ইউপিডিএফের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও চাঁদাবাজিতে পিষ্ট জনজীবন: এক অদৃশ্য ইতিহাস

0
ছবি: ইউপিডিএফ এর দলীয় পতাকা

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সহিংসতা, সশস্ত্র রাজনীতি ও ছদ্ম-আন্দোলনের আবরণে গড়ে ওঠা চাঁদাবাজি সংস্কৃতি আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং তা একপ্রকার প্রাতিষ্ঠানিক সন্ত্রাসে রূপ নিয়েছে। বিশেষত ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে চলমান গণচাঁদাবাজি পাহাড়ের জনজীবনকে যেভাবে নিষ্ঠুরভাবে পদদলিত করছে, তা রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর যখন একটি সম্ভাবনাময় শান্তির পথ উন্মুক্ত হওয়ার কথা ছিল, তখনই তার বিরোধিতার পতাকা হাতে নিয়ে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় এক প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে ইউপিডিএফ-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সন্তু লারমা গ্রুপের তৎকালীন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে গঠিত এই সংগঠন শুরু থেকেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি এক প্রকার প্রকাশ্য বৈরিতা লালন করে এসেছে। স্বায়ত্তশাসনের নামে পার্বত্য চুক্তিকে ‘আপস’ আখ্যা দিয়ে তারা পাহাড়ে একটি বিকল্প ক্ষমতা-কাঠামো নির্মাণের পথে হাঁটে, যার প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে ওঠে চাঁদাবাজি।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: উৎসব নয়, চাঁদাবাজির মৌসুম হিসেবে ইউপিডিএফ মনে করে। আগামী ২৬ ডিসেম্বর ইউপিডিএফ-এর ২৭ত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই জেলার ১২টি উপজেলার ৪৫টি ইউনিয়নের ৪০৫টি ওয়ার্ড এবং প্রায় ২০০০ পাড়াজুড়ে যে গণহারে চাঁদা উত্তোলন চলছে, তা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির স্বাভাবিক অর্থসংগ্রহ নয়—এটি একেবারেই সশস্ত্র জবরদস্তি।

পরিবার, ব্যক্তি, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বড় ঠিকাদার, ইটভাটা মালিক, সিএনজি চালক, ভাড়া মোটরসাইকেল চালক, করাতকল, কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায়ী—এমন কোনো শ্রেণি নেই যারা এই চাঁদার তালিকার বাইরে। টোকেন বিক্রির নামে বেপরোয়া অর্থ আদায়ের ফলে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ আজ কার্যত অর্থনৈতিক দাসত্বে আবদ্ধ।

দীঘিনালার বাবুছড়ার এক পাহাড়ি বাসিন্দার বক্তব্য এই বাস্তবতার নির্মম দলিল— “আমি প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা নিয়মিত দিই। কিন্তু এবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর নামে এক লাখ টাকা চেয়েছে। এই টাকা দিলে ঘরের বাজার, ছেলেমেয়েদের প্রয়োজন—সব বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু না দেওয়ার কোনো পথ নেই।”

পানছড়ি, গুইমারা, মানিকছড়ি, রামগড়, মহালছড়ির মাইছড়ি, লক্ষীছড়ির বর্মাছড়ি এবং বাঘাইছড়ি সাজেক —সব জায়গা থেকেই একই অভিযোগ উঠে আসছে। আয়-ব্যয়ের সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য না রেখেই চাঁদার অঙ্ক নির্ধারণ করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ঘরে ঘরে হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায় করা হয়েছে, আবার অনেক স্থানে তথাকথিত লোকাল কালেক্টরদের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি ও পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের কয়েক শতাধিক ইটভাটা থেকে মোবাইল ফোনে চাঁদা আদায়, কাঠ-বাঁশ ব্যবসায়ীদের কুতুকছড়ি, নানিয়ারচর, কাউখালীর ঘাগড়া, ফটিকছড়ি, বন্দুকভাঙা ডেকে এনে অর্থ নেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে—ইউপিডিএফের চাঁদাবাজি এখন আর স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি আঞ্চলিক সন্ত্রাসী অর্থনীতি।

স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষায়, এই চাঁদাবাজি এখন পাহাড়ের কালচারে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের কার্যকর কোনো বাধা না থাকায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র শক্তির কাছে সাধারণ জনগোষ্ঠী কার্যত বন্দি।

চাঁদার অর্থ কোথায় যায়?

বিশ্লেষক মহলের ধারণা, উত্তোলিত বিপুল অর্থের সিংহভাগই সিনিয়র নেতাদের ব্যক্তিগত ভোগবিলাস ও সাংগঠনিক ক্ষমতা সংহতকরণে আত্মসাৎ হয়। খুব সামান্য অংশ ২৬ ডিসেম্বরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে ব্যয় হয়—দলীয় পতাকা উত্তোলন, অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শিশু র‍্যালি, কুচকাওয়াজ, আলোচনা সভা ও চা-চক্র।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—২৬ ডিসেম্বর স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী ও কোমলমতি শিশুদের দিয়ে কালো ব্যাজ ধারণ, প্যারেড, কুচকাওয়াজ ও সালাম গ্রহণের আয়োজন। একটি সন্ত্রাসী সংগঠন কীভাবে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্রের মতো প্যারেড ময়দান তৈরি করে শিক্ষার্থীদের সালাম গ্রহণ করে—তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এটি নিছক রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহী মনস্তত্ত্ব তৈরির কারখানা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনে বাঙালি, সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বিদ্বেষ সঞ্চার করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহে রূপ নিতে পারে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এখানে কোনো সংগঠন রাষ্ট্রীয় নীতিমালাকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রের আদলে দিবস পালন, প্যারেড বা শিশুদের ব্যবহার করতে পারে না। শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা, ইউএনও, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এই বিষয়ে উদাসীনতা অব্যাহত থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদের তীব্রতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, যার পরিণতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই ভোগ করতে হবে।

ইউপিডিএফ-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে চলমান এই চাঁদাবাজি ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের অংশ। পাহাড়ের সাধারণ মানুষের নীরব আর্তনাদ, শিশুদের মননে বিষ বপন, অর্থনীতির শিরায় সন্ত্রাস—সব মিলিয়ে এটি একটি সমন্বিত রাষ্ট্রবিরোধী প্রকল্প।

এখন প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি আর নীরব থাকবে, নাকি এই নীরবতার মূল্য একদিন অখণ্ডতার বিনিময়ে দিতে হবে?

আগের পোস্টকাউখালীতে ইউপিডিএফের ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে ব্যাপক চাঁদাবাজি
পরের পোস্টরাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর উদ্যোগে বিশুদ্ধ পানির প্রকল্প বাস্তবায়ন।

রিপ্লাই দিন

আপনার কমেন্ট লিখুন
আপনার নাম লিখুন