হিল নিউজ বিডি প্রতিনিধি
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সহাবস্থান ও মানবিক অগ্রযাত্রার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে যে সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত, তার নাম ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরোধিতা করে ১৯৯৮ সালে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করা এই বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনটি শুরু থেকেই পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব অস্বীকার, বাঙালি নিধন, চুক্তি সমর্থকদের হত্যা এবং সশস্ত্র আধিপত্য বিস্তারের পথে হাঁটছে।
প্রসীত বিকাশ খীসা ও রবি শংকর চাকমার নেতৃত্বে গঠিত ইউপিডিএফ নিজেদেরকে জাতিগত অধিকারের ধারক হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে তারা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকেই একটি জিম্মি সমাজে পরিণত করেছে। অপহরণ, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, অস্ত্রের মহড়া ও প্রকাশ্য হুমকির মাধ্যমে সাধারণ পাহাড়িদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে তারা কায়েম করেছে সন্ত্রাসের রাজত্ব।
এর সাম্প্রতিক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে রাঙামাটির কাউখালী উপজেলায়। শীতের তীব্রতা যখন পাহাড়ে জীবনযাপনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, যখন দুর্গম এলাকার হতদরিদ্র পাহাড়ি পরিবারগুলো বস্ত্রহীন অবস্থায় কনকনে শীতে দিন কাটাচ্ছে—ঠিক সেই সময়ে মানবিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসে সেনাবাহিনী। শীতবস্ত্র বিতরণ, শিক্ষা সহায়তা, ক্রীড়া সামগ্রী ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে সেনাসদস্যরা ছুটে যান প্রত্যন্ত জনপদে।
কিন্তু এই মানবিক উদ্যোগই ইউপিডিএফের কাছে হয়ে ওঠে ‘অপরাধ’।
জানা গেছে, অদ্য বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) পানছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ও তালুকদার পাড়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে রাঙামাটি সদর জোনের সেনাবাহিনীর উদ্যোগে শীতবস্ত্র, শিক্ষা ও ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণের আয়োজন করা হয়। লক্ষাধিক টাকার এই কর্মসূচিকে ঘিরে সকাল ৯টায় সেখানে উপস্থিত হন জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. একরামুল রাহাত, পিএসসি, কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী আতিকুর রহমান, কাউখালী থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল খালেক, ৩নং ঘাগড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ।
কিন্তু আয়োজনস্থলে গিয়ে তারা দেখতে পান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কেউ নেই। শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসেনি। মাঠ শূন্য। এলাকায় শুনশান নীরবতা। এর পেছনের কারণ দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, গত ৪৮ ঘণ্টায় পানছড়ি, শুকনাছড়ি, উল্টোপাড়া, রাঙ্গীপাড়া ও তালুকদার পাড়ায় ইউপিডিএফ ব্যাপক হুমকি প্রদর্শন করে। কাউখালী ইউনিটের পরিচালক রিপন চাকমা, সহকারী পরিচালক নিলয় চাকমা, সাব-পোস্ট পরিচালক তারেক মারমা, রাজু মারমা ও অমিয় চাকমার নেতৃত্বে এলাকায় এলাকায় সেনাবিরোধী অপপ্রচার চালানো হয়। কার্বারী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেও জনগণকে অনুষ্ঠানে না যেতে নিষেধ করা হয়।
ইউপিডিএফ নেতারা পাহাড়িদের প্রকাশ্যে হুমকি দেয়—কেউ যদি সেনাবাহিনীর সহযোগিতা গ্রহণ করে, তবে তাকে তথাকথিত “হাংগর মাছ” নামের বিশেষ মাছ দিয়ে শরীরে ঘর্ষণ করে শাস্তি দেওয়া হবে এবং প্রতি পরিবারকে এক লক্ষ টাকা জরিমানা করা হবে।
এই ভয়ভীতি ও অর্থদণ্ডের হুমকিতে অসহায় পাহাড়িরা বাধ্য হয়ে শীতবস্ত্র গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। একইভাবে পানছড়ি ও তালুকদার পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও ক্রীড়া সামগ্রী থেকেও বঞ্চিত হয়। মানবিক সহায়তা ঠেকাতে অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার—এর চেয়ে নৃশংসতা আর কী হতে পারে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাহাড়ি বলেন, “আমাদের ঘরে ঘরে অস্ত্র নিয়ে এসে নিষেধ করা হয়েছে। আমরা সেনাবাহিনীকে ভালোবাসি, কিন্তু তা প্রকাশ্যে বলতে পারি না। অস্ত্রের ভয়ে আমরা বোবা হয়ে আছি। আমাদের কান্না কেউ শোনে না।”
একজন শিক্ষক বলেন, “সভ্যতার এই যুগে একটি জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রাখার জন্য যেভাবে সন্ত্রাসী কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে, তা মধ্যযুগকেও হার মানায়। সরকার যেখানে প্রান্তিক পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কল্যাণমূলক কাজ করছে, সেখানে এভাবে মৌলিক অধিকার আটকে রাখা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।”
উল্লেখযোগ্য যে, সেনাবাহিনী ও অতিথিরা সেবা গ্রহণকারী পাহাড়িদের উপস্থিতি না দেখে ফিরে যাওয়ার পর ইউপিডিএফ পানছড়ির কয়েকটি পাহাড় থেকে সশস্ত্র মহড়া দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। সাব-পোস্ট পরিচালকরা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরাফেরা করে নিজেদের আধিপত্য জাহির করে।
কাউখালী উপজেলার এক বাসিন্দা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ইউপিডিএফ এখানে চাঁদাবাজি ও সাংগঠনিক কার্যক্রম বহুগুণে বাড়িয়েছে। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে সহযোগী অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠনসহ নানা তৎপরতা চালাচ্ছে তারা।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, ইউপিডিএফ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার সংগঠন নয়; বরং তারা মানবিকতা, শিক্ষা ও কল্যাণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একটি সশস্ত্র বাধা। শীতবস্ত্র ঠেকানো, শিশুদের স্কুলমুখী হওয়া রোধ করা এবং সহায়তা গ্রহণে হুমকি দেওয়া—এটাই তাদের তথাকথিত রাজনীতির আসল চেহারা।
পাহাড়ের শান্তি, মানবিকতা ও ভবিষ্যৎকে জিম্মি করে রাখা এই সন্ত্রাসী কাঠামো ভাঙা এখন সময়ের দাবি।



