পাহাড়ের রাজনৈতিক অঙ্গনে তপ্ত উত্তাপ।

0

জেএসএস চুক্তির ২৮ বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত গণসমাবেশ থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণার পর বহুদিনের নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মাঠ। পাহাড়ি রাজনীতির দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব: জেএসএস ও ইউপিডিএফ, এই নির্বাচনে নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে জেএসএস প্রার্থী উষাতন তালুকদার ইউপিডিএফের সমর্থনে বিজয়ী হলেও পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে একই সমর্থন পেলেও তিনি পরাজিত হন। এরপর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রভাব বিস্তার, অস্ত্রবিরতি ও সংঘাত কমাতে দুই দলের মধ্যে ২০১৫–২০১৬ সালের দিকে যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছিল, তা ২০২৩-২০২৪ সালে ভেঙে যাওয়ার পর সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। ফলে আগামী নির্বাচনে ইউপিডিএফ-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় জেএসএস প্রার্থী প্রচারণা চালাতে পারবে না, এমনই আভাস মিলছে। অন্যদিকে, ইউপিডিএফ এখন প্রকাশ্যেই জেএসএসকে প্রতিপক্ষ ঘোষণা করে তাদের পরাজয় নিশ্চিত করতে মাঠে সক্রিয়। গত কয়েক বছরের রক্তাক্ত সংঘর্ষ ও আধিপত্যের লড়াই তারই প্রমাণ।

খাগড়াছড়ি জেলার সংসদীয় অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই ইউপিডিএফ-এর একক প্রভাব ও রাজনৈতিক আধিপত্য লক্ষণীয়। এই অঞ্চলে জেএসএস ততটা সক্রিয় বা প্রভাবশালী নয়। সাম্প্রতিক সময়ে শোনা যাচ্ছে, খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ শিগগিরই নিজস্ব প্রার্থী ঘোষণা করতে পারে এবং পাশাপাশি কোনো জাতীয় রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দেওয়ার দিকেও তারা ঝুঁকতে পারে বলে স্থানীয় মহলে জোর গুঞ্জন চলছে। ইউপিডিএফ এর মত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

অনেকের মতে, বান্দরবানে আঞ্চলিক দলগুলোর ভোটের মাঠে তেমন প্রভাব নেই। সেই তুলনায় খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি, দুটি আসনই পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মেরুকরণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত রাঙামাটি সংসদীয় আসনকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম হয়েছে; কারণ এখানে যদি ইউপিডিএফ প্রার্থী না দেয় অথবা জেএসএসকে প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়, তবে ইউপিডিএফ নিজেই অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।

রাঙামাটির সংসদীয় নির্বাচনী এলাকায় ইউপিডিএফের প্রভাব রয়েছে কাউখালী, নানিয়ারচর ও কতুকছড়ি অঞ্চলে। তবে পুরো আসনে জেএসএসের নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত হওয়ায় ইউপিডিএফ নিজস্ব প্রার্থী দেবে না, এটি প্রায় নিশ্চিত বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা। এই পরিস্থিতিতে তারা জাতীয় পর্যায়ের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীকে সমর্থন দিতে পারে। ফলে জেএসএস বহু পাহাড়ি ভোট হারানোর শঙ্কায় রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন না থাকায় পূর্বের ধারাবাহিকতায় এবারও জেএসএস স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচনে অংশ নেবে। চুক্তি পক্ষের সংগঠন চুক্তির পরও অস্ত্রধারী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকায় জেএসএস একটি সন্ত্রাসী সংগঠন এমন অভিযোগও আছে। কিন্তু জেএসএস আজকের আয়োজিত গণসমাবেশ থেকে নিজেদের একটা স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক দল এবং চুক্তি বাস্তবায়ন চায় এমন দ্বারার সংগঠন হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।

আজ ২ ডিসেম্বর ২০২৫ রাঙামাটির কুমার সুমিত রায় জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গণে “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করুন, জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করুন” স্লোগানকে সামনে রেখে এক গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেএসএস কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও সাবেক এমপি উষাতন চাকমা বলেন, “আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে জেএসএস অংশ নেবে।” তিনি জেএসএসকে “অস্ত্র বা মাদক ব্যবসায় জড়িত নয়” বলেও পরিষ্কারভাবে দাবি করেন এবং ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় প্রতিপক্ষদের সমালোচনা করেন।

জেএসএসের এই ঘোষণার পর পাহাড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক ও নতুন জল্পনা তৈরি হয়েছে। একসময় প্রভাবশালী জেএসএস নির্বাচনের ক্ষেত্রে মিত্র আওয়ামী লীগকে ছাড় দেয়নি, বরং অভিযোগ রয়েছে, তারা বেছে বেছে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত উপজাতি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন এসেছে। নির্বাচন কমিশন অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারির কারণে আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। ফলে রাঙামাটি আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হবে বিএনপি, জামায়াত ও জেএসএস, এক ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

এক্ষেত্রে প্রশ্ন একটাই;
জেএসএস কি আবারও তাদের অতীতের প্রভাবশালী অবস্থান ফিরে পাবে, নাকি ইউপিডিএফ-বিএনপি-জামায়াতের কৌশলগত সমীকরণে কোণঠাসা হবে?
এর জবাব দেবে সময়ই, আর তার সবচেয়ে বড় মঞ্চ, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন।

আগের পোস্টরাঙামাটিতে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে দুঃস্থ পুরোহিত-সেবাইতদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ।
পরের পোস্টপার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বাতিলের দাবিতে সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদ।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন