চাঁদাবাজি উপজাতিদের অধিকারের অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে!

0

পার্বত্যবাসী ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার মধ্য দিয়েই আশা করেছিল বৈষম্যহীন, শোষণহীন, অস্ত্রবিহীন ও চাঁদাবাজমুক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ার প্রত্যয়। কিন্তু তা আজ চাঁদাবাজি ও অস্ত্র প্রদর্শনের কারণে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। দিনদিন এ চাঁদাবাজি উপজাতিদের জাতিগত জীবনে অভিশাপ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এ মন্তব্য অনস্বীকার্য। তাই পাহাড়িদের জনজীবনে কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও উন্নতি ঘটাতে হলে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি (জেএসএস) ও কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগণকে স্বায়ত্তশাসনের মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়ে চাঁদাবাজির মাধ্যমে পার্বত্য বাসীদের যে দীর্ঘ বছর ধরে শোষণ করে আসছে তার অবসান কীভাবে? আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেকের বেশি এলাকায় ইউপিডিএফ, জেএসএস ও কেএনএফ চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করছে। পাহাড়ের মানুষ কর্মজীবী, এখানকার ভূ-প্রকৃতি ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে কঠোর পরিশ্রম করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে। এরপর বিচ্ছিন্নতাবাদী নানা দল-উপদল ও কুসংস্কার, ধর্মীয় বিধিবিধান এবং হেডম্যান-কার্বারী রীতিনীতি দ্বারা উপজাতীয়দের জীবন পরিচালিত হয়। এমন মানবেতর কঠিন জীবনের মধ্যেই সাধারণ উপজাতীয়দের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের মুখরোচক গল্প এবং পার্টি চলার নামে জোরপূর্বক যে টাকা উত্তোলন করে তা কিন্তু সংজ্ঞা অনুযায়ী চাঁদাবাজি৷ পার্বত্যাঞ্চলে চাঁদাবাজি ব্যাপক ও জটিল প্রত্যয়। যদিও এর গতি- প্রকৃতি বহুমুখী ও বিচিত্র ধরনের বিধায় এর সংজ্ঞা নিরূপণ করা কঠিন৷ কিন্তু সাধারণত, অস্ত্র প্রদর্শন, বল প্রয়োগ, প্রভাব দেখিয়ে উত্তোলিত টাকাকে চাঁদাবাজি বলে। কিন্তু উপজাতীয় অধিকার আদায়ের সংগঠন ইউপিডিএফ, জেএসএস, কেএনএফ ও অন্যান্যরা এটাকে চাঁদাবাজি বলতে নারাজ। তারা বলে উপজাতিদের অধিকারের জন্য আন্দোলন খরচ ও পার্টি পরিচালনা করতে অনুদান প্রদান গ্রহণ করা হয়! কিন্তু এটা যে চাঁদাবাজি তা পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ হারে হারেই টের পাচ্ছে। স্থানীয় উপজাতিদের দেওয়া তথ্য এবং প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী পাহাড়ের চিপা চাপাই চাঁদাবাজি বেড়েছে। উপজাতীয়দের তথাকথিত অধিকার নিয়ে সৃষ্ট হওয়া অনেকগুলো সংগঠন নানা অন্যায়, অবিচার, জোরজুলুম ও চাঁদাবাজি তৈরি করে অমানবিক ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এসব মন্তব্য কেবল ঢালাওভাবে নয়, তা বাস্তব সত্যই পরিণত হয়েছে। শুধু মাত্র সাধারণ উপজাতির ক্ষেত্রেই নয় প্রভাবশালী উপজাতি ও বাঙালি নেতাদের জন্যও একই মন্তব্য প্রযোজ্য। পার্বত্যাঞ্চলে চাঁদাবাজি উপজাতীয়দের অধিকারের অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে মন্তব্যটি অমূলক বলার সুযোগ নেই। বেশিদূর যেতে হবে না, সরকারি সংস্থা বা সংবাদকর্মীদের কাছ থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আঞ্চলিক দলগুলো কর্তৃক চাঁদা আদায়ের পরিমাণ কত। তার খোঁজখবর নিলে অবশ্যই প্রমাণ মিলবে।

পাহাড়ে যে কত ধরনের চাঁদাবাজি চলে তা এখানকার ভুক্তভোগী জনগণ ব্যতীত অন্যান্যরা গভীরভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। হেডম্যান, কার্বারী ও সার্কেল চিফরা ব্রিটিশদের মৃত সার্কেল আইন দেখিয়ে খাজনার নামে উভয় সম্প্রদায় থেকে মোটা অঙ্কে চাঁদা নেয় আর পাহাড়ের ইউপিডিএফ, জেএসএস, কেএনএফ একদম বুঝে শুনে চাঁদা নেয়! আবার কেউ গতানুগতিক না বুঝেও চাঁদা নেয়। ইস্যু ভিত্তিক নানা আন্দোলন সংগ্রামের নামে উপজাতিদের থেকে চাঁদা গ্রহণ করে। অভিযোগ শোনা যায় এই কাণ্ডে জেএসএস বা আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান খোদ সন্তু লারমা জড়িত, আরো জড়িত ইউপিডিএফ প্রসীত বিকাশ খীসা, বম পার্টির নাথান বম। তারা উপজাতি জনগণের অধিকার দাবিতে সংগঠন সৃষ্টি বা পরিচালনা করলেও কাজেই কল্যাণে কাজ করছেন না। তারা চাঁদাবাজির এই বিপুল পরিমাণ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেন। এর ফলে পাহাড়ের প্রতিটি স্থানে চাঁদাবাজি বেড়ে চলছে। সৃষ্টি হয়েছে শক্তিশালী চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক৷

পাহাড়ে চার ধরনের চাঁদাবাজি দেখা যায়—
(১) উপজাতিদের অধিকার আন্দোলনের নামে
(২) পার্টি চলার নামে
(৩) উপজাতিদের দারিদ্র ও অসচ্ছলতা (৪) অস্ত্র কেনা, কূটনীতিক তৎপরতা বৃদ্ধি, ক্ষমতার লোভের আতিশয্যে।

চাঁদাবাজি ভাইরাসের মত সংক্রামক। আর এই চাঁদাবাজি যদি সন্তু, প্রসীত ও নাথান বমের সৃষ্ট সংগঠনগুলোর সর্ব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে তার অবসান করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। আজ আমাদের বাঙালি সমাজ চাঁদাবাজি মুক্ত এই কথাও বলা যাবে না কারণ উপজাতি সংগঠনগুলো চাঁদা উপজাতিদের পাশাপাশি বাঙালি ব্যবসায়ীদের থেকেও নিচ্ছে। উপজাতি বাঙালি উভয় সম্প্রদায় থেকে চাঁদাবাজির ফলে চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক আরো প্রসারিত হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাঁদাবাজির কথা ব্লগার, সোশ্যাল মিডিয়া বা গণমাধ্যম মারফত এখন সবাই জানেন। যেখানে পাহাড় পর্যটন শিল্পের জন্য অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে উঁকি দিচ্ছে সেখানে চাঁদাবাজদের অস্ত্র শক্তি প্রদর্শন চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে রাষ্ট্রের শিথিলতা নীতি, সেনাবাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার, জাতীয় রাজনীতির আবির্ভাব ও পার্বত্য বাঙালি নেতৃত্বহীনতা পাহাড়ে দশক দশক ধরে খুন, রাহাজানি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের ভিত রচিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাঁদাবাজির মূলেই এ বিষয়গুলো সক্রিয়ভাবে বিবেচিত বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ মনে করে।

পাহাড়ে এই চাঁদাবাজি কিন্তু তাদের পক্ষে সাফাই গাওয়া বা উকালতি করে বিশেষ মহলকে কলঙ্কিত করেছে৷ এ মহলটিকে এটা বুঝতে হবে দেশবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী বা অপশক্তিকে লাই দিয়ে কল্যাণ বয়ে আসেনা। পাহাড়ে খুন, রাহাজানি, অস্ত্র শক্তি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজি কিন্তু দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন বারবার হয়েছে৷ ২০০১ সালে নানিয়ারচর থেকে ইউপিডিএফ কর্তৃক চাঁদার জন্য তিন বিদেশি নাগরিক অপহরণ করে তিন কোটি (৩ কোটি) টাকা মুক্তিপণ আদায় দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে। বহির্বিশ্বের মানুষের কাছে আমরা দিন দিন মূল্যহীন হয়ে পড়েছি। এ অবস্থার পরিবর্তন সাধন করে পাহাড়ে সকল সম্প্রদায়কে ন্যায়ের আদর্শে উজ্জীবিত করতে না পারলে চাঁদাবাজির কবল আমাদের পাহাড়ের শান্তি প্রিয় জনগণকে আর গ্রাস করবে৷ চাঁদাবাজির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের আমাদের উপজাতি জনগণের জ্ঞানের ভাণ্ডার প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। বিষয়টি আমাদের সকল উপজাতি জাতিগোষ্ঠীকে বুঝতে হবে। উপজাতি সংগঠনগুলোর কথিত অধিকার আন্দোলনের অন্তরালে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ করেছে রাষ্ট্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে। অধিকার জীবন অহমিকার অসার উচ্চাভিলাষ বা আবরণে আড়ষ্ট হয়ে পড়েছে। দারিদ্র্যসীমায় বসবাসকারী থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত উপজাতির জীবন পর্যন্ত চাঁদাবাজির কবল রুদ্ধ করে দিয়েছে।

দিনশেষে আমাদের উপজাতি তথা কথিত অধিকার দাবির সংগঠনগুলোকে বুঝতে হবে পাহাড় অশান্ত খুন, রাহাজানি, অস্ত্র শক্তি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জাতিসত্তাকে ভালো কিছু দিতে পারবে না। কাজে সরকার, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী চাঁদাবাজি বন্ধ করে এ অঞ্চলের উপজাতি ও বাঙালি জনগণের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে দিতে চায়। এ কাজে প্রয়োজন উপজাতি জনগোষ্ঠীর একান্ত সহযোগিতা। উপজাতি জনগোষ্ঠী যদি অবৈধ অস্ত্রবাজ, চাঁদাবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় প্রদান না করে তাহলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদ ও চাঁদাবাজ সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব।

আগের পোস্টপানছড়িতে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারী ৩ বিদেশি নাগরিক আটক।
পরের পোস্টঅ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের চিঠিতে বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন: বাদ পড়েছে কেএনএফ-এর সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত চিত্র।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন