পার্বত্য চট্টগ্রামের রুক্ষ পথ, পাহাড়ি নদীর গর্জন আর বনের ভিতর লুকিয়ে থাকা অন্ধকার আজ আর কল্পকাহিনি নয়; এটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবের মাঝে গেঁথে থাকা দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণের স্মারক। যাদের চোখে একসময় পাহাড় ছিল শান্ত, নীরব এবং পর্যটকের স্বর্গ, তারা আজ সোশ্যাল মিডিয়ার এক টুকরো ছবিতেই থমকে যায়। কারণ সত্য আর চাপা থাকে না, সত্য নিজেই নিজের পথ খুঁজে নেয়, যেমনটি দেখা গেল খাগড়াছড়ির পানছড়ির চেঙ্গী ইউনিয়নের পাড়াকেন্দ্র স্কুলের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে থাকা এক সশস্ত্র ব্যক্তিকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে।
পাড়াকেন্দ্র স্কুল, একটি সাধারণ বিদ্যালয়, যেখানে শিশুদের কণ্ঠস্বর ভেসে আসার কথা ছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক সশস্ত্র ব্যক্তি। তার কাঁধে ঝোলানো অসংলগ্ন ব্যাকপ্যাক, হাতে ধরা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, যার উপস্থিতি পাহাড়ের প্রাত্যহিক অস্থিরতার নগ্নতম প্রমাণ। এটি কোনো মিয়ানমার কিংবা কম্বোডিয়ার গেরিলা জঙ্গলের ছবি নয়; এটি বাংলাদেশের একটি সরকারি প্রকল্পের পরিচালিত স্কুলের সামনের বাস্তব চিত্র। পাহাড়ের মানুষ এই দৃশ্য নিত্যদিন দেখলেও সমতলের মানুষের কাছে এটি ছিল অনেকটা অবিশ্বাসের মতো। কিন্তু এখন আর সেই অস্বীকারের সুযোগ নেই, কেননা এটাই সত্য।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সরকার এবং জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করে। উদ্দেশ্য ছিল, দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী অস্ত্রবাজির অবসান, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং পাহাড়ের উন্নয়নের পথ সুগম করা। চুক্তিতে ছিল ৭২টি মূল ধারা ও ৯৯টি উপধারা। সেখানে জেএসএস ও উপজাতি জনগোষ্ঠীকে দেওয়া হয়েছিল বহু সুবিধা, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও বিশেষ অঞ্চলভিত্তিক অধিকার, এগুলো অনেকের চোখে সংবিধান পরিপন্থী বলেও বিবেচিত হয়েছে।
সরকার বলছেন, চুক্তির ৭২টি ধারা থেকে ৬৫টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত, ৪টি ধারা আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে বাকি ৩টি ধারা প্রক্রিয়াধীন। পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও শতভাগ চুক্তি বাস্তবায়নের নজির নেই৷ তারপরও পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন হয়েছে প্রায় ৯০.২৭%। এরপরও জেএসএস কেন সশস্ত্র সদস্য রাখবে?
কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল একটি মাত্র মৌলিক শর্ত,
চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে জেএসএসকে সমস্ত অবৈধ অস্ত্র জমা দিতে হবে। এটাই ছিল শান্তির মূল চাবিকাঠি। এটাই ছিল রাষ্ট্রের মূল প্রত্যাশা। সেসময় জেএসএস ভাঙা মরিচাধরা কিছু অস্ত্র জমা দিয়ে বর্ণিত সুবিধা আদায় করে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২৮ বছর পরও পাহাড়ে যদি জেএসএস-এর পোশাকে সশস্ত্র লোকজন ঘুরে বেড়ায়, যদি পাহাড়ের প্রতিটি স্থানে ভয়, চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে চুক্তির মূল উদ্দেশ্য কোথায়? কে নিল তার দায়? জেএসএস? নাকি সরকার?
২০১৩ সালে চমকপ্রদভাবে, রাঙামাটিতে নিজের বাসভবনে বেসরকারি টিভি চ্যানেল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সাংবাদিক শামীম বিনতে-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেএসএস নেতা ও চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমা নিজেই স্বীকার করেন: “আমাদের জেএসএস-এর এখনো কয়েক শতাধিক সশস্ত্র জনবল রয়েছে। আমরা সীমিত করেছি কিন্তু অস্ত্র সম্পূর্ণ জমা দিইনি। ইউপিডিএফ মোকাবেলায় এগুলো লাগবে।”
এর চেয়ে বড় স্বীকারোক্তি আর কী হতে পারে?এটি সরাসরি চুক্তিভঙ্গের ঘোষণা। এটি শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি উপহাস। এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ।
তাহলে প্রশ্ন হলো: সন্তু লারমার এই বক্তব্যের পরও সরকার তাকে জবাবদিহির আওতায় আনলো না কেন? এটি কি রাষ্ট্রের দুর্বলতা? নাকি ইচ্ছাশক্তির অভাব?
