পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাসিন্দা দীপঙ্কর প্রসাদ চাকমা ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর সশস্ত্র শাখার একজন সদস্য। জেএসএস এর সশস্ত্র শাখা‘টি পাহাড়ে অস্ত্রধারী হিসেবে আবির্ভাব হয়েই তারা পাহাড়িদের কাছে শান্তিবাহিনী হিসেবে নিজেদের অভিহিত করে। দীপঙ্কর প্রসাদ চাকমার মতে শান্তিবাহিনীর বহু সদস্য ১৯৮০ এবং ৯০’র দশকে পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উপর হামলা, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ জড়িয়ে পড়ে ছিলো। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে তাদের এই রেশ প্রায় দুই দশকের সশস্ত্র লড়াইয়ের ইতি হয়েছিল এতো বহু হতাহত ও নিহতের ঘটনা ঘটে।
১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর এক পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে চুক্তির পূর্বেকার পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। চুক্তির দুই মাস পরে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অস্ত্রসমর্পণ করেছিল শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। এরপর শান্তি বাহিনীর সদস্য’রা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিও দেশের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবে বলে আশ্বাস প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলো। পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে। সেই সময় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষে স্বাক্ষর করেন পাহাড়ের গেরিলা (শান্তিবাহিনী) সশস্ত্র নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, যিনি সন্তু লারমা হিসেবে সু-পরিচিত। শান্তিবাহিনীর যারা অস্ত্রসমর্পণ করেন অর্থাৎ চুক্তির পূর্বেকার হিসাবসহ ১৯৪০টি অস্ত্র জমা দেন। চুক্তিতে যারা অস্ত্র জমা দেন তাদের প্রত্যেককে বাংলাদেশ সরকার সাধারন জীবনে ফিরে আসায় ৫০ হাজার টাকা উপহার দিয়েছিলো। সেই সময় সশস্ত্র সদস্যদের মধ্যে হতে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে ৭২৪ জনবল নিয়োগ করা হয় যারা প্রত্যেকে নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ছিলো। তবে পাহাড়ের ভবিষ্যতে শান্তি ফিরানোর চেষ্টায় সেই সব অপরাধ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে তাদের চাকরি প্রদান করা হয়েছিলো।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলো। চুক্তির মোদ্দা কথা কথা ছিল, পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং সে জন্য বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এবং আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিন পার্বত্য জেলার স্থানীয় সরকার পরিষদ সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হবে এবং সেটি করা হয়েছে। উপজাতীয় আইন এবং সামাজিক বিচারকাজ এই পরিষদের অধীনে থাকতে হবে বলা হয়েছে। একটি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হবে। যারা বিরাজমান পরিস্থিতে পালিয়ে গিয়ে ছিলো সেসব উপজাতীয়দের ভূমির মালিকানা অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়া হবে, সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হলেও জেএসএস ও ইউপিডিএফ এর অস্ত্র অবাধ ব্যবহার চলমান রয়েছে। এই চুক্তি পাহাড়ের বাঙালি সম্প্রদায় মারাত্মক ভাবে অধিকার বঞ্চিত হয়েছিলো। তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চাপে পাহাড়ের বাঙালি কোনঠাসা ছিলো। এই চুক্তি বাঙালি অধিবাসীদের জীবন মান উন্নয়নসহ নানা অধিকার খর্ব করা হয়েছে। সেই বিষয়ে রাষ্ট্রের উদাসিনতা এখন দেখা যাচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে অর্জন:
দুই দশকের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান। জেএসএস (জনসংহতি সমিতি) এর একটি অংশ বাংলাদেশ সরকারের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে সশস্ত্র জীবন থেকে সাধারন জীবনে ফিরে আসা। যার ফলে পাহাড়ে সহিংসতা, গেরিলা সংঘাত ও অস্ত্রধারী তৎপরতা ধীরে ধীরে কমেছে। পাহাড়ের জন্য প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্টান, আঞ্চলিক পরিষদ গঠন। স্থানীয়দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য বিকেন্দ্রীকৃত শাসনব্যবস্থা নীতি গ্রহন করা। পাহাড়েরর ভূমি বিরোধ নিরসনের উদ্যোগে পার্বত্য ভূমি কমিশন গঠন। শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসনে ভারত থেকে আসা প্রায় ৬৪ হাজার উপজাতী শরণার্থীর প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন সম্পন্ন। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন প্রক্রিয়া গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া। পাহাড়ের শান্তি বজায় রাখতে সশস্ত্র গেরিলা আক্রমণ ঠেকাতে যে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে সেগুলো প্রত্যাহার করা। পাহাড়ের উন্নায়নে রাস্তাঘাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের উন্নয়ন সম্ভব করা হয়। পাহাড়ের উপজাতীদের সংস্কৃতি, পরিচয় রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহন করা। পাহাড়িদের মাতৃভাষায় শিক্ষা, প্রথাগত নেতৃত্ব ব্যবস্থা ও রীতি-নীতি রক্ষার কাজ করা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অপূর্ণতা:
শান্তি চুক্তির ২৮ বছরেও পাহাড়ে স্বতঃস্ফূর্ত চুক্তির সকল ধারা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সরকারের সদিচ্ছা থাকার পরও সকল চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়ে উঠেনি। এর জন্য প্রদান বাঁধা হয়ে উঠছে পাহাড়ের কয়েকটি সশস্ত্র গ্রুপ। পাহাড়ে অস্ত্র ব্যবহার এখনো বন্ধ করতে পারেনি সরকার। সরকার বড় ধরনের কোন অস্ত্র উদ্ধারে বড়সড় কোন অভিযান না করার ফলেই পাহাড়ে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর আধিপত্য বেড়েছে দিনদিন। ভূমি বিরোধ এবং ভূমি পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত বিষয় গুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এতে করে চুক্তির যে ধারা সেগুলো পূর্ণ বাস্তবায়ন করা পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পরে। চুক্তিতে পাহাড়িদের সুযোগ সুবিদা প্রদান করা হলেও বাঙালিদের প্রতি করা হয়েছে চরম বৈষম্য । শিক্ষা, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বৈষম্য পাহাড়ে বিদ্যমান ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা:
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশের সকল মানুষকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করতে হবে। পাহাড়ের বাঙালি সম্প্রদায় ও উপজাতীর ১২ টি সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ মূলক আলোচনা। স্থানীয় জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দিয়ে পরিষদ গঠন সুযোগ করে দেওয়া। পাহাড়ের পরিস্থিতি নিয়ে দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্র রয়েছে সেগুলো সম্পর্কে সকল সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ মূলক সভা করে সেসব বিষয়ে উত্থাপিত করা। পাহাড়ের অস্থিতিশীল করার যেকোনো অপচেষ্টা মোকাবেলা করতে হবে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। পাহাড়ের সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং বৈষম্য দূর করতে হবে। পাহাড়ে কোটা পদ্ধতি বাতিল করতে হবে। দ্রুত সময়ের সীমান্ত সড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রতি ৫০০ মিটার এর মধ্যে বিজিবি ভিপিপোস্ট স্থাপন করা। বিশেষ করে পাহাড়ের সীমান্ত গুলো অরক্ষিত রয়েছে। সে-সব জায়গা গুলো দিয়ে অবৈধ অস্ত্র রসদ সরবরাহ করা হয়। এছাড়াও অনায়াসে বাঁধা বিপত্তিহীন ভাবে সীমান্তের নজরদারি বাড়ানোসহ সড়ক প্রশস্থ করন করা। যে সকল সেতু গুলো রযেছে সেগুলো বেইলি সেতুতের পরিবর্তে পাকা সেতুতে রুপান্তর করা। পাহাড়ের যেকোন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করা। পাহাড়ে সশস্ত্র গ্রুপ গুলো সড়কে গাছ কেটে সড়কে যানচলাচল বাঁধাগ্রস্ত করা করছে আমরা দেখছি এজন্য প্রতিটি ক্যাম্প অত্যাধুনিক গাছ কাটার সরাঞ্জম সংগ্রহে রাখা। পাহাড়ে চাঁদাবাজি হচ্ছে সে-সব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে চাঁদাবাজ বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ের সকল সম্প্রদায়ের মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এছাড়াও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন খাতকে উন্নত করতে হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি পাহাড়ের প্রতিটি ঝর্ণা গুলোকে পর্যটন বান্ধব ঘরে তুলতে হবে। এতে করে সারাদেশের মানুষের অবাধ চলাচল সুযোগ সৃষ্টি হবে অন্যদিকে পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে পর্যটন শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে এতে করে তারা অর্থনীতিক লাভবান হবে অন্যদিকে তাদের প্রজন্মকে
শিক্ষার বিকাশে উৎসাহ করতে পারবে। সশস্ত্র গ্রুপে অংশগ্রহণ কমে আসবে।



