বান্দরবানের রুমা উপজেলার কেওক্রাডং সংলগ্ন দুর্গম সুংসুয়াং পাড়া দীর্ঘদিন ধরেই পিছিয়ে পড়া বম জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি হিসেবে পরিচিত। গত ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) বা কেএনএ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘাতের ফলে পাড়া অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এতে বম সম্প্রদায়ের অনেক পরিবার আশ্রয় নিতে বাধ্য হন ভারতের মিজোরাম এবং সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায়। বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়, কেএনএফ কিছু পরিবারকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের শরনার্থী করে।

এই সংকটময় সময়ে সেনাবাহিনী তৎপর ভূমিকা গ্রহণ করে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য পরিচালিত বিশেষ অভিযানের ফলে কেএনএফ সদস্যদের আধিপত্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এর প্রভাবে অনেক পরিবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করে। সেনাবাহিনী এই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নে বাস্তুচ্যুত পরিবারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন ইতোমধ্যে ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে, যার মাধ্যমে প্রত্যাবর্তনকারী বম পরিবারদের পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গত ১৮ নভেম্বর ২০২৪ থেকে কার্যক্রম বাস্তবায়িত হতে শুরু করে এবং এ পর্যন্ত ২০২টি পরিবার, মোট ৫০৩ জন সদস্য তাদের নিজ নিজ পাড়ায় ফিরে এসেছে। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ও সহায়তা এই পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ ও আত্মনির্ভরশীল পরিবেশ নিশ্চিত করেছে।
পুনর্বাসিত পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নের জন্য সেনাবাহিনী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। গত ৫ জুন ২০২৫ থেকে রুমা উপজেলার বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্থান পর্যটকদের জন্য খোলা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আয় সৃষ্টির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ সুগম হয়েছে।
সুংসুয়াং পাড়ার জীবনযাত্রা উন্নয়নে সেনাবাহিনী সরাসরি পদক্ষেপ নিয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২১০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই অঞ্চলে সম্প্রতি বম জনগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য একটি ইকো রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রাথমিক উদ্বোধন আজ শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম রাকিব ইবনে রেজওয়ান, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, রিজিয়ন কমান্ডার, বান্দরবান রিজিয়ন কর্তৃক সম্পন্ন হয়।
‘দি ম্যাজিস্টিক টাইগার্স’ (১৬ ই বেংগল) সেনা সদস্যরা পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপের সাথে যুক্ত ছিলেন। তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সমস্ত ধরনের প্রযুক্তিগত ও প্রায়োগিক সহায়তা প্রদান করেছেন। ২৪ পদাতিক ডিভিশনের অর্থায়নে এই প্রকল্পে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে। রিসোর্টটির মালিকানা এবং পরিচালনার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় বম জনগোষ্ঠীর হাতে থাকবে।
রিসোর্টের ফলে প্রত্যাবর্তনকৃত বম সম্প্রদায়ের সদস্যদের জন্য সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ ও পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন হবে। রিসোর্ট থেকে অর্জিত আয়ের সম্পূর্ণ অংশ শিক্ষাক্ষেত্র, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হবে। এটি শুধু আর্থিক স্বাবলম্বী হওয়ার পথ সুগম করবে না, বরং সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পর্যটন শিল্পের বিকাশেও ভূমিকা রাখবে।
সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগটি শুধু অর্থায়ন বা নির্মাণের কাজ নয়; এটি একটি মানবিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ। সশস্ত্র সংঘাত হ্রাসের পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য এই ধরনের কার্যক্রম স্থানীয়দের আত্মনির্ভরশীলতা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য অঞ্চলেও সেনাবাহিনী এই ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। কেবল নিরাপত্তা প্রদানের চেয়ে এগিয়ে গিয়ে, তারা জনগণের জীবনমান, কর্মসংস্থান ও সামাজিক কল্যাণে অবদান রাখছে। এটি প্রমাণ করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সুংসুয়াং পাড়ায় এই ইকো রিসোর্ট প্রকল্প স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি একটি প্রমাণ যে, সেনাবাহিনী কেবল সংঘাত হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা দূর্গম অঞ্চলের মানুষের কল্যাণে অর্থায়ন, বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনায়ও অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।
এভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংঘাত হ্রাস ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কল্যাণ নিশ্চিত করার মিশন অব্যাহত থাকবে। সুংসুয়াং পাড়ার বম সম্প্রদায়ের নতুন আশা, নতুন কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়ন এ প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তব রূপ লাভ করেছে। সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর যৌথ প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।



