২রা ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে সই হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। দীর্ঘ দুই দশকের সংঘাত, রক্তপাত ও অস্ত্রের ঝনঝনানির অবসান ঘটিয়ে পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়। তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) সই করেন এই ঐতিহাসিক দলিলে।
চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে সরকারি হিসেবে ৬৫টিই পূর্ণ বাস্তবায়িত। বাকিগুলোর অনেকগুলো প্রক্রিয়াধীন বা চলমান। কিন্তু ২৮ বছর পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি জনগোষ্ঠী এই চুক্তিকে ‘শান্তির চুক্তি’ বলতে রাজি নন। তাদের কাছে এটি একটি ‘বৈষম্যের দলিল’, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং উপজাতীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
এই ব্লগে আমরা দেখবো:
চুক্তির কোন কোন ধারা সংবিধানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক? বাঙালিদের প্রতি কীভাবে বৈষম্য করা হয়েছে? এর ফলে কী ধরনের উপজাতীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে? এবং সবশেষে, কীভাবে এই চুক্তিকে সংশোধন করে সকলের জন্য গ্রহণযোগ্য করা যায়?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে: “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” কিন্তু চুক্তির বহু ধারা এই সমতার নীতিকে ভূলুণ্ঠিত করে।
ক. পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদে নেতৃত্ব বাধ্যতামূলকভাবে উপজাতীয়
খ-৮: অনুপস্থিতিতে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন একজন উপজাতীয় সদস্য।
গ-২ (আঞ্চলিক পরিষদ): চেয়ারম্যান অবশ্যই উপজাতীয় হবেন, পদমর্যাদা প্রতিমন্ত্রীর সমতুল্য।
এটি সংবিধানের ২৭ ও ২৯ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ জন্মগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে পদ থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
খ. ভূমি ব্যবস্থাপনায় বৈষম্যমূলক বিধান
খ-৬৪ (ক): পার্বত্য জেলায় কোনো খাসজমি ইজারা, বন্দোবস্ত বা হস্তান্তর করতে হলে পার্বত্য জেলা পরিষদের পূর্বানুমোদন লাগবে।
খ-৬৪ (খ): সরকার নিজেও পরিষদের সম্মতি ছাড়া কোনো জমি অধিগ্রহণ করতে পারবে না।
এর ফলে রাষ্ট্রের ভূমি ব্যবস্থাপনার সার্বভৌম ক্ষমতা একটি স্থানীয় সংস্থার হাতে চলে যায়। সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদে সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে সকল নাগরিকের জন্য, কিন্তু এখানে বাঙালি নাগরিকরা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত।
গ. পুলিশ নিয়োগে উপজাতীয় অগ্রাধিকার
খ-৬২: সাব-ইন্সপেক্টর ও তদূর্ধ্ব নয়, তদনিম্ন পদেও উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার।
এটি সংবিধানের ২৯(৩) অনুচ্ছেদের অপব্যবহার। কোটা শুধু পশ্চাৎপদদের জন্য, সংখ্যালঘিষ্ঠ হলেই কোটা চলবে না।
ঘ. কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে উপজাতীয় অগ্রাধিকার
খ-৩২(২): তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগে জেলার উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার।
ঘ-১৮: সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার।
এটি বাঙালি চাকরিপ্রার্থীদের প্রতি সরাসরি বৈষম্য।
১৯৭১ সালের আগেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালির সংখ্যা ছিল নগণ্য। ১৯৭৪ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাঙালি ছিল মাত্র ১১.৬%। কিন্তু ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাঙালি জনসংখ্যা প্রায় ৫৩% ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ এখন বাঙালিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু চুক্তির কল্যাণে ক্ষমতার কেন্দ্রে তারা নিতান্তই সংখ্যালঘু।
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে কখনো বাঙালি বসতে পারেননি।
আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি সংরক্ষিত উপজাতীয়দের জন্য। ভূমি বন্দোবস্তে বাঙালিরা প্রায় অধিকারহীন। স্থানীয় পুলিশ, প্রশাসন, উন্নয়ন বোর্ড, সর্বত্র উপজাতীয় আধিপত্য।
এই বৈষম্যের ফলে বাঙালি যুবকরা চাকরি থেকে বঞ্চিত, জমি-জায়গা কিনতে বা বন্দোবস্ত নিতে পারেন না, এমনকি নিজ ভূমে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো আচরণ পান।
চুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ধরনের ‘রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র’ তৈরি হয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের হাতে এত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে সরকারের অনেক সিদ্ধান্তও এখানে কার্যকর করতে গেলে তাদের অনুমোদন লাগে।
এর ফলে: ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিতে বাঙালিরা প্রায়ই পরাজিত হন। উপজাতীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো (জেএসএস, ইউপিডিএফ, কেএনএফ) চুক্তির আড়ালে শক্তি বাড়িয়েছে। বাঙালি ও উপজাতি গ্রামগুলোতে চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা বেড়েছে। উপজাতি এলাকায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পও পরিষদের বাধায় আটকে থাকে।
চুক্তি বাতিল করার দাবি যেমন অবাস্তব, তেমনি এটি যেমন আছে তেমনি রাখাও সম্ভব নয়। একমাত্র পথ হলো সংশোধন। নিম্নে কয়েকটি প্রস্তাব:
নেতৃত্বের পদসমূহ (জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান) উন্মুক্ত করতে হবে। যোগ্যতা ও নির্বাচনের ভিত্তিতে যে কোনো স্থায়ী বাসিন্দা (বাঙালি বা উপজাতীয়) চেয়ারম্যান হতে পারবেন।
ভূমি ব্যবস্থাপনায় পরিষদের ভেটো পাওয়ার বাতিল করতে হবে। পরিষদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থাকবে সরকারের হাতে।
পুলিশ ও প্রশাসনে ‘অগ্রাধিকার’ শব্দটি বিলুপ্ত করে শুধুমাত্র যোগ্যতা বা সংখ্যানুপাত ভিত্তিতে নিয়োগ করতে হবে।
ল্যান্ড কমিশনকে আরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করতে হবে। বাঙালি প্রতিনিধিও কমিশনে রাখতে হবে।
আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতা হ্রাস করে তাকে শুধুমাত্র সমন্বয়কারী সংস্থায় পরিণত করতে হবে, শাসনকার্যে নয়।
সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সব ধারা সংশোধন করে সংসদে পাস করাতে হবে। কারণ চুক্তি সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়।
১৯৯৭ সালের চুক্তি শান্তি ফিরিয়ে এনেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই শান্তি একপেশে হয়ে গেছে। যে শান্তি একজনের জন্য নিরাপত্তা আর অন্যজনের জন্য বঞ্চনা ও ভয়ের কারণ হয়, সেই শান্তি টেকসই হয় না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানকার বাঙালি ও উপজাতীয় জনগোষ্ঠী একই মাতৃভূমির সন্তান। তাদের মধ্যে বিভেদ নয়, সম্প্রীতি ও সমানাধিকারই হতে পারে স্থায়ী শান্তির ভিত্তি।
বাঙালি জনগোষ্ঠী বলছেন, চুক্তির সংশোধন এখন সময়ের দাবি। সরকার, আঞ্চলিক পরিষদ, বাঙালি সংগঠন ও উপজাতীয় নেতৃবৃন্দকে এক টেবিলে বসে আলোচনা করতে হবে। একটি নতুন, সংশোধিত ও সকলের গ্রহণযোগ্য চুক্তিই পারে পাহাড়ে সত্যিকারের শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের সকলের। এখানে কেউ দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক থাকতে পারে না।