কারণ যদি চুক্তি স্বাক্ষরকারী পক্ষ প্রকাশ্যে বলে যে তারা অস্ত্র রাখবে, তাহলে সেই চুক্তি তো কার্যত অকার্যকর।
স্কুলের সামনে সশস্ত্র উপস্থিতি একটি ভয়ংকর বার্তা প্রদান করে। ছবির পটভূমিতে স্পষ্ট বাংলা লেখা,
“পাড়াকেন্দ্র স্কুল—জগৎ মোহন পাড়া—টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান প্রকল্প—পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড”
এর নিচে আরও নাম, ঠিকানা। অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে তোলা ছবি।
এই দৃশ্যে আর কোনো ‘ভিনদেশি গেরিলা’ তকমা লাগানোর সুযোগ নেই। রিমার স্ক্যানারও এটিকে অন্য দেশের ছবি বলে চালাতে পারবে না। এটি সম্পূর্ণ, নিখাদ, নগ্ন, ভয়ংকর বাংলাদেশের পাহাড়ের বাস্তবতা।
স্কুলের সামনে যদি সশস্ত্র উপস্থিতি থাকে?
তাহলে শিশুরা কি নিরাপদ? শিক্ষকরা কি নিরাপদ? গ্রামের সাধারণ মানুষ কি হুমকির মুখে নয়?
পাহাড়ে বসবাসকারী অনেক বাঙালি ও পাহাড়ি পরিবার প্রতিদিন এই আতঙ্কে দিন কাটায়। সামাজিক মাধ্যমে না ছড়ালে সমতলের মানুষ এই চিত্র দেখতোই না। যেন পাহাড়ের সত্য ঢাকা পড়ে থাকায় সুবিধা হয়: কেবল তাদের, যারা এই ভয়কে পুঁজি করে রাজনীতি, চাঁদাবাজি, নিয়ন্ত্রণ ও দখলের খেলা চালায়।
চুক্তির লক্ষ্য বনাম বাস্তবতা, চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল: অস্ত্রহীন পরিবেশ, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, উন্নয়ন ও শিক্ষা, সামাজিক স্থিতিশীলতা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো: সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য, নিয়মিত চাঁদাবাজি, অপহরণ ও টার্গেট কিলিং, সাধারণ মানুষের মাঝে ভীতি, রাজনৈতিক বিভক্তি ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা।
এখন প্রশ্ন জাগে, সশস্ত্র উপস্থিতি যদি চুক্তির পরও থাকে, তাহলে এই চুক্তি কাদের জন্য কার্যকর হয়েছে?
কেবল প্রশাসনিক সুবিধা যাদের হাতে গেছে তাদের জন্য? নাকি সাধারণ পাহাড়বাসীর জন্য, যারা এখনো রাতে পাহাড়ি পথ দিয়ে হাঁটতে ভয় পায়?
সরকারের নীরবতা: নাকি ব্যর্থতা? রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল, যারা অস্ত্র জমা দেয়নি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
কিন্তু ২৮ বছর ধরে রাষ্ট্র সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি।
জেএসএস, ইউপিডিএফ বা কেএনএফ কোনো সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধেই রাষ্ট্র ‘চুক্তিভঙ্গকারী পক্ষ’ হিসেবে কঠোর অবস্থান নেয়নি।
এটি কি রাষ্ট্রের কৌশলগত নীরবতা?
নাকি ভয়? নাকি আন্তর্জাতিক চাপ?
নাকি রাজনৈতিক সমীকরণ?
যে কারণই হোক, হতভাগ্য পাহাড়ের সাধারণ মানুষ রক্ত দিয়েই দাম পরিশোধ করছে।
সত্যের সামনে দাঁড়ানোর সময় এখনই।আপনি বলেছেন,“আমি মিথ্যাচারের পুজারি নই, সত্যের পুজারি।” এই সত্য আজ ভয়ংকর। এই সত্য আজ অস্বস্তিকর। এই সত্য আজ রাষ্ট্র ও চুক্তির ব্যর্থতা প্রকাশ করে। চুক্তির দুই যুগ পরও যদি একটি স্কুলের সামনে সশস্ত্র লোকজন ঘুরে বেড়ায়, তাহলে সেই চুক্তিকে শান্তির প্রতীক বলা যায় না। এটি বরং অসম্পূর্ণতা, স্ববিরোধিতা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার জীবন্ত স্মারক।
এখন সময় এসেছে, চুক্তির পূর্ণ পর্যালোচনা করার। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র জমাদান নিশ্চিত করার। বাঙালি ও পাহাড়ি উভয় জনগোষ্ঠীর সমতা ভিত্তিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার। এবং পাহাড়কে পাহাড়বাসীর জন্য শান্তির অঞ্চল হিসেবে পুনর্গঠন করার। পাহাড়ে শান্তির প্রত্যাশা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠা সত্য স্বীকারের মাধ্যমেই শুরু হয়, মিথ্যার গালিচা দিয়ে নয়।



