চার ইউনিয়নের শতাধিক পাড়ায় আতঙ্ক, জনজীবন বিপর্যস্ত:
রাঙামাটির কাউখালী উপজেলায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। আগামী ২৬ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের অজুহাতে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই উপজেলার চারটি ইউনিয়নের শতাধিক পাড়া থেকে গণহারে চাঁদা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে সংগঠনটির বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পরিবার, ব্যক্তি, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, ইটভাটা, সিএনজি চালক, ভাড়া মোটরসাইকেল চালক থেকে শুরু করে কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও খেয়ালখুশিমতো নির্ধারিত হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। কোথাও টোকেন বিক্রির মাধ্যমে, কোথাও সরাসরি হুমকি দিয়ে চাঁদা তোলা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের জনজীবন চরমভাবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
লেভারপাড়ার এক পাহাড়ি বাসিন্দা বলেন, “আমি প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা গণচাঁদা দিই। বিভিন্ন সময় আরও যা চায় তা দিতে হয়। এবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর নামে ১৫ হাজার টাকা চেয়েছে। এই টাকা দিলে ঘরের বাজার, ছেলে-মেয়েদের প্রয়োজন—সবই বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু না দিলে উপায় কী?”
ফটিকছড়ি ডাবুয়া ও বর্মাছড়ি এলাকার একাধিক দোকানদার অভিযোগ করে বলেন, পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় এবার চাঁদার অঙ্ক অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। “সারাজীবন দোকান করে যা আয় করি, তার বড় অংশই চলে যায় চাঁদায়। এবার এই টাকা দিতে গিয়ে মারাত্মক সংকটে পড়তে হবে,”—বলেন এক ব্যবসায়ী।
একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে মানিকছড়ি পাড়া, পচুপাড়া, বেতবুনিয়া চৌধুরী পাড়া, কলমপতি মাঝেরপাড়া ও কোলাপাড়া এলাকার পাহাড়ি গ্রামবাসী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও।
হুমকি দিয়ে ঘরে ঘরে চাঁদা: নাভাঙা, বরইছড়ি, নাকশাছড়ি, হাজাছড়ি, পানছড়ি, উল্টোপাড়া, নিজপাড়া, যৌথখামার ও মিতাঙ্গ্যাছড়ি এলাকায় ঘরে ঘরে হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক জায়গায় স্থানীয় কালেক্টরের মাধ্যমে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া এলাকার কয়েকটি ইটভাটা থেকে মোবাইল ফোনে চাঁদা আদায় করা হয়েছে। পাশাপাশি লেভাপাড়া, নোয়াআদম, কজইছড়ি ও উল্টোপাড়া এলাকায় ডেকে এনে কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ধারণা, ইউপিডিএফের দীর্ঘদিনের লাগাতার চাঁদাবাজি এখানকার মানুষের জীবনকে পিষ্ট করে ফেলেছে। প্রশাসনের কার্যকর কোনো বাধা না থাকায় চাঁদাবাজি এখন যেন একটি ‘কালচারে’ পরিণত হয়েছে। ইউপিডিএফের সশস্ত্র শক্তির ভয়ে সাধারণ জনগোষ্ঠী কার্যত জিম্মি অবস্থায় রয়েছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আড়ালে অর্থ বাণিজ্য: স্থানীয় সূত্রের দাবি, সংগৃহীত চাঁদার বড় একটি অংশ সিনিয়র নেতাদের হাতে আত্মসাৎ হয়, আর সামান্য অংশ ব্যয় করা হয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে। জানা গেছে, ২৬ ডিসেম্বর সকাল ৮টা থেকে কর্মসূচির মধ্যে থাকবে দলীয় পতাকা উত্তোলন, অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে কথিত শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, শিশু র্যালি, শিশু-কিশোরদের কুচকাওয়াজ, আলোচনা সভা ও চা-চক্র।
এদিকে, ক্রমবর্ধমান চাঁদাবাজির এই চক্র বন্ধে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দারা।



