করে। আদিবাসীতে আমরা কখন আসলাম? ২০০৭ সালে।
ঠিক আছে পাহাড়ি বন্ধুরা, তোমাদের আমি আদিবাসী স্বীকৃতি দেব। যাদের সাথে আন্দোলন করছো, তারা আগে ভারত থেকে স্বীকৃতি নিয়ে আসো। ভারতে হাজার হাজার উপজাতি আছে—পাকিস্তানেও আছে। একসময় তোমরা পাকিস্তান ও ’৪৭ সালে ভারতের সাথে থাকতে চেয়েছিলে। কিন্তু ৫৬ হাজার বর্গমাইলের জন্য বাঙালিরা জীবন দিয়েছে।”
ডিপিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক হারুন অর রশীদ এর সভাপতিত্বে গোল টেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) এস এম আইয়ুব। প্রধান আলোচক ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটি সংসদীয় আসনের জামাতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোক্তার আহমেদ, অ্যাভোকেট প্রতিম রায় পাম্পু, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মো. আইয়ুব চৌধুরী, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মামুনুর রশিদ মামুন, এনসিপি রাঙামাটির সভাপতি বিপিন জ্যোতি চাকমা, অ্যাডভোকেট আব্দুল মালেক মিন্টু, অ্যাডভোকেট মিহির বরণ চাকমা, এবং দৈনিক ইনকিলাবের এডিটরিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট সৈয়দ ইবনে রহমত। অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গ এবং গণমাধ্যমকর্মীরাও এতে অংশগ্রহণ করেন।



