রাষ্ট্র যখন বৈষম্যবিরোধী চেতনার বুলি আউড়ে, তখন সেই রাষ্ট্রেরই একটি জেলা পরিষদ যদি নিয়োগের তালিকায় এমন এক নগ্ন সংখ্যাগত বৈপরীত্য হাজির করে—যেখানে ৩০ জনের মধ্যে ২৯ জন উপজাতি এবং মাত্র ১ জন বাঙালি—তবে প্রশ্ন জাগে: এটি কি নিয়োগ, না কি পরিসংখ্যানের নামে পরিকল্পিত উপহাস?
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও ERRD-CHT, UNDP-এর যৌথ বাস্তবায়নাধীন BERCR প্রকল্পের AIGA & Biodiversity Facilitator পদে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফল বিবরণী অনুযায়ী, নির্বাচিত ও অপেক্ষমান মোট ৩০ জনের মধ্যে ২৯ জনই উপজাতি সম্প্রদায়ের, এবং মাত্র ১ জন বাঙালি। শতাংশের হিসেবে এই চিত্র দাঁড়ায়—
উপজাতি নিয়োগ: ৯৬.৬৭ শতাংশ।
বাঙালি নিয়োগ: ৩.৩৩ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান কি কেবল কাকতালীয়? নাকি এর পেছনে আছে সচেতন কাঠামোগত পক্ষপাত?
কোটা নীতি বনাম নিয়োগ বাস্তবতা: কে কাকে উপহাস করছে? ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে সরকার স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দেয়—উপজাতিদের জন্য মাত্র ১ শতাংশ কোটা বহাল থাকবে। এর অর্থ কী? এর অর্থ, রাষ্ট্রীয় নিয়োগে উপজাতিদের অংশগ্রহণ বিশেষ সুবিধা নয়, বরং সীমিত সংরক্ষণ।
কিন্তু এখানে যদি সত্যিই ১ শতাংশ কোটার নীতিমালা অনুসরণ করা হতো, তবে ৩০ জনের তালিকায় ২৯ জন উপজাতি থাকার কথা নয়—এটি গণিতের দৃষ্টিতেই অসম্ভব। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই:
এই নিয়োগ কি কোটা নীতির বাস্তবায়ন, না কি কোটা নীতিকে ব্যঙ্গ করার এক অভিনব কৌশল?
চাকমা আধিপত্য: বৈচিত্র্যের নামে একক প্রাধান্য— আরও গভীরে তাকালে চিত্রটি আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে। ২৯ জন উপজাতির মধ্যে— ১৫ জন চাকমা, ৭ জন মারমা, ৫ জন তঞ্চঙ্গ্যা, ২ জন পাংখোয়া।
এদের নাম হচ্ছে— ১. জেসমিন পাংখোয়া
২. জে পি এল পাংখোয়া, ৩. স্যাধনা চাকমা, ৪. সীমা চাকমা, ৫. নমর জীব চাকমা, ৬. স্নেহ দেবী চাকমা, ৭. হিতৈষী চাকমা, ৮. জেসমি চাকমা, ৯. প্রেম লাল চাকমা, ১০. সহেলী চাকমা, ১১. মিতা তঞ্চঙ্গ্যা, ১২. রাসেল চাকমা, ১৩. এলিন চাকমা, ১৪. মেখন চাকমা, ১৫. অমর কান্তি চাকমা, ১৬. জরিনা চাকমা
১৭. মিতু মনি চাকম্য, ১৮. জ্যোৎস্না তঞ্চঙ্গ্যা, ১৯. সঞ্জয় তঞ্চঙ্গ্যা, ২০. রিনুকা চাকমা, ২১. আনন্দজয় তঞ্চঙ্গ্যা, ২২. আশা রানী তঞ্চঙ্গ্যা, ২৩. দুইসাই মারমা
২৪. চিংমাসাং মারমা, ২৫. উথাই মারমা ২৬. ক্রানুচিং মারমা, ২৭. চাথুইচিং চৌধুরী
২৮. মিথুইচিং মারমা, ২৯. উমংচিং মারমা, ৩০. রহিমা আক্তার।
অর্থাৎ মোট নিয়োগের ৫০ শতাংশেরও বেশি চাকমা সম্প্রদায়ের। তাহলে কি এখানে “উপজাতি” শব্দটি আসলে একটি বহুবর্ণ সামাজিক পরিচয় নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আধিপত্যের আড়াল?
যদি নিয়োগে বৈচিত্র্যই লক্ষ্য হতো, তবে একই উপজাতির এতজন কীভাবে তালিকাভুক্ত হয়? এটি কি প্রশাসনিক অন্ধত্ব, না কি ইচ্ছাকৃত পক্ষপাত?
