রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের মূল ফটকের সামনে ক্রিকেট খেলা খেলেছে কোটা বিরোধী ঐক্যজোট, রাঙামাটি সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সচেতন। ব্যাট-বলের শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে “কোটা বৈষম্য বন্ধ করো”, “মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ চাই” স্লোগান। কোটা বিরোধী ঐক্যজোট, রাঙামাটির সাধারণ শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকবৃন্দ ২৪ নভেম্বর জেলা পরিষদের কার্যালয় শাটডাউন করে এই প্রতীকী প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এ ঘটনা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাঙামাটিতে চলমান কোটা বিতর্কের সর্বশেষ অধ্যায় মাত্র।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫৩০টি সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় গত বছর। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ১৪ নভেম্বর ২০২৫ পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। এই নিয়ে কোটা বিরোধীরা সচেতন নাগরিক ঐক্যের ব্যানারে নির্মল বড়ুয়া ও কামাল উদ্দিনদের নেতৃত্বে স্মারকলিপি দিতে গেলে পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার ছবি তুলতে আপত্তিসহ অসৌজন্যমূলক আচরণ করে৷ পরে কোটা বিরোধী আন্দোলনের চাপে পরীক্ষা একাধিকবার স্থগিত হয়। ১৮ নভেম্বর পুনরায় ২০ নভেম্বর তারিখ ঘোষণা করা হলে ২০-২১ নভেম্বর দুই দিনের হরতাল ডাকা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০ নভেম্বর আবার স্থগিত করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি: ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৯৩% মেধা ও মাত্র ৭% কোটা (মুক্তিযোদ্ধা ৫%, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ১%, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গ ১%) প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ এই প্রজ্ঞাপন মানতে রাজি নয়। তাদের যুক্তি: ১৯৮৯ সালের জেলা পরিষদ আইন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ মর্যাদা ও ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির আলোকে প্রণীত আইনে উপজাতীয়দের “অগ্রাধিকার” দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাঙালিরা বলছেন, পরিষদের আইনে শুধু পরিষদের নিজস্ব জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল; হস্তান্তরিত দপ্তরে নয়।
সম-অধিকার আন্দোলন, কোটা বিরোধী ঐক্যজোট ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন,
“২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে কোটা প্রথা প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু পার্বত্যাঞ্চলে এখনো উপজাতীয় কোটা নামে একটি গোষ্ঠীকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে জেলা পরিষদে ৭০% এর বেশি পদ উপজাতীয় প্রার্থীরা পাচ্ছেন, যার মধ্যে আবার চাকমা সম্প্রদায়ই সিংহভাগ দখল করছে। বাঙালি (হিন্দু-মুসলিম-বড়ুয়া মিলিয়ে) মাত্র ৩০% এর নিচে সুযোগ পাচ্ছে। এটা স্পষ্ট বৈষম্য।”
১৬ নভেম্বর সম-অধিকার যুব পরিষদের র্যালি, ১৭ নভেম্বর সচেতন নাগরিক ঐক্যের স্মারকলিপি প্রদান, ১৯ নভেম্বর হরতালের ডাক একের পর এক কর্মসূচি তারই প্রমাণ।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার স্পষ্ট জানিয়েছেন, “মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন নয়, আমরা চলব আমাদের নিজস্ব আইনে।” ২৪ নভেম্বর প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের বিস্তারিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়।
তারা যে আইন ও চুক্তির কথা বলছেন,
– ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির ১৮ নং অনুচ্ছেদ: পার্বত্যাঞ্চলে সরকারি-আধাসরকারি পদে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার।
– ১৯৮৯ সালের পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ধারা ৩২(২): তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার।
– ২০০০ সালের হস্তান্তরিত দপ্তর সংক্রান্ত আইন: উপজাতীয় ও অ-উপজাতীয়দের মধ্যে সংখ্যানুপাত যথাসম্ভব বজায় রাখতে হবে।
– ২০১৩ সালের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন: পার্বত্য চুক্তির আলোকে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকারই বহাল।
আঞ্চলিক পরিষদের ভাষ্য: “দেশের সাধারণ কোটা ব্যবস্থা কখনো পার্বত্যাঞ্চলে প্রযোজ্য হয়নি, হবে না। এখানকার বিশেষ শাসনব্যবস্থা ব্রিটিশ আমল থেকেই চলে আসছে।”
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০ নভেম্বর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ২০২৪-এর কোটা সংস্কার পার্বত্য জেলায় প্রযোজ্য হবে কি না, তা এখনো আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের অপেক্ষায়। তারা মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে স্বচ্ছ নিয়োগ চান, কিন্তু স্থানীয় আইনকেও অস্বীকার করছেন না। তবে মন্ত্রণালয় জেলা পরিষদের সমালোচনাও করেন।
বাস্তবতা কী বলে?
– রাঙামাটির জনসংখ্যা: উপজাতীয় ৫২-৪৮%, বাঙালি ৫০% এর বেশি (বিভিন্ন সূত্রে সামান্য ভিন্নতা আছে)।
– নিয়োগে বর্তমান অনুপাত: উপজাতীয় ৭০%+, বাঙালি ৩০%-এর নিচে।
– খাগড়াছড়িতে একই ইস্যুতে স্থগিত হয়েছে রিট পিটিশনের কারণে। রাঙামাটিতে এখনো কেউ আইনি পথে যাননি।
সমাধান কোথায়?
এক পক্ষ বলছে, “পার্বত্য চুক্তি ও বিশেষ মর্যাদা রক্ষা করতে গেলে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার থাকবেই।” অন্য পক্ষ বলছে, “২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা অনুযায়ী সারা দেশে মেধাই একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত। এবং হস্তান্তরিত দপ্তরে কোটা প্রযোজ্য নয় জনসংখ্যা অনুযায়ী হবে।”
এই দ্বন্দ্ব আসলে শুধু কোটার নয়, এটা পরিচয়, অধিকার ও সম্পদ বণ্টনের দ্বন্দ্ব। যতদিন আইনি স্পষ্টীকরণ না আসছে এবং রাজনৈতিক সমঝোতা না হচ্ছে, ততদিন রাঙামাটির রাস্তায় ক্রিকেট খেলা আর স্লোগান চলতেই থাকবে বলে মনে করেন অনেকেই।
প্রশ্ন থেকে যায়, মেধা ও বৈষম্য নিরসনের সমতার দাবি, নাকি বিশেষ মর্যাদা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, কোনটি এগিয়ে থাকবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়োগ নীতিতে?
সচেতন মহলের মতে, নিয়োগ যদি সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক (১০০% বা ৯৩%) করা হয়, তবে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তারা অধিক সংখ্যায় নির্বাচিত হবে। এতে অন্যান্য ছোট উপজাতিরা বঞ্চিত হবে। একইভাবে পার্বত্য রাঙামাটিতে বাঙালিদের গড় শিক্ষার হার তুলনামূলক কম হওয়ায় বাঙালিরাও বঞ্চনার শিকার হবে।
এই কারণে সচেতন মহল বলছেন,
উপজাতি (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও অন্যান্য) এবং বাঙালি (হিন্দু, মুসলিম, বড়ুয়া) উভয়ের জন্য ৫০:৫০ অনুপাত নির্ধারণ করা হলে বর্তমান বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, জেলা পরিষদের চাকমা নেতৃত্ব নিয়োগবণ্টনে ‘বানরের রুটির ভাগের’ মতো আচরণ করছে। তারা প্রথমে চাকমাদের জন্য ৩৫ থেকে ৪০-৪৫ শতাংশ কোটা নিশ্চিত করে, এরপর মারমা, ত্রিপুরা ও অন্যান্য উপজাতিদের অংশ দিতে গিয়ে বাঙালিদের কোটায় হাত দিচ্ছে। এর ফলে মোট উপজাতি কোটা ৫০ শতাংশ অতিক্রম করে ৭০ শতাংশে পৌঁছে যাচ্ছে, যা স্পষ্ট বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে।
সচেতন মহলের প্রস্তাব:
উপজাতিদের ৫০ শতাংশ কোটার মধ্যে সুষ্ঠু বণ্টন:
চাকমা: ২০%
মারমা: ১৫%
ত্রিপুরা: ৫%
অন্যান্য উপজাতি: ১০%
বাঙালিদের ৫০ শতাংশ কোটার মধ্যে বণ্টন:
মুসলিম বাঙালি: ৪০%
হিন্দু: ৬%
বড়ুয়া: ৪%
তাদের মতে, এই কাঠামো বাস্তবায়ন করা হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও উত্তেজনা অনেকাংশে কমে আসবে, এবং সকল জাতিগোষ্ঠী সমতার ভিত্তিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।



