বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম.এন লারমা) ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) প্রতিষ্ঠা করেন, যার লক্ষ্য ছিল ৩ পার্বত্য জেলা নিয়ে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং আলাদা প্রদেশ করে জুম্মল্যান্ড নাম রাষ্ট্র গঠন করা। তবে এর পেছেনে ভারত ও খ্রিস্টান ক্যাথলিক মিশনারিদেরও একটা বড় হাত আছে। ১৯৭৩ সাল থেকে এম.এন লারমার নের্তৃত্বে জেএসএস এর সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী নামে একটি সশস্ত্র শাখা গঠিত হয়, যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক আধুনিক সকল অস্ত্র নিয়ে সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী গুলোর বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করা বাঙালিদের উপর তারা বেশ কয়েকটি গণহত্যা চালায়।
২রা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রি. প্রতিবারের ন্যায় এবারও অনুষ্ঠিত হবে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইন্সার্জেন্সীতে লিপ্ত সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস (শান্তিবাহিনী) এর সাথে শেখ হাসিনা সরকারের করা “শান্তিচুক্তি” দিবস। বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (PCJSS) এর মধ্যে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয় চুক্তিটি। চুক্তিটি শান্তিবাহিনী ও সরকারের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটায় বলে মনে করা হয়। তবে পাহাড়ের সাধারণ নাগরিকরা মনে করে চুক্তির পরে আরো শক্তিশালি হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলো। সরকার ও শান্তিবাহিনীর মধ্যে সাক্ষরিত এই মেয়াদবিহীন, বিতর্কিত, আলোচিত ও সমালোচিত চুক্তিটি
এক সময় যে পার্বত্য বাসীর গলার কাটা হয়ে দাঁড়াবে সেটা এ দেশের সচেতন নাগরিকগণ টের পেয়েছিল শুরুতেই। যার কারণে সেই সময়ের বিরোধী দলগুলো শুরু থেকেই এই চুক্তির বিরোধীরা করেছিল। বিএনপি শান্তিচুক্তির পরের দিন অর্থ্যাৎ ১৯৯৭ সালের ৩রা ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে শান্তিচুক্তি বিরোধীতার ১৮টি কারণ উল্লেখ করেন। জামায়াত ইসলামী ও বিএনপি এক জোটে পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে লং মার্চ করেছিল।
চুক্তির যেসব ধারা গুলো বাস্তবায়নযোগ্য তারা সবগুলোই বাস্তবায়ন করেছিল সরকার। বলা যায় প্রায় ৯০ শতাংশ ধারা বাস্তবায়ন করেছে সরকার। চুক্তি মোতাবেক ২৩৯ টি সেনাক্যাম্প তুলে নিয়েছিল সরকার। ৩২ টি বিভাগ ন্যাস্ত করা হয়েছে জেলা পরিষদে। আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। সংবিধানের ১ নং ধারায় বলা আছে, বাংলাদেশ একটি একক স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। সুতরাং সংবিধানে পৃথক কোন আঞ্চলিক পরিষদ বা প্রদেশ করার বিধান নেই। চুক্তির ‘গ’ অধ্যায়ের ১ নং পংক্তিতে আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাব সংবিধানের ১ নং ধারার পরিপন্থী। এর পরেও আঞ্চলিক পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী গুলো নানা দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে শুরু করলো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রম। শান্তিবাহিনী (পিসিজেএসএস) এর মধ্যে ফাটল ধরল। নতুন করে তৈরি হলো ৩/৪ টি এন্সার্জেন্সী গ্রুপ। চাঁদার পরিমাণ বাড়ল ৩ গুণ। আগে একটি গোষ্ঠীকে বাধ্য হয়ে চাঁদা দিতে হতো সাধারণ পার্বত্যবাসীর। কিন্ত এখন ৩/৪ টি গ্রুপকে চাঁদা দিতে হচ্ছে।
শান্তিচুক্তির পরে আঞ্চলিক রাজনীতির বিভাজনে দল-উপদলের কোন্দলে ক্রমশই বিচ্ছিন্ন হতে থাকে শান্তিচুক্তির অন্যতম পক্ষ শান্তিবাহিনী (পিসিজেএসএস)। শান্তিচুক্তির পর ক্ষমতার লড়াইয়ে পাহাড়ে অস্ত্রবাজি বেড়েছে আরো দ্বিগুণ। আঞ্চলিক দল গুলোর রাজনীতির বিভাজনে মারামারি, হানাহানি, চাঁদাবাজি ও দাঙ্গার ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। লক্ষনীয় যে, শুরুর দিকে (শান্তিচুক্তির আগে) মানবেন্দ্র লারমার সংগঠন পিসিজেএসএস জুম্ম জাতির আত্ননিয়ন্ত্রণাধিকার নামক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে শান্তিচুক্তির পর তারা নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্ঠি করে বিচ্ছিন্নতাবাদিতে রূপান্তর হলো৷ আদর্শিক রাজনীতি কিংবা চাওয়া-পাওয়া ছাড়িয়ে গিয়ে তারা এখন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে কেউ চায় পূর্ণাঙ্গ সায়ত্তশাসন, কেউ চায় আদিবাসী স্বীকৃতি আবার একদল চাই জাতিভেদে আলাদা আত্ননিয়ন্ত্রণাধিকার কিংবা কুকি রাষ্ট্র। এক সময় পিসিজেএসএস চেয়েছিল গণতন্ত্র, ঐতিহ্য ভূমির অধিকার, প্রবাদ ভাষা সংরক্ষণের অধিকার। সেই অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার দাবি পূরণে আশ্বাস দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করছিল। পরবর্তীতে আলাদা স্বাধীন জুম্মল্যান্ড নামক প্রদেশ করার দাবিতে জেএসএস ও ইউপিডিএফ পুণরায় হাতে অস্ত্র তুলে নিলে সরকারি ব্যবস্থা থমকে যায়। পাহাড়িদের সংগঠন আরোও চেয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন করে বাঙালি বসবাস বাধাগ্রস্ত করার। বাঙালিরা চেয়েছিল স্বাধীন সার্বভোম দেশে যার যেখানে ইচ্ছা সেখানে বসবাস করবে।
সুতরাং, ক্ষমতার লড়াই, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের আঞ্চলিক দল গুলোর লড়াইয়ে থমকে গেছে শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা। মূলত আঞ্চলিক দলগুলো যে যার যার মতন দখল করতে চায় এই পাহাড়। কেবলমাত্র দেশের সংবিধান ও সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমেই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা-নির্ভেজাল আগ্রাসন এবং রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের সুপরিকল্পিত বিদেশী চক্রান্ত। ভারতের অন্ন, অর্থ ও অস্ত্রে সজ্জিত মুষ্টিমেয় ঘাতক শান্তিবাহিনী, জেএসএস, ইউপিডিএফ, কেনএনএফ এর নাশকতামূলক তৎপরতাকে রাজনৈতিক সমস্যা বলে চিহ্নিত করা যায় না।