জেলা পরিষদের২০০০ সালের আইন: কাগজে-কলমে নাকি বাস্তবতায়?রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ২০০০ সালের হস্তান্তরিত দপ্তর সংক্রান্ত আইন স্পষ্টভাবে বলছে— “উপজাতীয় ও অ-উপজাতীয়দের মধ্যে সংখ্যানুপাত যথাসম্ভব বজায় রাখতে হবে।”
এখানে “যথাসম্ভব” শব্দটি কি এতটাই নমনীয় যে ৯৬.৬৭ শতাংশ বনাম ৩.৩৩ শতাংশকেও বৈধ বলে মেনে নেয়? যদি তাই হয়, তবে আইন আর নৈতিকতার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
অভিযোগের পাহাড়: চেয়ারম্যানের ভূমিকায় প্রশ্নচিহ্ন। বাঙালি অধিবাসীদের অভিযোগ নতুন নয়। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের অভিযোগ ক্রমশ ঘনীভূত হয়েছে। এক পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ পর্যন্ত স্থগিত হয়ে যায়—যা কোনো সুস্থ প্রশাসনিক পরিবেশের লক্ষণ নয়।
আরিফুল ইসলাম নামের এক বাঙালি নাগরিকের ভাষ্যে, কাজল তালুকদার হচ্ছেন একজন সাম্প্রদায়িক মানসিকতার ব্যক্তি, যিনি নিজ চাকমা সম্প্রদায়কে অতিরঞ্জিত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন এবং অন্য উপজাতি ও বাঙালিদের প্রতি চরম বৈষম্য প্রদর্শন করেন। এসব অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক—প্রশ্ন থেকে যায়: এত অভিযোগের পরও কি নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হওয়া উচিত ছিল না? তিনি বৈষম্য করার জন্য অনেক সময় নির্বাচিতদের নাম প্রকাশ না করে শুধু কৌশলে রুল নাম্বার প্রকাশ করেন।দ!
নির্বাচিত নন, তবু ক্ষমতাবান: নৈতিকতার দ্বন্দ্ব। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি কোনো নির্বাচিত চেয়ারম্যান নন। বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলনের ফলস্বরূপ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগে তাকে এই পদে আসীন করা হয়েছে। অথচ সেই আন্দোলনের মূল চেতনাই ছিল বৈষম্যের অবসান। তাহলে আজ যদি তার আমলেই এমন একতরফা নিয়োগ হয়, তবে সেই আন্দোলনের আত্মা কি আজ উপহাসের পাত্র নয়?
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বৈষম্য? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসন, নাৎসি জার্মানির আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ, কিংবা রুয়ান্ডার হুতু-তুতসি বিভাজন—সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর সংখ্যাগত পক্ষপাত একসময় ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে।
তবে পার্থক্য হলো—সেসব উদাহরণে বৈষম্য ছিল প্রকাশ্য নীতি। আর এখানে? এখানে বৈষম্য ঘটছে কোটা, উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তির ভাষা ব্যবহার করে।
এটাই কি আধুনিক বৈষম্যের নতুন রূপ?
প্রশ্ন থেকেই যায়।
উল্লেখ যে, আরও একটি বাস্তবতা এখানে উপেক্ষা করা যায় না। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা মোট ১০টি উপজেলা নিয়ে গঠিত হলেও আলোচিত এই নিয়োগের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে মাত্র ৪টি উপজেলার পরীক্ষার্থীদের ভিত্তিতে। অর্থাৎ পুরো জেলারও অর্ধেকের কম এলাকার ফলাফলেই যদি ৩০ জনের মধ্যে ২৯ জন উপজাতি ও মাত্র ১ জন বাঙালি নির্বাচিত হন, তবে বাকি ৬টি উপজেলার ফলাফল কেমন হতে পারে—তা বুঝতে আলাদা কোনো গবেষণা বা অনুমানের প্রয়োজন পড়ে না। চার উপজেলার এই একতরফা চিত্রই কার্যত ভবিষ্যতের রূপরেখা এঁকে দিচ্ছে। যদি এখানে সংখ্যানুপাত, কোটা নীতি ও আইনি ভারসাম্য এভাবে উপেক্ষিত হয়, তবে অবশিষ্ট ছয় উপজেলায় সেই ধারা আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও আরও স্বাভাবিক রূপ নেবে—এটাই যুক্তির স্বাভাবিক পরিণতি। ফলে এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো নিয়োগ তালিকা থাকে না; বরং পুরো জেলার নিয়োগ কাঠামোর চরিত্রই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো সম্প্রদায়কে আঘাত করা নয়। উদ্দেশ্য একটাই—সংখ্যা দিয়ে প্রশ্ন তোলা। ৩০ জনের মধ্যে ২৯ জন উপজাতি হলে সেটি হয় ৯৬.৬৭ শতাংশ। এই সংখ্যা কোনো অনুভূতি নয়, এটি কঠিন বাস্তবতা।
যদি এই বাস্তবতাকে প্রশ্ন করা অপরাধ হয়, তবে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক আত্মাই প্রশ্নবিদ্ধ। আর যদি প্রশ্ন করা যায়, তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। প্রশ্ন একটাই— এটি কি ন্যায্য নিয়োগ, না কি সংখ্যাগত বৈষম্যের এক সুপরিকল্পিত প্রদর্শনী?



