বিজয় দিবসে সাজেকে অবরোধ: ইউপিডিএফ-এর স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকাণ্ডের মুখোশ উন্মোচন।

0

১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের স্মৃতিমধুর দিনে পার্বত্য রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটন খ্যাত সাজেক অঞ্চলে একটি গভীর উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এই দিনটি দেশের ইতিহাসে স্বাধীনতার চেতনার প্রতীক হলেও, স্থানীয় জনগণকে হতাশ করেছে সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর অনির্দিষ্টকাল অবরোধ ঘোষণা। বিষয়টি স্পষ্ট: অবরোধ এলাকাবাসীর ডাকে নয়, বরং অবরোধ চালাচ্ছে ইউপিডিএফ-এর সন্ত্রাসীরা, যারা নিজেদের স্বার্থ ও দখলবাজি সুরক্ষায় সাজেকের পর্যটন শিল্পকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।

এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবসে ইউপিডিএফ-এর অবরোধ কেবল স্থানীয় অশান্তি সৃষ্টিই নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি ধৃষ্টতা প্রদর্শনের শামিল। একই সঙ্গে, এই ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ইউপিডিএফ স্বায়ত্তশাসনের আড়ালে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। বিজয় দিবসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এই কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইউপিডিএফ-এর স্বাধীনতা বিরোধী মনোভাবের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে।

প্রসঙ্গগত মূল ঘটনা সংক্ষেপে এমন: মাজলঙে বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণাধীন ছিল। ইউপিডিএফ বন বিভাগের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিদ্যালয় নির্মাণের মাধ্যমে এলাকার ভূমি দখলের পায়তারা চালাচ্ছিল। তারা বিদ্যালয়টিকে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ভূমি দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছিল না, বরং এটিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাচ্ছিল। আদালতের নির্দেশের পর বন বিভাগের হস্তক্ষেপ এবং বিদ্যালয় ভাঙার পর, তারা তখন বন বিভাগের অফিস ভাংচুর, মোটরসাইকেল ভাংচুর ও বনকর্মীর উপর হামলা করে এবং আজ ১৫ ডিসেম্বর এক বিক্ষোভ মিছিল থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকাল অবরোধ ঘোষণা করেছে।

এ ঘটনায় ইউপিডিএফ এর নির্দেশে স্থানীয় জনগণ গতকাল (১৪ ডিসেম্বর) দুপুরে বিক্ষোভ শুরু করে। সেনাবাহিনী, বনবিভাগ ও পুলিশ মাজলঙের এগোজ্যাছড়ি এলাকায় গিয়ে স্থানীয় অর্থায়নে নির্মাণাধীন বিদ্যালয় ভেঙে দিলে এবং ঢেউটিনসহ সরঞ্জামাদি সরিয়ে নিলে, জনগণ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা সাজেক পর্যটন সড়ক অবরোধ করে এবং বিকেলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে বিদ্যালয়ের মালামাল যথাস্থানে ফেরত দেওয়ার জন্য শক্ত আর্টিমেটাম দেয়।

এ ঘটনা থেকে যা বোঝা যায় তা হলো: ইউপিডিএফ-এর কর্মকাণ্ড কেবল স্থানীয় শান্তি বিনষ্ট করছে না, বরং সাজেকের পর্যটন শিল্পকে ক্ষতির মুখে ফেলছে। সাজেক দীর্ঘদিন ধরে দেশের পর্যটন অর্থনীতির উজ্জ্বল নিদর্শন। এখানে পর্যটন শিল্পের ধ্বংস মানে সরাসরি স্থানীয় জনগণের আয়ের উৎস বন্ধ হওয়া এবং পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা বিপন্ন হওয়া।

বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ইউপিডিএফ-এর অবরোধ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দুটি মূল উদ্দেশ্য নিয়েই পরিচালিত হচ্ছে:
১. বন বিভাগের নিয়মকানুন অমান্য করে ভূমি দখল করা।
২. সাজেকের পর্যটন শিল্পে আঘাত হানতে চুক্তিভঙ্গী কর্মকাণ্ড চালানো।

এ ধরনের কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের সংবিধানগত কর্তৃত্ব, আইনশৃঙ্খলা ও স্থানীয় জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী। স্থানীয় জনগণকে বাধ্য করা হচ্ছে যে তারা নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেবে। এটি কোনো সাধারণ বিক্ষোভ নয়; এটি একটি সাংঘাতিক রাজনৈতিক-সামাজিক সংকট, যা সাজেকের স্থিতিশীলতা ও পর্যটন অর্থনীতির জন্য গুরুতর হুমকি।

এ ঘটনায় প্রয়োজন তাৎক্ষণিক সরকারী হস্তক্ষেপ। বন বিভাগের কঠোর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের বেআইনি দখল প্রতিরোধ করা যায়। সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অবৈধ কার্যক্রম রোধ করা এবং জনগণকে তাদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষা করার নিশ্চয়তা দেওয়া। স্থানীয় পর্যটন শিল্প পুনরুদ্ধার এবং সাজেককে একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পুনঃস্থাপন করা।

পরিস্থিতি স্পষ্ট করে বোঝায় যে, জনগণ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সচেতন ও সমন্বিত অবস্থান নিয়েছে। সাজেকের পর্যটন শিল্প ও শান্তি বজায় রাখতে চায়, যা দেশের অর্থনীতি ও স্থানীয় জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

ইউপিডিএফ-এর এই ধরনের অবরোধ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কেবল আইন এবং সামাজিক কাঠামোকে ভাঙছে না, বরং জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতার চেতনা এবং স্থানীয় জনগণের প্রাপ্য অধিকারেরও অবমাননা করছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীকে অবশ্যই ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে এবং ইউপিডিএফ-এর অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।

সাজেক শুধু পর্যটন কেন্দ্র নয়; এটি দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি ও জনগণের স্বপ্নের প্রতীক। সন্ত্রাসী শক্তি ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে জনগণ যে প্রতিরোধ প্রদর্শন করছে, তা নিশ্চিত করছে যে সাজেকের স্বাধীনতা ও শান্তি রক্ষা সম্ভব এবং প্রয়োজনীয়।

আগের পোস্টবান্দরবানের বন উজাড় ও অবৈধ কাঠ পাচারে ভয়ঙ্কর চক্রের দাপট।
পরের পোস্টইউপিডিএফের চাঁদার উৎসে আঘাত: সেনা অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ কাঠ উদ্ধার।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন