রাঙামাটি ও চট্টগ্রাম যৌথ প্রতিনিধি: রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে ফেরি করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন সহিদ খাঁ (৩৫) নামে এক ফেরিওয়ালা ব্যবসায়ী। বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) সকাল আনুমানিক ৮টায় চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রানীরহাট বাজার বস্তি এলাকা থেকে কাউখালীর উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর থেকে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
নিখোঁজ সহিদ খাঁ’র পিতার নাম শুক্কুর আলী। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রানীরহাট বাজার বস্তি এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করলেও তার স্থায়ী ঠিকানা রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলার মাইনীমুখ এলাকা। জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ও রাঙামাটির কাউখালীর বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ফেরি করে কসমেটিকস, শিশুদের খেলনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল বিক্রি করে আসছিলেন।
ফেরি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং একই বস্তির ভাড়াটিয়া সাইফুল ইসলাম নিখোঁজের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সহিদ খাঁ প্রায়শই কাউখালী উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় যাতায়াত করতেন। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে তালুকদার পাড়া, উল্টো রাঙ্গীপাড়া, উল্টো পাড়া, পানছড়ি, শুকনাছড়ি, মুবাইছড়ি, চেলাছড়া, নোয়াআদম, লেভারপাড়া, কলমপতি মাঝেরপাড়া, বড়ঢুলু, তারাবুনিয়া ও বেতবুনিয়ার সোনাইছড়ি, বড়বিলি, চৌধুরীপাড়া প্রভৃতি। তবে নিখোঁজের দিন তিনি কাউখালী থেকে পানছড়ির দিকে গিয়েছিলেন বলে ধারণা।
উল্লেখ্য, এর আগেও প্রায় দেড় বছর আগে সহিদ খাঁ কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড পানছড়ি এলাকায় ফেরি করতে গিয়ে পার্বত্য চুক্তি বিরোধী একটি সশস্ত্র সংগঠনের হাতে আটক হন। সে সময় তাকে প্রায় ৪০ হাজার টাকা প্রদান করে মুক্তি পেতে হয়েছিল। ফলে বর্তমান নিখোঁজের ঘটনাটিও একই ধরনের কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না—তা নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কাউখালী উপজেলার বহু পাহাড়ি এলাকা দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চুক্তি বিরোধী সন্ত্রাসী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নিয়ন্ত্রিত। এসব এলাকায় তথাকথিত ‘চাঁদার টোকেন’ ছাড়া কোনো ব্যবসায়ীকে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতেও চেলাছড়া, নোয়াআদম ও লেভারপাড়া এলাকায় একাধিক ফেরিওয়ালাকে মারধর, নির্যাতন এবং টাকা ও মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
তবে সহিদ খাঁ’র নিখোঁজের ঘটনায় ইউপিডিএফ সরাসরি জড়িত কি না, নাকি তিনি আদৌ কাউখালীর পাহাড়ি এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন কি না—এসব বিষয় নিশ্চিতভাবে বলতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। নিখোঁজের সময় তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বর ০১৬১৬-২৩৩৮৪৩ বর্তমানে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। প্রযুক্তিগত সহায়তায় সর্বশেষ অবস্থান শনাক্ত এবং কল রেকর্ডসহ অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করা গেলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে নিখোঁজের ঘটনায় সহিদ খাঁ’র আপন ফুফাতো ভাই কাউখালী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে ভিকটিমের বর্তমান ঠিকানা রাঙ্গুনিয়া উল্লেখ করে কাউখালী থানা জিডি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। তাকে রাঙ্গুনিয়া থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে ফেরিওয়ালাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ফেরিওয়ালা ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমরা হয়তো পেশায় ছোট, কিন্তু আমরা তো মানুষ। আইনগতভাবে কি কোথাও বলা আছে যে নিখোঁজের জিডি সংশ্লিষ্ট এলাকার থানায় করা যাবে না? বরং যেখান থেকে মানুষ নিখোঁজ হয়, তদন্তের স্বার্থে সেই থানায় জিডি গ্রহণ করাই তো বেশি যুক্তিসঙ্গত।”
নিখোঁজ সহিদ খাঁ’র পরিবার ও সহকর্মীরা দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, কার্যকর অনুসন্ধান এবং নিরাপদ উদ্ধার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন। পাহাড়ি অঞ্চলে ফেরিওয়ালাদের নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এই ঘটনায়।



