সাজেকে স্কুলের আড়ালে বন বিভাগের জমি দখলের অপচেষ্টা: উচ্ছেদ অভিযানে ইউপিডিএফের হামলা।

0

রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক, যে অঞ্চলটি একদিকে দেশের পর্যটন অর্থনীতির উজ্জ্বল প্রতীক, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর নীরব দখলদারিত্ব ও প্রভাববলয়ের পরীক্ষাগার; সেই সাজেকেই রবিবার সংঘটিত হলো একটি গভীর উদ্বেগজনক ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানানোর ঘটনা। বন বিভাগের নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের সময় সংঘবদ্ধভাবে হামলা, কার্যালয় ভাঙচুর, নথিপত্র লুট, বনরক্ষিকে মারাত্মকভাবে আহত ও অপহরণের চেষ্টা; সব মিলিয়ে এই ঘটনাপ্রবাহ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; বরং এটি পাহাড়ে প্রশাসনিক শাসন, আইনগত সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা কাঠামোর উপর এক সুপরিকল্পিত আঘাত।

যদি এই হামলার ঘটনার নেতৃত্বে কোনো বাঙালি গোষ্ঠী জড়িত থাকত, তবে পরিস্থিতির গতিপথ যে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো, তা অনস্বীকার্য। সে ক্ষেত্রে বন বিভাগ কিংবা প্রশাসন সহনশীলতার পথ বেছে নিত না; বরং বাঙালির লাশ পড়লেও তা রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগের বৈধতা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এখানে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ হওয়ায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর প্রকাশ্য হামলা, বন কর্মী মারধর, সরকারি উচ্ছেদ অভিযানে বাধা, এমনকি পর্যটন সড়ক অবরুদ্ধ করে দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও প্রশাসনের আচরণে একধরনের অস্বাভাবিক সংযম ও নীরব সহনশীলতা লক্ষ্য করা গেছে।

এই সহনশীলতা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের আলোকে হয়তো আদর্শ হিসেবে উপস্থাপনযোগ্য; কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে তা বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার জন্য নিঃসন্দেহে এক গভীর লজ্জা ও বেদনাদায়ক বৈপরীত্য। রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের মধ্যে আচরণগত ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন মানবাধিকারের নামে প্রদর্শিত এই নির্বাচিত সহনশীলতা শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের নয়, বরং বৈষম্যেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

১৪ ডিসেম্বর দুপুরে সাজেকের মাচালং একুইজ্জাছড়ি এলাকায় আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বন বিভাগের জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয় বন বিভাগ। এই উচ্ছেদ কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর আগে একাধিকবার সতর্কতা, নোটিশ ও বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল। তবুও পার্বত্য চুক্তি বিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ‘স্কুল’ নামক একটি স্থাপনার আড়ালে বনের জমি দখল করে সেখানে নির্মাণ অব্যাহত রাখে। অভিযোগ রয়েছে, এই স্থাপনাটি ধীরে ধীরে একটি সংগঠনিক ঘাঁটি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের নিরাপদ আশ্রয়ে রূপ নিচ্ছিল।

উচ্ছেদ অভিযানের মুহূর্তে ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সশস্ত্র কমান্ডার হিসেবে পরিচিত নানিয়ারচরের সচিব চাকমার নির্দেশনায় লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘবদ্ধ আক্রমণ চালানো হয় বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর। এই হামলায় বনরক্ষি আশরাফুল আলম গুরুতরভাবে আহত হন। তার চোখে মারাত্মক আঘাত লাগে। এখানেই ঘটনাপ্রবাহ থেমে থাকেনি। হামলাকারীরা পরে মাচালং বাজারে অবস্থিত বন বিভাগের কার্যালয়ে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র নষ্ট করা হয়, একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয় এবং আহত বনরক্ষিকে অপহরণের চেষ্টা চলে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ রূপ দেয়।

খবর পেয়ে সেনাবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অপহরণের হাত থেকে আশরাফুল আলমকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। সেনাবাহিনীর এই দ্রুত ও সংযত হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেওয়া থেকে রক্ষা করে, এ কথা অনস্বীকার্য।

তবে এখানেই সহিংসতার পরিসমাপ্তি ঘটেনি। ইউপিডিএফের সহযোগী অঙ্গসংগঠন হিসেবে পরিচিত হিল উইমেন্স ফেডারেশন এবং পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কর্মীরা, বিশেষ করে নারী সদস্যদের সামনে রেখে, সাজেক সড়কে গাছ কেটে যানচলাচল বন্ধ করে দেয়। এই অবরোধে আটকে পড়ে শতশত পর্যটক, স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং এমনকি সাজেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরাও। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিয়েতে আগত নারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মুখে রেখে সড়কে এনে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। সেনাবাহিনীর সঙ্গে উত্তেজনা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হয়, যা একটি কৌশলগত মানবঢাল ব্যবহারের ইঙ্গিত বহন করে।

পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউপিডিএফ-ঘনিষ্ঠ একাধিক আইডি থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা। সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে উসকানিমূলক বর্ণনা ছড়িয়ে উত্তেজনা বাড়ানোর একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু সেনাবাহিনী এই পাতানো ফাঁদে পা না দিয়ে কৌশলগত সংযম ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দেয়। তারা ধীরে, শান্তভাবে সড়ক থেকে গাছ সরিয়ে যানচলাচল স্বাভাবিক করে, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে এক দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা পালন করে।

এই ঘটনাপ্রবাহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বন বিভাগ ও ইউপিডিএফের মধ্যকার পূর্ববর্তী সম্পর্ক নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের গুঞ্জন। স্থানীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, অতীতে কাঠ ও বাঁশ সংক্রান্ত বিষয়ে সাজেকে ইউপিডিএফ বন বিভাগের সহায়তায় নিয়মিত চাঁদা আদায় করত; এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামের সমগ্র এলাকায় বন বিভাগ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে শোনা যাচ্ছে। ইউপিডিএফ, জেএসএস ও কেএনএফ এর অর্থনীতি সচল রাখার অন্যতম চাঁদার উৎস অবৈধ কাঠ, যা বন বিভাগ পাচারে এবং চাঁদা আদায়ে সহযোগী হিসেবে কাজ করে। বন উজাড় করে প্রতিনিয়ত কাঠ ও জ্বালানি কাঠ বন বিভাগের সহযোগিতা ছাড়া কীভাবে যাচ্ছে? যদিও এ ধরনের অভিযোগ বন বিভাগের প্রতি ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, তবুও এই সংঘাত দেখিয়ে দেয় যে, যখন বন বিভাগের জমিতে স্কুলের নামে স্থায়ী দখল এবং সেই স্থাপনাকে সশস্ত্র সংগঠনের কার্যক্রমের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে, তখন স্বার্থের সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ও প্রশ্নবিদ্ধ বিষয় হলো: যে সংগঠনটি বছরের পর বছর পাহাড়ে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও সড়ক নির্মাণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তারাই হঠাৎ করে ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। সচেতন মহলের মতে, এটি কোনো স্বাভাবিক শিক্ষা উদ্যোগ নয়; বরং একটি কৌশলগত আবরণ, যার আড়ালে সাংগঠনিক বিস্তার ও প্রভাববলয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।

বন বিভাগের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এই বক্তব্য প্রশাসনিক সদিচ্ছার ইঙ্গিত দিলেও প্রশ্ন থেকে যায়, পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সন্ত্রাসবাদ-শাসন, অবৈধ দখল এবং সশস্ত্র প্রভাববলয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কি ধারাবাহিক ও দৃঢ় অবস্থান নিতে পারবে?

সাজেকের এই ঘটনা আসলে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এটি দেখিয়ে দেয়, পাহাড়ে উন্নয়ন, আইন ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং এর জন্য প্রয়োজন সুসংহত নীতি, অবিচল প্রশাসনিক দৃঢ়তা, বিচ্ছিন্নতাবাদী বিরোধী কঠোর নীতি এবং রাষ্ট্রের বাঙালি জনগণসহ সকল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পেশাদার ও সংযত ভূমিকা। অন্যথায়, ‘স্কুল’, ‘নারী আন্দোলন’ বা ‘অধিকার’—এই শব্দগুলো ব্যবহার করে সন্ত্রাসী তৎপরতা ঢেকে রাখার প্রবণতা আরও গভীরতর হবে।

সাজেক আজ শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়; এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও দৃঢ়তার একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। এই পরীক্ষায় ব্যর্থতার মূল্য শুধু একটি বন অফিস বা একটি উচ্ছেদ অভিযান নয়, এর মূল্য হতে পারে পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি।

 

আগের পোস্টরাঙামাটিতে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে অসহায়, গরিব ও এতিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ।
পরের পোস্টবান্দরবানের বন উজাড় ও অবৈধ কাঠ পাচারে ভয়ঙ্কর চক্রের দাপট।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন