পার্বত্য এলাকায় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের পুনরুত্থান: গুজবের মাধ্যমে রাষ্ট্র ভাগের নতুন কৌশল।

0

পার্বত্য চট্টগ্রাম বহুদিন ধরেই ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, জাতিগোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব, আন্তর্জাতিক এনজিওর চাপ ও উপজাতি উগ্রপন্থী অংশের কল্পিত স্বাধীনতা-স্বপ্নের ঘূর্ণাবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই দীর্ঘদিনের অস্থিরতার ভেতরে সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন ইউপিডিএফ (প্রসিত) ঘরানার প্রবাসী ব্লগার ও স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবি প্রজ্ঞা তাপস চাকমা প্রকাশ PT Chakma. PT ৫ ও ৬ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রি. নিজের ফেসবুক আইডি PT Chakma থেকে যে বিভ্রম-সৃষ্টিকারী, ভিত্তিহীন ও রাষ্ট্র-বিদ্বেষী পোস্টটি দেন, তা পার্বত্য অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা, উদ্বেগ ও সামাজিক অস্থিরতার ঢেউ তুলেছে।

শুক্রবার ৫ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রি. প্রজ্ঞা তাপস চাকমা তার ফেসবুকে লেখেন—
“বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা- খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবানকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র অথবা ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা।

এর সহযোগীতায় থাকবে রাশিয়া ও। তিন পার্বত্য জেলা দখলের জন্য রাশিয়া এস ৪০০ এবং সুকুই ৫৯ ফাইটার বিমান সর্বরাহ করবে এমন চুক্তি ও হয়েছে আজ নরেন্দ্র মোদী এবং পুতিনের মধ্যে। ভারতীয় সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী এবং নৌবাহিনী এক সাথে বাংলাদেশের উপর আক্রমণ করবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অভ্যন্তরীণ দল উপদলগুলোকে নিয়ে। মাত্র সাপ্তাহ খানিকের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে যাচ্ছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র কিংবা ভারতের একটি স্বাধীন অঙ্গরাজ্য। এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে – বিবিসি নিউজ।”

এই পুরো বক্তব্যই অসত্য, বিভ্রান্তিকর এবং সম্পূর্ণ কাল্পনিক মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এমন কোনো খবর নেই, এটা সহজেই যাচাইযোগ্য। কিন্তু PT-এর পোস্ট পাহাড়ে যে আলোচনার ঝড় তুলেছে, তা স্বাভাবিক নয়। সচেতন মহল মনে করেন, এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত উন্মাদ মন্তব্য নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক অপারেশন, যার উদ্দেশ্য জনমনে বিভাজন সৃষ্টি করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে চাপের মুখে ফেলা এবং কৌশলগত সুবিধা আদায় করা।

উগ্রপন্থী উপজাতিদের দীর্ঘদিনের কল্পিত রাষ্ট্রস্বপ্ন:

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত বিভাগের পর থেকে উপজাতিদের একাংশ কাল্পনিক স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে আসছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সেই প্রবণতা আরও প্রবল হয়। বিভিন্ন সশস্ত্র দল: জেএসএস, ইউপিডিএফ, ও পরবর্তীতে কেএনএফ নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের নামে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯৭ সালের চুক্তির পরও জেএসএস এখনো অবৈধ অস্ত্র ফেলে দেয়নি, যা ২০১৩ সালে সন্তু লারমা নিজেই এক টিভি সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন।

১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর চুক্তির বিরোধিতা করে জন্ম নেয় ইউপিডিএফ। জেএসএস এর ভাঙন থেকে পরে গড়ে ওঠে ইউপিডিএফ (প্রসিত) ও আরও কয়েকটি উপদল। আবার ২০২০ সালের পর কেএনএফ কুকিল্যাণ্ড গঠনের স্বপ্নে সশস্ত্র কার্যক্রম শুরু করে। পাহাড়ের অভ্যন্তরে এই সশস্ত্র রাজনীতি একটি বড় অংশকে উগ্র জাতিগোষ্ঠীকেন্দ্রিক বিভাজনে ঠেলে দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে PT চাকমার মিথ্যা পোস্ট সেই পুরনো স্বপ্নকে আবার উসকে দেয়, যা শুধু গুজব নয়, বরং শান্তি-সম্প্রীতি ভেঙে অস্থিতিশীলতা বাড়ানোর সরাসরি প্ররোচনা।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব তিমুর বা দক্ষিণ সুদানে রূপান্তরের ষড়যন্ত্র:

দেশি-বিদেশি কিছু শক্তি বহুদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, সংবাদ, প্রতিবেদন, সেমিনার ও গোপন নথিতে বারবার উঠে এসেছে উগ্র উপজাতি গোষ্ঠীগুলোর জুম্মল্যাণ্ড, কুকিল্যাণ্ড ও মগল্যাণ্ডের প্রচারণা; গোপন অর্থায়ন; মুদ্রা-নোট, পতাকা ও বিভক্ত মানচিত্র তৈরি, এসবই একটি দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত। PT চাকমার পোস্ট সেই আন্তর্জাতিক চক্রান্তেরই অংশ কিনা, তা এখন খতিয়ে দেখা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজন হলে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান, সেনা মোতায়েন ও অভ্যন্তরীণ নজরদারি নিশ্চিত করা ছাড়া উপায় নেই।

PT-এর পরিচয়: PT চাকমা মূলত রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের তেলোন কার্বারী পাড়ার বাসিন্দা। পিতার নাম গুনো চাকমা। স্ত্রী খাগড়াছড়ি দীঘিনালা বড়আদম গ্রামের রুপসী চাকমা।

একসময় PT ঢাকার সাভার বৌদ্ধ বিহারে শ্রমণ হিসেবে থাকতেন। অভিযোগ উঠে দানবাক্স থেকে টাকা চুরি করেছেন। এরপর হঠাৎ ধর্মীয় লেবাসে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন এবং ভারতীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মিজোরাম, কলকাতা, বুদ্ধগয়া, নয়াদিল্লি এই সব জায়গায় তিনি বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করেন এবং শেষে দুবাই হয়ে কানাডায় স্থায়ী হন বিশ্বাসযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, তার অনেক নাগরিকত্ব কাগজপত্র জাল উপায়ে তৈরি।

কানাডায় ইউপিডিএফ (প্রসিত)-এর আন্তর্জাতিক ব্লগার:

কানাডায় PT চাকমা ইউপিডিএফ (প্রসিত)-এর অন্যতম মুখপাত্র, ব্লগার ও কূটনৈতিক প্রচার–পরিচালক। প্রবাসী উপজাতিদের সংগঠিত করা, বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনে লবিং করা, ইউপিডিএফ এর জন্য জনমত তৈরিতে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। কানাডার আয়ের একটি অংশ নাকি ইউপিডিএফের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে ব্যয় করা হয়, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালের মার্চে জেনেভায় গোপন বৈঠকে CHT Defence Force (CHTDF) নামে কথিত নতুন সশস্ত্র সংগঠন গঠনের কথাও উঠে এসেছে, যেখানে কানাডার PT, কোরিয়ার রনেল, আমেরিকার পেরিস ও সুইজারল্যান্ডের সঞ্চয়, ভারতের সুহাস চাকমাসহ ইউপিডিএফ (প্রসিত)-এর কয়েকজন নেতা যুক্ত আছেন।

এটি পাহাড়ের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ইঙ্গিত।

PT-এর বাংলাদেশবিদ্বেষী মনোভাব:

গত ২০ অক্টোবর ২০২৫ খ্রি. নিজের আরও একটি স্ট্যাটাসে PT চাকমা বাংলাদেশের এক অভিনেত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করে লেখেন,
“আজকে ভাঙাদেশের এক চলচ্চিত্র নায়িকাকে দেখেছি…”

পরবর্তী মন্তব্যে তিনি জানান,
“ভাঙাদেশের লোকদের থেকে দূরে থাকতে হয়, সুযোগ পেলে কুপাই তার জন্য।”

এমন বক্তব্য একজন সুস্থ মানুষের হতে পারে না, এ কথা শুধু প্রশাসন নয়, পাহাড়ের সাধারণ মানুষও বলছে। যে দেশ তার জন্মভূমি, যেখানে তার পিতা-মাতা, স্ত্রী ও আত্মীয়রা এখনো আছেন, সেই দেশ সম্পর্কে এমন জঘন্য মন্তব্য নিছক বিদ্বেষ ছাড়া কিছুই নয়।

জেএসএস-সমর্থিত ব্লগারদের কাছে “দানবাক্স চোর”

উপজাতি ব্লগ জগতে PT-এর আরেক পরিচিতি, “দানবাক্স চোর”।
জেএসএস ঘরানার ব্লগার ভাগ্য চাকমা (করুনালংকার ভিক্ষু) প্রথম তাকে এই নামে ডাকেন, যিনি পরে ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে নয়াদিল্লিতে থাকছেন।
এই বিদ্বেষ, শব্দই প্রমাণ করে PT দুই পক্ষের কাছেই বিতর্কিত ব্যক্তি; তার সামাজিক অবস্থান ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।

ইউপিডিএফের এক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন— “ সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা তথ্য PT একান্ত ব্যক্তিগত বক্তব্য। ইউপিডিএফ এমন বক্তব্য সমর্থন করে না এবং সে ইউপিডিএফের কোনো দায়িত্বশীল কেউ নয়।”

এ বক্তব্যে সংগঠনের দায় এড়ানোর চেষ্টা থাকলেও PT-এর দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ড যে ইউপিডিএফ প্রসিতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

PT চাকমার সাম্প্রতিক মিথ্যাচার, কুপ্রচার, রাষ্ট্র বিদ্বেষী মন্তব্য ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয়তা, সব মিলিয়ে বিষয়টি নিছক ব্যক্তিগত বিভ্রম নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। পার্বত্য চট্টগ্রাম কখনোই কোনো বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র, অঙ্গরাজ্য বা বিদেশি শক্তির করুণার জায়গা নয়। এটি বাংলাদেশের হৃদয়ের অংশ, যেখানে শান্তি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।

এই ধরনের গুজব সন্ত্রাস ও মনস্তাত্ত্বিক অপারেশনকে কঠোরভাবে প্রতিহত করাই এখন সময়ের দাবি।

আগের পোস্টবিলাইছড়ির দুর্গম এলাকায় উপজাতিদের মধ্যে সেনাবাহিনীর বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা।
পরের পোস্টসম-অধিকার আন্দোলনের রাঙামাটি সদর উপজেলা শাখার অভিষেক ও পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন